ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস সাক্ষাৎ করেন। ছবি : ফার্স্টপোস্ট ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করছে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া। চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দুই দেশ সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ মহড়া ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অস্ট্রেলিয়া সফরে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে সম্মত হয় দুই দেশ। এসব চুক্তিতে সামুদ্রিক ও সাইবার নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ এবং যৌথ সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
গত দুই দশকে ভারত-অস্ট্রেলিয়া সম্পর্ক বাণিজ্য ও অভিবাসনের গণ্ডি পেরিয়ে প্রতিরক্ষা খাতেও বিস্তৃত হয়েছে। নিয়মিত সামরিক মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই অংশীদারি আরও শক্তিশালী হচ্ছে। তবে যোগাযোগব্যবস্থা, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও সামরিক সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণের মতো কিছু বাধাও রয়েছে।
যেভাবে ঘনিষ্ঠ হলো দুই দেশের সম্পর্ক
ঐতিহাসিকভাবে কয়েকটি কারণে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার কৌশলগত সম্পর্ক খুব একটা ঘনিষ্ঠ ছিল না। স্নায়ুযুদ্ধের সময় অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের মিত্র হিসেবে কাজ করলেও ভারত জোটনিরপেক্ষ অবস্থানে ছিল। ১৯৭১ সালের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে পাকিস্তানের নিরাপত্তা সম্পর্কও দুই দেশের দূরত্ব বাড়িয়েছিল।
ভারতের পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় বাধা সৃষ্টি করে। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সীমিত ছিল। অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন ‘হোয়াইট অস্ট্রেলিয়া’ নীতির কারণে দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগও বাধাগ্রস্ত হয়।
২০০০ সালে অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ডের ভারত সফরের পর সম্পর্ক উন্নয়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ওই বছর প্রতিরক্ষা আলোচনা এবং ২০০১ সালে প্রথম কৌশলগত সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
২০০৪ সালে সুনামির পর ভারত, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান যৌথভাবে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করে। ২০০৬ সালে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি হয়। পরের বছর প্রথম কোয়াড সংলাপ ও মালাবার নৌ-মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। তবে ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়া কোয়াড থেকে সরে যায়। একই সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়।
পরবর্তী সময়ে চীনের সামরিক তৎপরতা, দক্ষিণ চীন সাগরে দেশটির অবস্থান এবং সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ভারত ও অস্ট্রেলিয়াকে আরও কাছাকাছি আনে। ২০১৭ সালে ডোকলাম সীমান্তে ভারত-চীন উত্তেজনাও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।
২০০৯ সালে দুই দেশ নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে প্রথম যৌথ ঘোষণা দেয়। ২০১১ সালে বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শুরু হয়। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির অস্ট্রেলিয়া সফরের সময় নিরাপত্তা সহযোগিতার কাঠামো তৈরি হয়। এরপর যৌথ সামরিক মহড়া শুরু হয়। ২০১৭ সালে কোয়াড পুনরায় সক্রিয় হয় এবং ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার সামরিক মহড়ায় অংশ নেয় ভারতীয় বিমানবাহিনী।
২০১৯ সালের পর চীনকে ঘিরে দুই দেশের উদ্বেগ আরও বাড়ে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে চীনের বাণিজ্য বিরোধ ও সাইবার হামলার ঘটনা এবং ২০২০ সালে ভারত-চীন সীমান্ত সংঘাত সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করে। ওই সংঘাতে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন। এরপর চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেয় ভারত।
২০২০ সালের পর সহযোগিতায় নতুন গতি
২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদি ও স্কট মরিসন পুনরায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০২০ সালে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া ‘সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারি’ প্রতিষ্ঠা করে। একই সঙ্গে সামুদ্রিক ও সাইবার নিরাপত্তা, সামরিক সরঞ্জাম এবং রসদ সরবরাহ নিয়ে কয়েকটি চুক্তি করে।
২০২১ সালে দুই দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা বৈঠক করেন। এ সময় অস্ট্রেলিয়ার ‘তালিসমান সাবর’ সামরিক মহড়ায় অংশ নিতে সম্মত হয় ভারত। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, আধুনিক প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও মহাকাশ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০২৪ সালে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। একই বছর আকাশে এক বিমান থেকে অন্য বিমানে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থাপনা নিয়েও দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছায়।
২০২৫ সালের অক্টোবরে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের অস্ট্রেলিয়া সফরে নিয়মিত প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি দুই দেশের সামরিক বাহিনীর যৌথ মহড়াও বেড়েছে। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ভারত ও অস্ট্রেলিয়া ১৪টি দ্বিপক্ষীয় এবং ৬৪টি ত্রিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে।
২০২১ সালে দুই দেশের নৌবাহিনী পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে যৌথ নির্দেশিকা স্বাক্ষর করে। ‘অসইন্ডেক্স’ নামের যৌথ নৌ-মহড়ায় সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধ ও যুদ্ধবিমান পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, স্থলবাহিনীর ‘অস্ত্রাহিন্দ’ মহড়ায় ড্রোন পরিচালনা ও ড্রোন প্রতিরোধের কৌশলে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালের মহড়ায় উভচর যুদ্ধ এবং উপকূলীয় এলাকায় সামরিক অভিযান পরিচালনার প্রশিক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে।
যৌথ প্রতিরক্ষা উৎপাদনে আগ্রহ
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করতে যৌথভাবে সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি উৎপাদনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে দুই দেশ। বিশেষ করে ড্রোন প্রতিরোধব্যবস্থা, সাঁজোয়া যান এবং চালকবিহীন ডুবোযান তৈরিতে যৌথ উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া সামুদ্রিক নজরদারি, পি-৮ নজরদারি বিমানের পারস্পরিক ব্যবহার এবং নৌযান ও সাবমেরিন মেরামতে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণেও যৌথ উদ্যোগের সুযোগ রয়েছে।
সহযোগিতায় যেসব বাধা
সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এর মধ্যে নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থার অভাব, সামরিক সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত জটিলতা এবং দ্রুত ভিসা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্য।
অস্ট্রেলিয়ার সামরিক ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। ফলে ভারত-অস্ট্রেলিয়ার দ্বিপক্ষীয় সামরিক কার্যক্রমে অনেক সময় যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদানে জটিলতা দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নীতির কারণেও সামরিক বিমানের খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও মেরামতের কাজ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এ ছাড়া সামরিক মহড়া, বন্দর পরিদর্শন ও অন্যান্য কার্যক্রমে অংশ নিতে দুই দেশের সেনাসদস্যদের দ্রুত ভিসা পাওয়ার সুযোগ সীমিত। এসব সমস্যা সমাধান না হলে যৌথ সামরিক অভিযান ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণ কঠিন হতে পারে।
ইন্দো-প্যাসিফিকে কেন গুরুত্বপূর্ণ
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেও ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশ ভারত মহাসাগরের দুই প্রান্তে অবস্থিত। তাদের বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য হরমুজ ও মালাক্কা প্রণালিসহ গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখা জরুরি।
এ ছাড়া ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা নীতিতে অনিশ্চয়তা দুই দেশকে নিজেদের নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অকাস চুক্তি করেছে। অন্যদিকে, ভারতও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, মহাকাশ ও উন্নত প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়িয়েছে।
তবে ওয়াশিংটনের নীতিগত অনিশ্চয়তার মধ্যে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া বিকল্প অংশীদারত্বের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে যৌথ সামরিক সক্ষমতা, সমুদ্র নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়ানো দুই দেশের কৌশলগত অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ