এআইয়ে পানি ব্যবহার নিয়ে স্যাম অল্টম্যানের দাবি কতটা সত্য?

প্রযুক্তি ডেস্ক

প্রযুক্তি

পড়াশোনা, তথ্য অনুসন্ধান, ছবি তৈরি কিংবা জটিল বিষয় বোঝা- সব ক্ষেত্রেই চ্যাটজিপিটির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) টুল থেকে কয়েক সেকেন্ডে

2026-10-28T15:27:49+00:00
2026-10-28T15:31:24+00:00
 
  বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬,
১২ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রযুক্তি
এআইয়ে পানি ব্যবহার নিয়ে স্যাম অল্টম্যানের দাবি কতটা সত্য?
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:২৭ পিএম  আপডেট: ২৮.১০.২০২৬ ৩:৩১ পিএম
ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান। ছবি : সংগৃহীত
পড়াশোনা, তথ্য অনুসন্ধান, ছবি তৈরি কিংবা জটিল বিষয় বোঝা- সব ক্ষেত্রেই চ্যাটজিপিটির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) টুল থেকে কয়েক সেকেন্ডে উত্তর পাওয়া যায়। তবে এসব উত্তর তৈরি করতে যে বিপুল কম্পিউটিং সক্ষমতা প্রয়োজন, তার জন্য পানি ও বিদ্যুৎ খরচ হয়। সম্প্রতি ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান দাবি করেছেন- চ্যাটজিপিটির পানি ব্যবহার নিয়ে ইন্টারনেটে প্রচারিত অনেক তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কিন্তু তার এই দাবি কতটা সত্য? 

এআইয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হয় ডেটা সেন্টারের সার্ভারের মাধ্যমে। এসব সার্ভার চালাতে বিদ্যুৎ লাগে। পাশাপাশি অতিরিক্ত তাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয় বিশেষ শীতলীকরণব্যবস্থা, যার কিছু পদ্ধতিতে পানি ব্যবহার করা হয়।

স্যাম অল্টম্যান বলেছেন, ‘ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি বাদাম উৎপাদনে যে পরিমাণ পানি লাগে, তা দিয়ে চ্যাটজিপিটিকে প্রায় ৩৮ হাজার প্রশ্ন করা সম্ভব।’

অল্টম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, এই হিসাব শুধু ডেটা সেন্টারে সরাসরি ব্যবহৃত পানির ওপর ভিত্তি করে নয়; বরং পানি ব্যবহারের সামগ্রিক বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টমস হার্ডওয়্যারের এক প্রতিবেদনে অল্টম্যানের এই বক্তব্য প্রকাশিত হয়। অ্যালেক্স হিথের সঙ্গে ‘সৌর্স’ পডকাস্টের এক পর্বে এআইয়ের পানি ব্যবহার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বাদাম উৎপাদন ও চ্যাটজিপিটির পানি ব্যবহারের তুলনা করেন।

তবে অল্টম্যান জানিয়েছেন, তিনি স্মৃতি থেকে হিসাবটি বলেছেন। সঠিক পরিসংখ্যান সামনে না থাকায় সংখ্যাটিতে ভুল থাকতে পারে।

২০১৯ সালে ইকোলজিক্যাল ইন্ডিকেটরস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় ক্যালিফোর্নিয়ায় বাদাম উৎপাদনের পানির ফুটপ্রিন্ট হিসাব করা হয়েছিল। গবেষণা অনুযায়ী, একটি বাদামের জন্য গড়ে প্রায় ১২ লিটার পানির ফুটপ্রিন্ট পাওয়া যায়। অন্যদিকে, বাদামগাছে সেচের জন্য ব্যবহৃত মিঠাপানির পরিমাণ ছিল গড়ে প্রায় ৬ দশমিক ৩ লিটার।


পানির ফুটপ্রিন্ট বলতে কোনো পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পানির ব্যবহার ও পরিবেশগত প্রভাবের সামগ্রিক হিসাব বোঝায়। এতে শুধু সরাসরি সেচের পানিই নয়, বৃষ্টির পানিসহ পানির গুণমানের ওপর উৎপাদনপ্রক্রিয়ার প্রভাবও বিবেচনায় আসতে পারে। তাই একটি বাদামের পানির ফুটপ্রিন্ট ১২ লিটার হওয়া এবং উৎপাদনের সময় সরাসরি ১২ লিটার পানি ব্যবহার করা এক বিষয় নয়।

অন্যদিকে, চ্যাটজিপিটির প্রতিটি প্রশ্নের পেছনে ঠিক কতটা পানি খরচ হয়, তা যাচাই করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ্যে নেই। ফলে, একটি বাদামের পানিতে ৩৮ হাজার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব- অল্টম্যানের এই হিসাবকে নিশ্চিত ও নির্ভুল পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

ডেটা সেন্টারে পানি লাগে কেন?

ডেটা সেন্টার হলো এমন একটি স্থাপনা, যেখানে বিপুলসংখ্যক সার্ভার ও কম্পিউটার একসঙ্গে কাজ করে। তথ্য সংরক্ষণ, এআই মডেল প্রশিক্ষণ এবং ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর তৈরি করার মতো কাজগুলো এসব সার্ভারের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

সার্ভার যত বেশি কাজ করে, তত বেশি তাপ উৎপন্ন হতে পারে। এই তাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। তা না হলে যন্ত্রের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে, এমনকি ক্ষতিও হতে পারে। এ কারণে ডেটা সেন্টারে বিভিন্ন ধরনের শীতলীকরণপ্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এর কিছু ব্যবস্থায় পানি কাজে লাগে, আবার অন্য কিছু ব্যবস্থায় বিকল্প প্রযুক্তির সাহায্যে তাপ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

অল্টম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, পুরোনো কিছু ডেটা সেন্টারে বাষ্পীভবনভিত্তিক শীতলীকরণব্যবস্থা ব্যবহৃত হতো, যাতে তুলনামূলক বেশি পানি লাগতে পারে। তবে তার দাবি, আধুনিক ডেটা সেন্টারে শীতলীকরণপ্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে, পুরোনো ডেটা সেন্টারের তথ্য দিয়ে বর্তমানের সব স্থাপনার পানি ব্যবহার নির্ধারণ করা ঠিক নয়।


তিনি আরও দাবি করেছেন, আধুনিক বড় একটি ডেটা সেন্টারে মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের কাজে যতটা পানি লাগে, মোটামুটি সেই পরিমাণ পানিই ব্যবহৃত হয়।

তবে, এই বক্তব্যকে সব ডেটা সেন্টারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সাধারণ নিয়ম হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। ডেটা সেন্টারের আকার, অবস্থান, শীতলীকরণপ্রযুক্তি এবং পরিচালনব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে পানি ব্যবহারের পরিমাণে বড় পার্থক্য হতে পারে।

এআইয়ের পানি ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ কী অমূলক?

একটি প্রশ্নের উত্তর তৈরি করতে কতটুকু পানি লাগে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর পাশাপাশি এআইয়ের ব্যবহার বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকলে সামগ্রিকভাবে কত পানি প্রয়োজন হবে, সেটিও বিবেচনা করা দরকার।

টমস হার্ডওয়্যারের প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি ডেটা সেন্টারের পানি ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জর্জিয়ার ফেয়েট কাউন্টির একটি ডেটা সেন্টার ১৫ মাসে ২ কোটি ৯০ লাখ গ্যালন পানি ব্যবহার করেছে। অন্য একটি প্রকল্পের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের পানির প্রাপ্যতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এ ধরনের উদাহরণ দেখায়, কোনো একটি এআই প্রশ্নে পানির ব্যবহার কম হলেও বিপুলসংখ্যক প্রশ্নের সম্মিলিত প্রভাব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশ্বজুড়ে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। চ্যাটজিপিটি ছাড়াও বিভিন্ন এআই টুল দিয়ে ছবি তৈরি, ভিডিও নির্মাণ, তথ্য বিশ্লেষণসহ নানা কাজ করা হচ্ছে। এআই ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেটা সেন্টারের ওপর চাপও বাড়তে পারে। তবে সব ব্যবহারকারী সমানসংখ্যক প্রশ্ন করেন না, আবার সব এআই কাজেও একই পরিমাণ কম্পিউটিং সক্ষমতা লাগে না। তাই ব্যবহারকারীর সংখ্যা দিয়ে সরাসরি মোট পানি ব্যবহারের পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

এআইয়ের পানি ব্যবহারের প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে ডেটা সেন্টার কোথায় অবস্থিত, সংশ্লিষ্ট এলাকায় পানির প্রাপ্যতা কেমন এবং কোন ধরনের শীতলীকরণব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে- এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

পানি ছাড়াও বড় চ্যালেঞ্জ বিদ্যুৎ

অল্টম্যানের বক্তব্যে পানি ব্যবহারের পাশাপাশি বিদ্যুতের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তার মতে, এআইয়ের পানি ব্যবহার নিয়ে কিছু দাবি অতিরঞ্জিত হলেও, এআই পরিচালনায় ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেটা সেন্টারে কম্পিউটিংয়ের চাহিদাও বাড়ছে। নতুন সার্ভার চালানো, মডেল প্রশিক্ষণ এবং ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর তৈরি করতে বিদ্যুৎ প্রয়োজন। ছবি ও ভিডিও তৈরি কিংবা জটিল তথ্য বিশ্লেষণের মতো কাজেও উল্লেখযোগ্য কম্পিউটিং সক্ষমতা দরকার হতে পারে।


২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এআই ইমপ্যাক্ট সামিটের ফাঁকে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অল্টম্যান বলেছিলেন, ‘প্রতিটি প্রশ্নের বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ে আলোচনার চেয়ে এআইয়ের সামগ্রিক বিদ্যুৎ চাহিদা কতটা বাড়ছে, তা নিয়ে ভাবা বেশি জরুরি।’ এ চাহিদা মেটাতে পারমাণবিক, বায়ু ও সৌরশক্তির মতো উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৫ সালের মে মাসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবহার জার্মানি বা ফ্রান্সের মতো দেশের বিদ্যুৎ ব্যবহারের কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তবে, এই হিসাব শুধু চ্যাটজিপিটির নয়; এতে বিশ্বের ডেটা সেন্টারগুলোর সামগ্রিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের চিত্র উঠে এসেছে।

বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লে উৎপাদনও বাড়াতে হতে পারে। সেই বিদ্যুৎ জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে উৎপাদন করা হলে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ বাড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই এআইয়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।

ভবিষ্যতে এআই ব্যবহার করা হবে কী না, সেই প্রশ্নের চেয়ে বরং গুরুত্বপূর্ণ এআইয়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদা কীভাবে টেকসইভাবে পূরণ করা যায়। পানি ও বিদ্যুতের ব্যবহার সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ, দক্ষ শীতলীকরণপ্রযুক্তি এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র : সিএনবিসি, টমস হার্ডওয়্যার, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও আইএমএফ

সময়ের আলো/মহু

  বিষয়:   এআই  পানি  স্যাম অল্টম্যান  কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তা  চ্যাটজিপিটি  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
প্রযুক্তি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: