২০ মিনিটে ৬৩০ কোটি ডলার : ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টো চুরি

সময়ের আলো ডেস্ক

প্রযুক্তি

মাত্র ২০ মিনিট। ১০টি ব্লকচেইন নেটওয়ার্ক। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রা কেনাবেচার প্ল্যাটফর্ম থেকে উধাও ৬৩০ কোটি ডলারের

2026-10-31T19:16:02+00:00
2026-10-31T19:16:02+00:00
 
  শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬,
১৫ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
প্রযুক্তি
২০ মিনিটে ৬৩০ কোটি ডলার : ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টো চুরি
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:১৬ পিএম 
ছবি : সংগৃহীত
মাত্র ২০ মিনিট। ১০টি ব্লকচেইন নেটওয়ার্ক। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রা কেনাবেচার প্ল্যাটফর্ম থেকে উধাও ৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল সম্পদ চুরির এই ঘটনাটি ঘটেছে বাইন্যান্সে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা।   

একটি হামলাতেই ছাড়িয়ে গেছে ক্রিপ্টো দুনিয়ার আগের সব চুরির রেকর্ড। কীভাবে ঘটল এত বড় ঘটনা? কারা এর পেছনে? চুরি যাওয়া অর্থের কতটা উদ্ধার হয়েছে? আর এই হামলায় কতটা ঝুঁকিতে পড়েছে ক্রিপ্টো বাজার?

২০ মিনিটে কীভাবে চুরি হলো এত অর্থ?

২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবর। বাইন্যান্সের হট ওয়ালেটে সাইবার হামলা চালায় হ্যাকাররা। মাত্র ২০ মিনিটে বিভিন্ন ব্লকচেইন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সরিয়ে নেয় বিপুল পরিমাণ ক্রিপ্টো সম্পদ।

হট ওয়ালেট হলো ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত ডিজিটাল ওয়ালেট। গ্রাহকদের দ্রুত লেনদেনের সুবিধা দিতে এক্সচেঞ্জগুলো এতে অর্থ রাখে। অন্যদিকে কোল্ড ওয়ালেট থাকে ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন। ফলে অনলাইন হামলার ঝুঁকি তুলনামূলক কম।

বাইন্যান্সের প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে, প্রতিষ্ঠানটির একজন প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার মাধ্যমে হামলাকারীরা সিস্টেমে প্রবেশ করে থাকতে পারে। তবে হামলার পুরো কৌশল নিয়ে তদন্ত চলছে।

টিআরএম ল্যাবসের বিশ্লেষণ বলছে, হ্যাকাররা ইথেরিয়াম নেটওয়ার্কের একটি প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার অপব্যবহার করে। এর মাধ্যমে ওয়ালেটের অর্থ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় তারা।

বাইন্যান্স জানিয়েছে, তাদের প্রাইভেট কি বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা চাবি ফাঁস হওয়ার প্রমাণ মেলেনি।

চুরি যাওয়া অর্থের কতটা উদ্ধার হয়েছে?

হামলার পরপরই অর্থের গতিপথ শনাক্তে কাজ শুরু করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ব্লকচেইন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান।

বাইন্যান্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ফ্রিজ করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ, এসব সম্পদ আপাতত ব্যবহার বা অন্যত্র সরানো কঠিন করে দেওয়া হয়েছে।

এ কাজে সহায়তা করেছে টেথার, সার্কেল ও রিপলের মতো প্রতিষ্ঠান।

তবে ফ্রিজ করা মানেই অর্থ উদ্ধার নয়। সম্পদ আটকে রাখা আর প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এক বিষয় নয়।

বাকি অর্থের বড় অংশ বিটকয়েন ও ইথারের মতো বিকেন্দ্রীভূত ক্রিপ্টোকারেন্সি। এসব মুদ্রা কোনো একক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করে না। তাই চিহ্নিত করলেও সরাসরি আটকে দেওয়া কঠিন।

কারা এই হামলার পেছনে?

হামলার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হ্যাকারদের সংশ্লিষ্টতা দেখছেন ব্লকচেইন বিশ্লেষকেরা।

টিআরএম ল্যাবসের দাবি, এ হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকিং ইউনিট ট্রেডারট্রেটরের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ রয়েছে। লাজারাস গ্রুপের পরিচিত কৌশলের সঙ্গেও হামলার মিল পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান।

উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি করে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ নতুন নয়। দেশটির হ্যাকাররা বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে হামলা চালিয়ে আসছে।

টিআরএম ল্যাবসের পলিসি বিভাগের প্রধান আরিয় রেডবোর্ডের মতে, উত্তর কোরিয়ার চুরি করা অর্থ দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র ও সামরিক কর্মসূচিতে অর্থায়নের ঝুঁকি তৈরি করে।

তবে বাইন্যান্সের এই হামলায় চুরি হওয়া অর্থ সরাসরি উত্তর কোরিয়ার হাতে পৌঁছেছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেল বাইন্যান্স

ক্রিপ্টো দুনিয়ায় এর আগেও বড় ধরনের চুরির ঘটনা ঘটেছে। ২০১৪ সালে মাউন্ট গক্স থেকে প্রায় ৪৭০ মিলিয়ন ডলার, ২০১৮ সালে কয়েনচেক থেকে ৫৩৪ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২১ সালে পলি নেটওয়ার্ক থেকে ৬১১ মিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরি হয়। ২০২২ সালে রোনিন নেটওয়ার্কে হামলায় খোয়া যায় প্রায় ৬২৫ মিলিয়ন ডলার। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাইবিট থেকে চুরি হয় প্রায় ১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ। এত দিন একক সাইবার হামলায় ক্রিপ্টো চুরির সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল এটিই। 

টিআরএম ল্যাবসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় ১৫০টি হ্যাকিংয়ের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে চুরি হয়েছিল ২ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ।

অর্থাৎ, বাইন্যান্সে এক হামলাতেই চুরি হয়েছে পুরো ২০২৫ সালের মোট চুরির দ্বিগুণের বেশি অর্থ।

গ্রাহকদের অর্থ কি নিরাপদ?

হামলার পর গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। নিজেদের জমা রাখা অর্থ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

বাইন্যান্সের সহপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিচার্ড টেং ও প্রতিষ্ঠাতা চ্যাংপেং ঝাও গ্রাহকদের আশ্বস্ত করেছেন। তাদের বক্তব্য, গ্রাহকদের মূল তহবিল নিরাপদ রয়েছে।


চুরি হওয়া অর্থের ক্ষতিপূরণ দেবে প্রতিষ্ঠানটি। এ জন্য ব্যবহার করা হবে তাদের ‘সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজার্স’ বা সাফু তহবিল। প্রয়োজনে নিজস্ব করপোরেট তহবিল থেকেও অর্থ দেওয়া হবে।

তবে গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও নিরাপত্তার প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কীভাবে এমন হামলা সম্ভব হলো, তা খুঁজে বের করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

ক্রিপ্টো বাজারে কী প্রভাব পড়েছে?

বাইন্যান্সে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ক্রিপ্টো বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়।

বিটকয়েনের দাম ৫ শতাংশের বেশি কমে ৭৭ হাজার ডলারের নিচে নেমে আসে। দরপতন ঘটে ইথেরিয়াম ও বাইন্যান্সের নিজস্ব টোকেন বিএনবির দামেও।

বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সিডনির ম্যাককুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিপ্টো বিশেষজ্ঞ শেন ফোলির মতে, বাইন্যান্সের মতো বড় প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তার দুর্বলতা ধরা পড়া বিনিয়োগকারীদের আস্থায় আঘাত হেনেছে।

তদন্তে যুক্ত এফবিআই ও সিক্রেট সার্ভিস

চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারে কাজ করছে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই ও সিক্রেট সার্ভিস। বাইন্যান্সের পাশাপাশি ব্লকচেইন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোও অর্থের গতিপথ অনুসরণ করছে।

হ্যাকারদের ওয়ালেট শনাক্ত করা, অর্থের স্থানান্তর ঠেকানো এবং বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া সম্পদ আটকে দেওয়াই এখন প্রধান লক্ষ্য।

তবে সব অর্থ উদ্ধার সহজ হবে না। বিশেষ করে বিকেন্দ্রীভূত ব্লকচেইনে চলে যাওয়া সম্পদ ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনা?

বাইন্যান্সের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, ক্রিপ্টো দুনিয়ায় বড় প্রতিষ্ঠানও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। বিপুল বিনিয়োগ, উন্নত প্রযুক্তি ও শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলেও একটি দুর্বলতা ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হতে পারে।

এ ঘটনা আরও একটি বিষয় সামনে এনেছে। ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন অনুসরণ করা গেলেও চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধার সব সময় সম্ভব নয়।

একদিকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অর্থপাচার ও সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি—সব মিলিয়ে বাইন্যান্সের এই হামলা ক্রিপ্টো বাণিজ্যের জন্য বড় পরীক্ষা। 

এখন দেখার বিষয়, ৬৩০ কোটি ডলারের মধ্যে শেষ পর্যন্ত কতটা উদ্ধার করা যায় এবং ভবিষ্যতে এমন হামলা ঠেকাতে কতটা কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়। 

সময়ের আলো/জেডি 
  বিষয়:   ইতিহাস  ক্রিপ্টো চুরি  বাইন্যান্স 


Advertisement
Loading...
Loading...
প্রযুক্তি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: