চুনতি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের লম্বাশিয়ায় পাহাড় কেটে বালু উত্তোলন। ছবি : সময়ের আলোচট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের লম্বাশিয়ায় পাহাড় কেটে বালু উত্তোলন ও পাচারের নতুন করে তৎপরতার অভিযোগ উঠেছে একটি রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে। আগে উত্তোলন করা বালু সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নতুন করে পাহাড় কেটে বালু উত্তোলনের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
বনবিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদফতর বিভিন্ন সময়ে অভিযান, মামলা এবং বালু পরিবহনের সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেও দীর্ঘদিনের এ তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি। সর্বশেষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের নির্দেশে বালু উত্তোলনস্থলে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে অভিযোগ উঠেছে, ওই ব্যবস্থা এড়িয়ে নতুন রাস্তা তৈরি করে আগে উত্তোলন করা বালু পরিবহন এবং পুনরায় পাহাড় কেটে বালু তোলার পাঁয়তারা চলছে। এতে সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষায় নেওয়া উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, চুনতি ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাতগড় লম্বাশিয়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাহাড় কেটে ও পাহাড়ি ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে একটি প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে উপজেলা প্রশাসন ও বনবিভাগ অভিযান চালিয়েছে। কখনো বালু পরিবহনের রাস্তা কেটে দেওয়া হয়েছে, কখনো জব্দ করা হয়েছে যন্ত্রপাতি, করা হয়েছে মামলা। কিন্তু অভিযান শেষে কিছুদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও পরে আবারও বালু উত্তোলন শুরু হয়। ফলে দীর্ঘদিনেও বনাঞ্চল ধ্বংসের এ তৎপরতা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল লম্বাশিয়া এলাকা পরিদর্শন করেন তৎকালীন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। ওই সময় পাহাড় কাটায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। একই সঙ্গে বালু উত্তোলনস্থল এমনভাবে সুরক্ষিত করার কথা বলেন, যাতে কোনো যানবাহন সেখানে প্রবেশ কিংবা বের হতে না পারে।
এরপর বালু উত্তোলনস্থলে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে পাহাড় কেটে বালু উত্তোলন ও পরিবহনের কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। তবে সম্প্রতি বন্ধ করে দেওয়া পথের বিকল্প হিসেবে নতুন রাস্তা তৈরি করে আগে উত্তোলিত বালু সরিয়ে নেওয়া এবং আবারও পাহাড় কেটে বালু তোলার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, নতুন রাস্তা দিয়ে বালু পরিবহনের সুযোগ তৈরি হলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আবারও পাহাড় ধ্বংসের কার্যক্রম শুরু হতে পারে। এতে বন রক্ষায় নেওয়া আগের উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, লম্বাশিয়া এলাকায় প্রায় এক যুগ ধরে পাহাড় কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের চুনতি রেঞ্জের সাতগড় বনবিটের আওতাধীন এ এলাকায় বালু তোলার জন্য শ্যালো মেশিন স্থাপন, পাহাড়ি ছড়া থেকে বালু সংগ্রহ এবং তা পরিবহনে অস্থায়ী সড়ক নির্মাণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
২০২৩ সালের ২৪ নভেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তর ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১০ জনকে আসামি করে থানায় মামলা করে। এর মাত্র তিন দিন পর, ২৭ নভেম্বর অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে তৈরি হওয়া গভীর গর্তের পানিতে পড়ে একটি বন্যহাতির মৃত্যু হয়।
এরপর ২০২৪ সালের ৯ জানুয়ারি উপজেলা প্রশাসন ও বনবিভাগ যৌথ অভিযান চালিয়ে বালু পরিবহনের জন্য তৈরি সড়কের বিভিন্ন অংশ কেটে দেয়। এতে কয়েক মাস বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও পরে সড়ক সংস্কার করে আবারও কার্যক্রম শুরু হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২০ মার্চ উপজেলা প্রশাসন ও বনবিভাগের যৌথ অভিযানে বালু পরিবহনের পাঁচটি স্থানে সড়ক কেটে দেওয়া হয়। কিন্তু এসব অভিযানেও স্থায়ী সমাধান আসেনি। অভিযান শেষে কিছুদিনের মধ্যেই আবারও বালু উত্তোলনের তৎপরতা শুরু হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর অভিযান চালানো এবং বালু পরিবহনের সড়ক বিচ্ছিন্ন করার পরও অবৈধ উত্তোলন বন্ধ করা যাচ্ছে না। বর্তমানে একটি মহল আগে উত্তোলিত বালু পরিবহনের পাশাপাশি নতুন করে পাহাড় কেটে বালু তোলার চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, লম্বাশিয়ায় পাহাড়ের দিকে যাওয়ার পথে একটি সেতুর দুই পাশে বালুবাহী যানবাহনের চলাচল বন্ধে স্থাপন করা প্রতিবন্ধকতা এখনো রয়েছে। আগে উত্তোলন করা বালুর তিনটি স্তূপও সেখানে আগের মতোই পড়ে আছে। তবে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নতুন রাস্তা তৈরি করে এসব বালু পরিবহন ও পাচারের পাশাপাশি পুনরায় পাহাড় কেটে বালু উত্তোলনের চেষ্টা করছে একটি মহল।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, চুনতি সংরক্ষিত বনাঞ্চল শুধু গাছপালার সমষ্টি নয়; এটি বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে এশীয় হাতিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর বিচরণ ও চলাচলের জন্য বনাঞ্চলটির ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের মতে, লম্বাশিয়ায় পাহাড় কেটে বালু উত্তোলনের ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তিত হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে গভীর গর্ত, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাহাড়ি ছড়া ও আশপাশের ভূমি। এ ধরনের কার্যক্রম দীর্ঘদিন চলতে থাকলে ভূমিক্ষয় ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও খাদ্যের উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের স্বাভাবিক বিচরণ ও চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের চুনতি রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা আবির হাসান জানান, লম্বাশিয়া এলাকায় বনবিভাগের নিয়মিত টহল জোরদার রয়েছে। আগে উত্তোলিত বালু সরিয়ে নেওয়া কিংবা পাহাড় ধ্বংস করে নতুন করে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের অপচেষ্টা কেউ করলে কঠোর হাতে দমন করা হবে।
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বায়েজীদ বিন আখন্দ জানান, লম্বাশিয়া এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও পরিবেশ ধ্বংসের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বালু উত্তোলন বা পরিবহনের চেষ্টা করা হলে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে এলাকায় নজরদারি অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রামের প্রধান সমন্বয়কারী মুনিরা পারভীন রুবা বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পাহাড় কেটে বালু উত্তোলন ও পাচারের অপচেষ্টায় জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা উচিত।
সময়ের আলো/জোই