ছবি : সংগৃহীত সময় মাপার নিয়মে আসছে বড় পরিবর্তন। এতদিন পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে ঘড়ির সময়ের হিসাব মেলাতে প্রয়োজন হলে এক সেকেন্ড যোগ করা হতো। এবার সেই নিয়ম থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বের সময় নির্ধারণকারী কর্তৃপক্ষ। এর বদলে সময়ের দুই হিসাবের ব্যবধান সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা পর্যন্ত বাড়তে দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হবে ২০২৭ সালের ২০ মে থেকে। সংবাদমাধ্যমে এই পরিবর্তনকে বলা হচ্ছে ‘লিপ আওয়ার’। তবে এখনই ঘড়িতে এক ঘণ্টা যোগ করার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সূত্র : নেচার, বিপিএম।
সময়ের হিসাব বদলাচ্ছে, কিন্তু কেন : আমরা সাধারণত দিনে ২৪ ঘণ্টা হিসাব করি। কিন্তু পৃথিবী নিজের অক্ষের চারদিকে সবসময় একই গতিতে ঘোরে না। চাঁদের আকর্ষণ, সমুদ্রের স্রোত, বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন এবং পৃথিবীর গভীরে গলিত পদার্থের চলাচলসহ নানা কারণে ঘূর্ণনের গতি কিছুটা ওঠানামা করে। ফলে পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে নির্ভুল ঘড়ির সময়ের সামান্য পার্থক্য তৈরি হয়।
এখানে দুটি সময়ের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। পারমাণবিক ঘড়ির ভিত্তিতে তৈরি সমন্বিত বিশ্বসময় বা ইউটিসি অত্যন্ত নির্ভুল। অন্যদিকে পৃথিবীর ঘূর্ণনের ভিত্তিতে নির্ধারিত সময়কে বলা হয় ইউটি১। সূর্যের অবস্থান ও দিন-রাতের সঙ্গে মানুষের প্রচলিত সময়ের সম্পর্ক বুঝতে দ্বিতীয় হিসাবটি গুরুত্বপূর্ণ। এই দুইয়ের ব্যবধান নিয়ন্ত্রণে রাখতেই এতদিন লিপ সেকেন্ড ব্যবহার করা হতো।
১৯৭২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে লিপ সেকেন্ড চালু হয়। এরপর থেকে এ পর্যন্ত মোট ২৭ বার এক সেকেন্ড যোগ করা হয়েছে। সবশেষবার যোগ করা হয়েছিল ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের শেষে।
এক সেকেন্ডেও কেন বিপদে প্রযুক্তি : শুনতে সামান্য মনে হলেও কম্পিউটার ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় সময়ের নির্ভুল হিসাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারনেট সার্ভার, ব্যাংকিং লেনদেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ, টেলিযোগাযোগ ও উপগ্রহনির্ভর নেভিগেশন— সব ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট সময় ধরে বিভিন্ন যন্ত্রের মধ্যে সমন্বয় রাখতে হয়।
২০১২ সালে লিপ সেকেন্ড যোগ করার পর কিছু কম্পিউটার ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। রেডিট ও লিংকডইনের মতো ওয়েবসাইটে সমস্যা হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার বিমান সংস্থা কোয়ান্টাসের ফ্লাইট পরিচালনাতেও বিঘ্ন ঘটে। কারণ সব সফটওয়্যার বাড়তি এক সেকেন্ড সামলানোর জন্য তৈরি ছিল না।
এবার বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ আরও একটি বিষয় নিয়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পৃথিবী কখনো কখনো তুলনামূলক দ্রুত ঘুরেছে। এই প্রবণতা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সময়ের হিসাব মেলাতে এক সেকেন্ড যোগ করার বদলে বরং এক সেকেন্ড বাদ দিতে হতে পারত। একে বলা হয় ‘নেগেটিভ লিপ সেকেন্ড’। এর আগে কখনো এমন সমন্বয় করা হয়নি। ফলে প্রযুক্তি ব্যবস্থায় বড় ধরনের ত্রুটি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
নতুন সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে ২০২৭ সালের ২০ মে দিন ২৫ ঘণ্টার হয়ে যাবে, কিংবা সেদিন সবার ঘড়িতে এক ঘণ্টা যোগ হবে। ওইদিন থেকে সময়ের দুই হিসাবের মধ্যে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যবধান মেনে নেওয়ার নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হবে। এক ঘণ্টার ব্যবধান তৈরি হলেই সেটি কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তা ভবিষ্যতের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এত বড় ব্যবধান তৈরি হতে বহু শতাব্দী, এমনকি হাজার বছরও লেগে যেতে পারে। অর্থাৎ আপাতত মানুষের দৈনন্দিন ঘড়ি, অফিস-আদালতের সময় কিংবা আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক ঘণ্টার কোনো তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আসছে না।
১৫ অক্টোবর ফ্রান্সের ভার্সাইয়ে অনুষ্ঠিত ওজন ও পরিমাপ বিষয়ক সাধারণ সম্মেলনে নতুন সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়। এর লক্ষ্য সময়ের আন্তর্জাতিক হিসাবকে নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে সময়ের আকস্মিক পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি কমানো।
সময়ের হিসাব তাই এবার এক নতুন পথে হাঁটছে। প্রকৃতির অনিয়মিত ঘূর্ণনের সঙ্গে প্রতি কয়েক বছর পরপর ঘড়ির সময় মেলানোর বদলে বিজ্ঞানীরা এমন ব্যবস্থা বেছে নিচ্ছেন, যাতে আধুনিক প্রযুক্তি নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে পারে। ‘লিপ আওয়ার’ এখনও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সমন্বয়ের নাম, তবে লিপ সেকেন্ডের বিদায় বিশ্বজুড়ে সময় গণনার ইতিহাসে বড় পরিবর্তনের সূচনা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি