নাসার ভয়েজার-১ মহাকাশযান। ছবি : সংগৃহীত নাসার ভয়েজার-১ মহাকাশযান কয়েক দশক ধরে দূরত্বের নতুন রেকর্ড গড়ে চলেছে। প্রায় ৫০ বছর আগে উৎক্ষেপিত এই মহাকাশযান ১৯৯৮ সালে পাইওনিয়ার-১০ কে পেছনে ফেলে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে থাকা মানবনির্মিত বস্তুতে পরিণত হয়। সৌরজগতের সুরক্ষাবলয় পেরিয়ে যাওয়া প্রথম মহাকাশযানও এটি। ভবিষ্যতে দূরবর্তী নক্ষত্রজগতের পথে মানবজাতির প্রথম দূত হিসেবে ইতিহাসে নিজের স্থান ধরে রাখবে ভয়েজার-১।
ভয়েজার-১ ও ভয়েজার-২ মহাকাশযানের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে বাইরের সৌরজগতের ভয়ংকর শক্তিশালী ঝড়, কয়েক ডজন চাঁদের প্রথম ছবি এবং বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুনের বলয়গুলোর সূক্ষ্ম বিবরণ। এসব ছবি ও সংগৃহীত উপাত্ত সৌরজগতের গঠন ও বিবর্তন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা বদলে দিয়েছে। একই সঙ্গে পরবর্তী মহাকাশ অভিযানগুলোর পথ তৈরি করেছে এবং মহাকাশবিজ্ঞানীদের সামনে নতুন নতুন গবেষণার প্রশ্ন তুলে ধরেছে, যেগুলোর উত্তর খুঁজতে কয়েক দশক ধরে গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে।
ভয়েজার ১ আরেকটি বড় রেকর্ড গড়তে চলেছে। ১৮ নভেম্বর পূর্ববর্তী মান সময় ভোর ৫:১৬:০৭ মিনিটে, এটি পৃথিবী থেকে এক আলোক-দূরত্বে পৌঁছানো প্রথম মহাকাশযানে পরিণত হবে, অর্থাৎ আলো ২৪ ঘণ্টায় যে দূরত্ব অতিক্রম করে। এটি ২৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন কিলোমিটার বা সূর্য থেকে প্লুটোর দূরত্বের চারগুণেরও বেশি পথ। সেই বিন্দুতে, পৃথিবী থেকে ভয়েজার ১-এ সংকেত পৌঁছাতে পুরো একদিন সময় নেবে, আবার উত্তর পেতে আরও একদিন লাগবে।
ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনায় অবস্থিত নাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরির গ্রহবিজ্ঞানী লিন্ডা স্পিলকার ১৯৭৭ সালে প্রোবগুলো উৎক্ষেপণের ঠিক আগে ভয়েজারে কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘মিশনটি এত দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা আমি কল্পনাও করিনি।’ স্পিলকার প্রথম উৎক্ষেপণের জন্য ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরালে ছিলেন। মিশনের মাইলফলকগুলোর কথা মাথায় রেখে তার সন্তানদের জন্মেরও পরিকল্পনা করেছিলেন, যাদের বয়স এখন ৪০-এর কোঠায়। অন্য একটি মিশনের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য কিছুদিন দূরে থাকার পর, তিনি এখন ভয়েজারের প্রধান বিজ্ঞানী হিসেবে ফিরে এসেছেন।
শুরু থেকেই আরও দুই বিজ্ঞানী ভয়েজারের সঙ্গে যুক্ত আছেন। মহাকাশযানটি যখন উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল, তখন অন্যরা জন্মগ্রহণই করেননি। স্পিলকার বলেন, ‘ভয়েজার আজও একটি বহু-প্রজন্মের মিশন। তবে, এটি নস্টালজিয়ার কোনো মিশন নয়। সৌরজগতের সীমানার বাইরে এখনো একটি সম্পূর্ণ অনাবিষ্কৃত জগৎ অপেক্ষা করছে।’
প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ জেমি র্যানকিন, যিনি ২০১২ সালের আগস্টে তার পিএইচডি শুরু করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি উপাত্ত এবং প্রতিদিন আমরা ভয়েজারদের কাছ থেকে যে তথ্য পাচ্ছি, তা আমাদের নতুন কিছু শেখাচ্ছে। প্রতিদিন এটি এমন সব জায়গায় রয়েছে, যা আগে কেউ কখনো অন্বেষণ করেনি।’
ভয়েজার মহাকাশযান দুটির প্রধান লক্ষ্য ছিল সৌরজগতের বাইরের অঞ্চলগুলো অনুসন্ধান করা, যেগুলো তখনও অনেকটাই অজানা ছিল। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে গ্রহগুলোর একটি বিরল সারিবদ্ধ অবস্থানের সুযোগ নিয়ে এই অভিযান পরিকল্পনা করা হয়। এর ফলে মহাকাশযান দুটি বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুনের পাশ দিয়ে যাওয়ার এবং প্রতিটি গ্রহের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ কাজে লাগিয়ে গতি বাড়ানোর সুযোগ পায়। এই মহাকর্ষীয় সহায়তা ব্যবহার করে ১৫ বছরেরও কম সময়ে চারটি গ্রহের কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব হয়। এমন বিরল গ্রহ-সারিবদ্ধতা আবার দেখা যেতে পারে ২১৫০-এর দশকে।
সেকালের জন্য প্রকল্পটি একটি সাহসী পদক্ষেপ ছিল। ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে যখন কাজ শুরু হয়, তখন কোনো মহাকাশযান মঙ্গল গ্রহের বাইরে যায়নি। নাসা এই মিশনের জন্য একটি রক্ষণশীল লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল- বৃহস্পতি এবং শনির ফ্লাইবাই। ১৯৭২ এবং ১৯৭৩ সালে নাসা দুটি পাইওনিয়ার প্রোব উৎক্ষেপণ করে, যা এই যাত্রা সম্ভব কিনা তা নিশ্চিত করে এবং পথিমধ্যে উপাত্ত সংগ্রহ করে। ভয়েজারের মতো এখানেও দুটি মহাকাশযান ছিল, যাতে একটি ব্যর্থ হলে অন্যটি কাজ করে।
রোমাঞ্চকর উৎক্ষেপণের প্রায় দুই বছর পর ভয়েজার মহাকাশযান বৃহস্পতি ও শনির বহু অজানা রহস্য উন্মোচন করতে শুরু করে। এর পাঠানো তথ্য ও ছবিতে উঠে আসে বৃহস্পতির চাঁদ আইও-এর আগ্নেয়গিরি, গ্রহটির বিখ্যাত গ্রেট রেড স্পটের বিস্তারিত চিত্র এবং শনির চাঁদ এনসেলাডাসে ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তার সম্ভাব্য প্রমাণ। এসব আবিষ্কার বাইরের সৌরজগত সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণায় নতুন মাত্রা যোগ করে।
মিশন সফল করে ভয়েজার ২ এগিয়ে যায় ইউরেনাস এবং নেপচুন অতিক্রম করার জন্য। এটি সেই গ্রহগুলোর বলয়ের প্রথম ছবি তোলে এবং পথিমধ্যে এক ডজনেরও বেশি নতুন চাঁদ আবিষ্কার করে। মহাকাশযানটি নেপচুনে একটি ক্রমাগত ঘূর্ণায়মান ঝড় এবং নেপচুনের চাঁদ ট্রাইটনে উষ্ণ প্রস্রবণ দেখতে পায়।
২০২৪ সালে মৃত্যুর আগে নাসার এক সাক্ষাৎকারে মিশনের মূল প্রধান বিজ্ঞানী এড স্টোন বলেছিলেন, ‘ভয়েজারের মূল আকর্ষণ ছিল স্পষ্টতই গ্রহগুলোর এই সরাসরি পর্যবেক্ষণ বা এনকাউন্টারগুলো। প্রতিটি এনকাউন্টারের মধ্যেই যেন এক জীবনের সমান আবিষ্কার ঠাঁই পেয়েছিল।’
গ্রহ ও তাদের চাঁদগুলোর একের পর এক ছবি সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে সংবাদমাধ্যম ও টেলিভিশনে প্রচারিত সেই দৃশ্যগুলোই মহাকাশ অভিযানের প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে। বৃহস্পতির চাঁদ আইও-এর ছবি বিশেষভাবে নজর কাড়ে। এর গায়ে ছড়িয়ে থাকা কমলা রঙের ছোপগুলো দেখতে অনেকটা পিজার মতো মনে হয়েছিল।
সেই চাঁদের একটি সাধারণ নেভিগেশন ইমেজ পুরো মিশনের সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কারগুলোর একটির দিকে নিয়ে যায়। ভয়েজার ১ বৃহস্পতির সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছানোর চার দিন পর যখন প্রাথমিক উত্তেজনা কিছুটা স্তিমিত হয়ে এসেছিল, জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরির প্রজেক্ট অ্যাস্ট্রোনোমার লিন্ডা মোরাবিটো আইও-এর অতিরিক্ত ছবিগুলো প্রসেস করা শুরু করেন। এই ছবিগুলো ফ্লাইবাইয়ের পরে তোলা হয়েছিল, যখন ভয়েজার পেছন ফিরে তাকাচ্ছিল। মোরাবিটো যখন একটি ছবির উজ্জ্বলতা বাড়ালেন, তখন তিনি আইও-এর প্রান্ত থেকে উপবৃত্তাকার বা গোলকের মতো এক অদ্ভুত অবয়ব বেরিয়ে আসতে দেখেন।
সেই গোলক আকৃতির অংশটি আসলে একটি আগ্নেয়গিরির প্লুম বা উদগীরণরত অগ্নিকুণ্ড ছিল, যা আইও-এর পৃষ্ঠ থেকে ২৫০ কিলোমিটার ওপর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এটি পৃথিবী ব্যতীত অন্য কোথাও সক্রিয় আগ্নেয়গিরির প্রথম আবিষ্কার ছিল এবং এটি আমাদের বাইরের সৌরজগৎ দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে দেয়। সৌরজগৎ যে কেবল একটি ঠান্ডা, নিস্ক্রিয় বরফের বাক্স নয়, বরং এটি একটি পরিবর্তনশীল ও প্রাণবন্ত অঞ্চল- এই তথ্য তা প্রমাণ করে।
এই তথ্যগুলো ভবিষ্যতের আরও অনেক মিশনকে অনুপ্রাণিত করেছিল। ১৯৯৫ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত বৃহস্পতি পরিদর্শনের সময় গ্যালিলিও প্রোব আবিষ্কার করে যে, ইউরোপা চাঁদের তলদেশে একটি সমুদ্র থাকতে পারে, যা জীবনের জন্য অনুকূল হতে পারে। এরপর ক্যাসিনি প্রোব যখন ২০০৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত শনি গ্রহকে প্রদক্ষিণ করেছিল, তখন সেটি আবিষ্কার করে যে, এনসেলাডাস চাঁদেও জীবনধারণের উপযোগী একটি মহাসাগর রয়েছে, যা মহাকাশে উষ্ণ প্রস্রবণ ছড়ায়।
১৯৯০ সালে ভয়েজার ১ যখন সূর্য থেকে প্রায় ৬ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল, তখন জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান মিশন প্রধানদের রাজি করান মহাকাশযানটিকে শেষবারের মতো গ্রহগুলোর দিকে ঘুরিয়ে একটি ছবি তোলার জন্য। ভয়েজার ১ একটি ফ্যামিলি পোর্ট্রেট তোলে, যেখানে পৃথিবীকে কেবল একটি ‘ফ্যাকাশে নীল বিন্দু’ হিসেবে দেখা যাচ্ছিল। সেগান তার ১৯৯৪ সালের বই ‘পেল ব্লু ডট’-এ লিখেছিলেন - ‘আপনার ভালোবাসার প্রতিটি মানুষ, আপনার পরিচিত প্রতিটি মানুষ, যার কথা আপনি কখনো শুনেছেন এবং অতীতে অস্তিত্ব থাকা প্রতিটি মানুষ একটি ধূলিকণার ওপর তাদের জীবন কাটিয়েছেন, যা সূর্যের আলোর রশ্মিতে ভেসে রয়েছে।’
বিদ্যুৎ বাঁচানোর জন্য ১৯৮৯ সালে ভয়েজার ২-এর ক্যামেরাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ফ্যামিলি পোর্ট্রেট তোলার পর ভয়েজার ১-এর ক্যামেরাগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়। মহাকাশযানগুলো যেদিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, সেখানে দেখার মতো খুব বেশি কিছু ছিল না।
অসীমের সীমানা
ভয়েজার প্রোব দুটি তখন পৃথক পথে সৌরজগতের বাইরের দিকে এগিয়ে চলেছে। তাদের গন্তব্য এমন এক অজানা সীমানা, যা এর আগে কোনো মানবনির্মিত যান অতিক্রম করেনি। যাত্রার পরবর্তী পর্যায়ে কী অপেক্ষা করছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদেরও ছিল নানা প্রশ্ন। মহাকাশযান দুটি আর কত দিন পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারবে? সূর্যের প্রভাব কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত? আন্তঃনক্ষত্রীয় মহাশূন্যে প্রবেশের অভিজ্ঞতাই বা কেমন হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই চলছিল তাদের অজানার পথে অভিযান।
মহাকাশে যাত্রার প্রথম ৩৫ বছর ভয়েজার-১ সূর্য থেকে নির্গত সৌরবায়ুর উত্তপ্ত আবেশের মধ্যেই অবস্থান করেছিল। উত্তপ্ত ও বৈদ্যুতিক চার্জযুক্ত কণার এই প্রবাহ সূর্য থেকে ক্রমাগত ছড়িয়ে পড়ে তৈরি করে বিশাল বুদ্বুদসদৃশ অঞ্চল, যার নাম ‘হেলিওস্ফিয়ার’। এটি সৌরজগতকে ঘিরে রেখে মহাজাগতিক বিকিরণের একটি অংশ থেকে সুরক্ষা দেয়। গ্রহগুলোর কক্ষপথ ছাড়িয়ে কয়েক কোটি কিলোমিটার দূর পর্যন্ত বিস্তৃত এই অঞ্চল ‘হেলিওপজ’ নামের একটি সীমানায় গিয়ে শেষ হয়েছে। হেলিওপদার্থবিদদের মতে, এই সীমানায় সৌরবায়ুর সঙ্গে আন্তঃনক্ষত্রীয় স্থানের পদার্থের মিথস্ক্রিয়া ঘটে। একে সৌরজগতের বাইরের প্রান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সূর্যের মহাকর্ষীয় প্রভাব এরও অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত।
বিজ্ঞানীরা আশা করেছিলেন যে, ভয়েজার দুটি হেলিওপজ অতিক্রম করবে, কিন্তু তারা জানতেন না যে কখন তা ঘটবে অথবা অতিক্রম করার পর মহাকাশযানগুলো কীসের মুখোমুখি হবে। ২০১২ সালের আগস্টে র্যানকিন যখন ক্যালটেকে সবেমাত্র তার পিএইচডি শুরু করেছেন, ঠিক তখনই ভয়েজার ১ সৌরকণার হার কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চশক্তিসম্পন্ন মহাজাগতিক রশ্মির সংখ্যায় একটি আকস্মিক বৃদ্ধি শনাক্ত করে, যা মহাকাশযানটি সীমানা অতিক্রম করার ইঙ্গিত দেয়। তবে, চুম্বকক্ষেত্রের পরিমাপ অন্য কথা বলছিল। বরং সেই পরিমাপগুলো নির্দেশ করছিল যে, সূর্যের তখনো কিছু প্রভাব ছিল। আন্তঃনক্ষত্রীয় চুম্বকক্ষেত্রটি নদী যেমন পাথরের চারপাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়, ঠিক সেভাবেই হেলিওস্ফিয়ারের চারপাশ দিয়ে বাঁক নিচ্ছিল।
ভয়েজার-১ হেলিওপজ অতিক্রম করেছে কি না, তা নিশ্চিত করার মতো একটি যন্ত্র তখন আর কার্যকর ছিল না। তবে ২০১৩ সালের এপ্রিলে সূর্যের একটি বিস্ফোরণ থেকে ছড়িয়ে পড়া তরঙ্গ বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন সুযোগ এনে দেয়। ওই তরঙ্গ ভয়েজার-১-এর চারপাশের ইলেকট্রনগুলোকে কম্পিত করে। এর ফলে বিজ্ঞানীরা আশপাশের অঞ্চলে আধানযুক্ত কণার ঘনত্ব সম্পর্কে ধারণা পান।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভয়েজার-১ আসলে ২০১২ সালের ২৫ আগস্টই হেলিওপজ অতিক্রম করেছিল। তখন মহাকাশযানটি পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের প্রায় ১২০ গুণ, অর্থাৎ প্রায় ১৮০০ কোটি কিলোমিটার দূরে ছিল। পরে ভয়েজার-২-এর পাঠানো উপাত্তও এই আবিষ্কারের পক্ষে প্রমাণ দেয়। ২০১৩ সালে সায়েন্স নিউজ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিজ্ঞানী এড স্টোন বলেছিলেন, ‘এটি আমাদের জন্য অন্বেষণের এক নতুন যুগের সূচনা।’
মহাকাশের অজানা দিগন্ত
তবে আমাদের সৌরজগৎ এবং ইন্টারস্টেলার স্পেসের মধ্যকার এই সীমারেখা কোনো স্পষ্ট বাধা নয়। মেরিল্যান্ডের গ্রিনবেল্টে অবস্থিত নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইটের পদার্থবিদ জিউ পার্ক বলেন, ‘সূর্যের প্রভাব বিজ্ঞানীরা যতটা আশা করেছিলেন, তারচেয়েও অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত এবং সীমানাটি খুব তীক্ষ্ণ বা পাতলা নয়।’
ভয়েজার হেলিওপজের অপর পাশে পৌঁছে যাওয়ার পর, কণার গতি এবং গ্যাসের তাপমাত্রা অনেকটাই কমে গেছে। চুম্বকক্ষেত্র দুর্বল হয়ে পড়েছে। এমনকি হেলিওস্ফিয়ারের ভেতরের তুলনায় ধূলিকণার পরিমাণও প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। র্যানকিন বলেন, ‘অধিকাংশ সময়জুড়েই এটি অত্যন্ত শান্ত ও ধারাবাহিক ছিল।’
তবে ভয়েজার-১-এর চারপাশের মহাকাশ পুরোপুরি শান্ত নয়। চারটি পৃথক ঘটনায় বিজ্ঞানীরা মহাকাশযানটির আশপাশে চৌম্বকক্ষেত্রের শক্তি ও কণার ঘনত্বের পরিমাপে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি বা আকস্মিক স্পাইক লক্ষ্য করেছেন। ২০২০ সালের মাঝামাঝি চতুর্থ ঘটনাটি ঘটার পর থেকে পরিমাপের মান উঁচু অবস্থায় রয়েছে। কেন এমন হচ্ছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। গত জুনে দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল-এ ঘটনাগুলো নিয়ে প্রকাশিত গবেষণার অন্যতম লেখক পার্কের ধারণা, ভয়েজার-১ হয়ত এখনো সৌর বিস্ফোরণের পরবর্তী ধাক্কা বা আফটারশকের প্রভাবের মধ্যে রয়েছে।
আন্তঃনক্ষত্রীয় মহাকাশ ঠিক কোথা থেকে শুরু হয়েছে, তা এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। একইভাবে, হেলিওস্ফিয়ারের প্রকৃত আকৃতি নিয়েও রয়েছে মতভেদ। অধিকাংশ বিজ্ঞানীর ধারণা, এটি ধূমকেতুর মতো লম্বাটে। তবে কারও কারও মতে, এর আকৃতি গোলাকার কিংবা অর্ধচন্দ্রাকৃতির ক্রোয়াসঁ পেস্ট্রির মতো।
২০০৮ ও ২০২৫ সালে উৎক্ষেপিত ‘ইন্টারস্টেলার বাউন্ডারি এক্সপ্লোরার’ এবং ‘ইন্টারস্টেলার ম্যাপিং অ্যান্ড অ্যাক্সিলারেশন প্রোব’-এর মতো মহাকাশ অভিযানগুলো এসব অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সহায়তা করতে পারে।
এদিকে নিজেদের গন্তব্যের দিকে নীরবে এগিয়ে চলেছে ভয়েজার-১ ও ভয়েজার-২। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাকাশযান দুটির যন্ত্রপাতি সচল রাখার জন্য ব্যবহৃত শক্তির উৎস আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে ফুরিয়ে যেতে পারে। তখন পৃথিবীতে আর কোনো তথ্য পাঠাতে পারবে না তারা। পৃথিবীর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়ত একদিন চিরতরে থেমে যাবে, কিন্তু মহাকাশের গভীরে তাদের যাত্রা অব্যাহত থাকবে।
ভবিষ্যতে ভয়েজার-২ প্রায় ৪২ হাজার বছর পর লাল বামন নক্ষত্র ‘রস ২৪৮’-এর কাছাকাছি পৌঁছাবে। নক্ষত্রটি থেকে এর দূরত্ব হবে প্রায় ৭০০ আলোক-দিনের সমান। অন্যদিকে, ভয়েজার-১ প্রায় ৪৪ হাজার বছর পর তার পরবর্তী লক্ষ্য নক্ষত্র ‘গ্লিজ ৪৪৫’-এর কাছাকাছি যাবে। বিজ্ঞানী স্পিলকারের ভাষায়, ভয়েজার মহাকাশযান দুটি মানবজাতির নীরব দূত হয়ে উঠছে- মানব অস্তিত্বের একটি ক্ষুদ্র অংশ, যা মহাশূন্যে অনন্তের পথে এগিয়ে চলেছে।
ভবিষ্যতে কোনো ভিনগ্রহের সভ্যতা কিংবা অন্য কোনো বুদ্ধিমান প্রাণের সন্ধানে মহাকাশযান দুটি আবিষ্কৃত হলে, তাদের সঙ্গে থাকবে পৃথিবীর পক্ষ থেকে পাঠানো একটি বিশেষ বার্তা। সেটি হলো ‘গোল্ডেন রেকর্ড’। সোনায় মোড়ানো এই ফোনোগ্রাফ রেকর্ডের একটি করে কপি ভয়েজার-১ ও ভয়েজার-২-এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
রেকর্ড দুটিতে পৃথিবীর প্রকৃতি, মানুষ ও সভ্যতার নানা নিদর্শন তুলে ধরা হয়েছে। রয়েছে সৌরজগতের মানচিত্র, পৃথিবীর বিভিন্ন স্থাপনার ছবি, কয়েক ডজন ভাষায় শুভেচ্ছাবার্তা এবং তিমির ডাক, মানুষের হাসি, ধ্রুপদি সংগীত ও নাভাহো জনগোষ্ঠীর প্রার্থনাসংগীতের মতো নানা শব্দ।
স্পিলকারের মতে, এই মহাকাশযানগুলো এক ধরনের টাইম ক্যাপসুল, যা মানবজাতির আশাবাদ ও ভবিষ্যতের প্রতি বিশ্বাসের প্রতীক। এমনকি একদিন মানবসভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে গেলেও মহাকাশের গভীরে টিকে থাকতে পারে এই বার্তা।
সূত্র : সায়েন্স নিউজ
সময়ের আলো/মহু