আমির হোসেন শাওন। ছবি : সময়ের আলোযেই মানুষটি একসময় ঘরের কোণে কিংবা উঠানে সাপ দেখলেই লাঠি হাতে ছুটে যেতেন মারার জন্য, সেই মানুষটিই এখন সাপের প্রাণ বাঁচাতে ছুটে যান দূরদূরান্তে। মারতে গিয়ে সাপ বেঁচে গেলে স্বস্তি পেতেন না, সময়ের ব্যবধানে সেই সাপের জীবন বাঁচিয়ে মানসিক শান্তি পান তিনি ।
শত্রুতা থেকে সাপের প্রতি এই ভালোবাসার গল্প চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার চরণদ্বীপের আমির হোসেন শাওনের। ২০২২ সালে নিজের ঘরে সাপ প্রবেশের একটি ঘটনা তার চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনে। এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৫০০ সাপ উদ্ধার করেছেন তিনি, যেগুলোর মধ্যে বিষধর পদ্মগোখরার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। কাজ করছেন 'ওয়াইল্ড স্নেক রেসকিউ টিম'-এর বোয়ালখালী প্রতিনিধি হিসেবে।
শাওনের এই ব্যতিক্রমী পথচলার শুরুটা ছিল কৌতূহল থেকে। জীবনের একটা পর্যায়ে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, সাপ না মেরেও নিরাপদে উদ্ধার করা যায়। এরপর ফেসবুক ও ইউটিউবে এ বিষয়ে খোঁজখবর নিতে থাকেন। জানতে পারেন, সাপ উদ্ধারে কাজ করছে একটি দল। সেই দলের সাথে যোগাযোগের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নেন। পরে যুক্ত হন ওয়াইল্ড স্নেক রেসকিউ টিমের সঙ্গে। নেন আরও প্রশিক্ষণ, শুরু করেন সাপ উদ্ধারের কাজ।
তবে এই কাজের শুরুর অভিজ্ঞতা ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। বোয়ালখালীর পূর্ব চরণদ্বীপ মাইজপাড়ায় একটি সাপ উদ্ধারের ডাক পান তিনি। তখনো সংগঠনের পক্ষ থেকে এককভাবে রেসকিউয়ের অনুমতি পাননি। কিন্তু মানুষের নিরাপত্তার কথা ভেবে প্রশিক্ষকের পরামর্শ নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। স্থানীয়রা সাপটিকে দাড়াশ বলে ধারণা করলেও ছবি দেখে প্রশিক্ষক জানান, সেটি বিষধর পদ্মগোখরা। সাপটি উদ্ধারের সক্ষমতা আছে কি না, প্রশিক্ষক জানতে চাইলে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সম্মতি দেন শাওন। পরে সফলভাবে উদ্ধার করেন সাপটি। এটিই ছিল তাঁর প্রথম দিকের বড় রেসকিউ অভিজ্ঞতা।
সাপ উদ্ধারের কাজ রোমাঞ্চকর হলেও অনেক ঝুঁকি রয়েছে। ঝুঁকির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, একবার পোপাদিয়া ইউনিয়নের কালাচাঁদ ঠাকুর বাড়ি এলাকায় একটি ঘর থেকে দুধরাজ সাপ উদ্ধারের সময় সাপটি তাকে কামড় দেয়। ঘরের একজনের দেওয়া আলোতে সাপটি উদ্ধার করছিলেন শাওন। একপর্যায়ে সাপটি হাতে নেওয়ার পর ওই ব্যক্তি আলো নিয়ে চলে গেলে সাপটি তার বাঁ হাতে কামড় দেয়। তবে দুধরাজ নির্বিষ হওয়ায় বড় কোনো সমস্যা হয়নি। তারপরও সতর্কতামূলক টিটেনাস টিকা নেন তিনি।
সাপ বাঁচানোর কাজে নিজেকে যুক্ত করার কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। সাপ ইঁদুর খেয়ে কৃষকের ফসল রক্ষায় ভূমিকা রাখে। বিষয়টি জানার পর সাপ না মেরে উদ্ধারের চিন্তা আসে। এখন তাঁর লক্ষ্য মানুষ ও সাপের মধ্যকার সংঘাত কমানো এবং সাপ সম্পর্কে মানুষের ভুল ধারণা দূর করা।
পদ্মগোখরা ছাড়াও শঙ্খিনী, গ্রিন ভাইপার, মেঠো সাপ, অজগর, ঘরগিন্নি, দাড়াশ ও দুধরাজসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ উদ্ধার করেছেন তিনি। অজগরও উদ্ধার করেছেন প্রায় ৩০টি । মাসখানেক আগে বোয়ালখালীর কেরানীবাজার এলাকা থেকে প্রথমবারের মতো উদয়কাল প্রজাতির একটি সাপ উদ্ধার করেন।
উদ্ধারকৃত সাপ বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে উপযুক্ত স্থানে অবমুক্ত করেন শাওন। বোয়ালখালীর পাশাপাশি পটিয়া, আনোয়ারা ও বাঁশখালীসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় উদ্ধারকাজ চালান তিনি।
কনস্ট্রাকশনের কাজের পাশাপাশি সাপ উদ্ধারের কাজ করেন শাওন। শুরুতে এ কাজে এলাকাবাসীর পাশাপাশি পরিবার থেকেও বাধা এসেছিল। অনেকে তাকে টিটকারি করতেন সাপুড়ে বলে। তবু থেমে যাননি তিনি। লোকালয়ে সাপ ঢুকেছে—এমন খবর পেলেই বিপদের কথা উপেক্ষা করে হাজির হন ঘটনাস্থলে। কখনো বসতঘরে, কখনো পাহাড়ে, আবার কখনো নদীর পাড়ে। উদ্ধারের জন্য কারও কাছে পারিশ্রমিকও দাবি করেন না।
চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে ইসলামি ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা শাওনের প্রাণী নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা না থাকলেও প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিখেছেন সাপ উদ্ধারের কৌশল।
শাওনের মতে, অনেকে এ কাজে আসেন জনপ্রিয়তা কিংবা ছবি তোলার উদ্দেশ্য নিয়ে। কিন্তু পরিবেশ ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণের মানসিকতা না থাকলে এ কাজে টিকে থাকা কঠিন।
সাপ দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ দেন শাওন। সাপকে আঘাত করা কিংবা নিজে ধরতে যাওয়ার কারণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই অভিজ্ঞ উদ্ধারকর্মীর সহায়তা নেওয়া উচিত। আর সাপে কামড়ালে ওঝা-কবিরাজের কাছে না গিয়ে দ্রুত সরকারি হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ তাঁর।
সাপের শত্রু থেকে বন্ধু হয়ে ওঠা শাওনের চাওয়া, সাপ দেখলে মানুষ যেন ভয় পেয় তাকে মেরে না ফেলে। বরং নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে উদ্ধারের ব্যবস্থা করে। মানুষ ও সাপের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই এখন তার মূল লক্ষ্য।
সময়ের আলো/এমআই/আতা