সরকারি চাকরিতে শূন্য পদ সাড়ে পাঁচ লাখ

রফিকুল ইসলাম সবুজ

জাতীয়

সরকারি চাকরিতে ৫ লাখ ২১ হাজারের বেশি পদ শূন্য। এর মধ্যে শুধু দফতর-অধিদফতরেই খালি তিন লাখের বেশি পদ। অনুমোদিত পদের

2026-11-02T00:36:22+00:00
2026-11-02T00:36:22+00:00
 
  সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬,
১৮ কার্তিক ১৪৩৩
সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
জাতীয়
দীর্ঘসূত্রতায় গতি নেই নিয়োগে
সরকারি চাকরিতে শূন্য পদ সাড়ে পাঁচ লাখ
রফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৬ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
সরকারি চাকরিতে ৫ লাখ ২১ হাজারের বেশি পদ শূন্য। এর মধ্যে শুধু দফতর-অধিদফতরেই খালি তিন লাখের বেশি পদ। অনুমোদিত পদের প্রায় ২৬ শতাংশই খালি পড়ে থাকলেও এসব পদে নিয়োগের গতি অত্যন্ত ধীর। একদিকে জনবল সংকটে সরকারি দফতর-সংস্থায় স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘ নিয়োগ প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক জটিলতা, মামলা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনাগ্রহে শূন্যপদ পূরণে কার্যকর অগ্রগতি নেই। বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি প্রত্যাশিত মাত্রায়। ফলে উচ্চশিক্ষা শেষ করে চাকরির আশায় বছরের পর বছর ঘুরছেন লাখ লাখ তরুণ। হতাশা বাড়ছে শিক্ষিত বেকারদের মধ্যে।

সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ২৭২। এর বিপরীতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন। শূন্য রয়েছে ৫ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি পদ। অর্থাৎ সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত প্রতি চারটি পদের একটির বেশি খালি। এসব পদ পূরণে সরকারের পক্ষ থেকে তথ্য সংগ্রহ, নিয়োগ পরিকল্পনা এবং বিধিমালা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। 

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন দফতর ও সংস্থার প্রধানদের একটি অংশই নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করতে আগ্রহী নন। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান সাধারণত অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা হওয়ায় তাদের অনেকের কাছে সচিব পদে পদোন্নতি পাওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করলে নানা ধরনের তদবির ও চাপ সামলাতে হয়। এ কারণে অনেকেই নিয়োগের মতো ঝামেলায় যেতে চান না। 

এ ছাড়া চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর সচিবালয়ে সৃষ্ট অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তনের প্রভাবও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ কার্যক্রমে পড়েছে।

শূন্যপদের সবচেয়ে বড় অংশ সরকারের বিভিন্ন দফতর ও অধিদফতরে। এসব প্রতিষ্ঠানে খালি রয়েছে ৩ লাখ ১ হাজার ১৫২টি পদ। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনগুলোতে শূন্য পদের সংখ্যা ১ লাখ ৯৯ হাজার ৩৮৪। এ ছাড়া মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ৬ হাজার ৮০৮টি এবং বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ১৪ হাজার ৫৭৮টি পদ খালি রয়েছে। 

গ্রেডভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ৮২ হাজার ২১৬টি পদ খালি রয়েছে ২০তম গ্রেডে। ১৬তম গ্রেডে শূন্য ৭৯ হাজার ৮৬৮টি এবং দশম গ্রেডে ৬৮ হাজার ৪১৩টি পদ। এ ছাড়া ১১তম গ্রেডে ৫২ হাজার ৬২৪টি এবং নবম গ্রেডে ৪৯ হাজার ৯৮৪টি পদ খালি রয়েছে। নবম গ্রেডে বিসিএসের মাধ্যমে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। 

পরিসংখ্যান অনুযায়ী জনবল সংকট শুধু কেন্দ্রীয় প্রশাসনে সীমাবদ্ধ নয়, সরকারের বিস্তৃত দাফতরিক কাঠামোজুড়েই রয়েছে। বিশেষ করে অধিদফতর ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক পদ খালি থাকায় মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও নাগরিকসেবা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, শূন্যপদ পূরণে কোন দফতরে কত পদ খালি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া কী পর্যায়ে রয়েছে এসব তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং অর্থ বিভাগ। এ জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে শূন্যপদের তালিকা, অনুমোদিত সাংগঠনিক কাঠামো এবং চলমান নিয়োগ কার্যক্রমের তথ্য পাঠাতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সব মন্ত্রণালয় ও অধীন দফতর-সংস্থার ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের শূন্য পদের তালিকা ধরে নিয়োগ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগেও পাঠানো হয়েছে। 

বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন দফতর-সংস্থা এবং মাঠ প্রশাসনে নতুন নিয়োগ ও পদোন্নতির মাধ্যমে ৪ হাজার ৪৫৯টি শূন্যপদ পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এই লক্ষ্যমাত্রা দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের মোট শূন্যপদের জন্য নয়। এটি শুধু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও এর আওতাধীন নির্দিষ্ট কয়েকটি সংস্থার ক্ষেত্রের পরিকল্পনা।

সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনার অগ্রগতি প্রতিবেদনেও নিয়োগ ও পদোন্নতির মাধ্যমে শূন্যপদ পূরণের তথ্য রয়েছে। সেখানে মাঠ প্রশাসনে ৯৮১টি, দফতর-সংস্থায় ১ হাজার ৪৫টি এবং মন্ত্রণালয়ে ৩৫টি পদের বিপরীতে নিয়োগের তথ্যের পাশাপাশি ২৬১টি শূন্যপদে নিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। 

এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় ৪৭ হাজার ৩২৬টি পদ সৃজন, ১৮ হাজার ৮৯৩টি পদ সংরক্ষণ এবং ২৯৩টি পদ স্থায়ীকরণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্মতি দিয়েছে। শূন্যপদ পূরণের পাশাপাশি নিয়োগ ও পদোন্নতির কাঠামোগত জটিলতা দূর করতে ‘কমন নিয়োগ বিধিমালা ২০১৯’ যুগোপযোগী করার কাজ চলছে। পাশাপাশি সরকারি চাকরি (সংশোধন) আইন, ২০২৬ এবং বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে সরাসরি নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণসংক্রান্ত আইন প্রণয়নের কার্যক্রম চলছে।

সরকারি চাকরিতে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির আড়াই লাখেরও বেশি খালি পদ দ্রুত পূরণের উদ্যোগ বিভিন্ন সময়ে নেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারও সরাসরি নিয়োগযোগ্য এসব পদ পূরণে উদ্যোগ নিয়েছিল। গত বছরের শুরুর দিকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দফতর-সংস্থাগুলোকে এক মাসের মধ্যে নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করার অনুরোধ জানিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

অন্যদিকে ১৩ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের নিয়োগে নতুন কর্তৃপক্ষ ও পদ্ধতি নির্ধারণে পিএসসির প্রস্তাব যাচাই করে সুপারিশ দেওয়ার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছিল। একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটি পিএসসির মাধ্যমে ১৩ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগের সুপারিশ করে। তবে বর্তমান সরকার এ সুপারিশ বাস্তবায়নে এখনও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের একটি বড় অংশ এখন বেকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে অনেকেই সরকারি চাকরিকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নিয়ে বছরের পর বছর বিসিএসসহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একের পর এক পরীক্ষায় অংশ নিয়েও কাঙ্ক্ষিত চাকরি না পাওয়ায় তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। চাকরিপ্রত্যাশীর তুলনায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অস্থিতিশীলতাও চাকরির বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। 


সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রশাসনে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। অন্তর্বর্তী সরকার গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেয়। এতে প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়াও অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। পরে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে নিয়োগ ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার বাস্তবায়ন হয়নি। এ ছাড়া নিয়োগসংক্রান্ত বিরোধ আদালতে গড়ালে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে। ফলে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে শুরু করে পরীক্ষা, ফলাফল, চূড়ান্ত সুপারিশ এবং নিয়োগপত্র দেওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লেগে যায়।

সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, পাঁচ লাখ শূন্যপদ পূরণ করা হলে প্রায় পাঁচ লাখ পরিবারের ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ উপকৃত হবেন। একদিকে বেকারদের কর্মসংস্থান হবে, অন্যদিকে হাজারো পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। তাই দ্রুত এসব পদে নিয়োগের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, সরকার শূন্যপদ পূরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি দুই বিষয়েই গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। শূন্যপদ পূরণ সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রমের অংশ। পিএসসি থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিচ্ছে। কর্মকর্তারা অবসরে যাবেন, আবার পদ পূরণ হবে এভাবেই প্রক্রিয়া চলতে থাকবে। 

তিনি বলেন, শূন্যপদগুলো পূরণে ছয় মাস, এক বছর ও পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিসিএসসহ অন্যান্য সরকারি চাকরির নিয়োগে প্রচলিত মুখস্থনির্ভর সিলেবাসের পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা বর্তমান কমিশনের অন্যতম লক্ষ্য। এ জন্য বিসিএস পরীক্ষার সিলেবাস পরিবর্তনে একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটি বিভিন্ন দেশের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার সিলেবাস পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সংযোজনের কাজ করছে। পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে এক বছরের মধ্যে একটি বিসিএস সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া চলছে।

সময়ের আলো/এসএকে
  বিষয়:   সরকারি চাকরি  শূন্য পদ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: