বন্ধ ময়মনসিংহ জুট মিল। ছবি : সময়ের আলোএকসময় হাজারো শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্যে মুখরিত ছিল ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী জুট মিল। সময়ের ব্যবধানে সেই শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখন পরিত্যক্ত প্রায়। দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকায় বেকার হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার শ্রমিক। কর্মসংস্থান হারিয়ে পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের। অন্যদিকে, অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে কারখানার মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো। স্থানীয়দের অভিযোগ, মিলের ভেতর থেকে প্রতিনিয়ত চুরি হচ্ছে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রাংশ ও মালামাল। এতে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আশপাশের ব্যবসা-বাণিজ্যও।
শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মিলটি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে না দিয়ে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পুনরায় চালু করা হোক। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বন্ধ মিলটি চালুর বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে পরিদর্শন ও উদ্যোগ গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
সরেজমিনে মিল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একসময়ের কর্মচঞ্চল কারখানাটির চারপাশ এখন নীরব ও জনমানবহীন। সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে জীর্ণ অবকাঠামো, আগাছায় ঢাকা চত্বর আর পরিত্যক্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের আবাসিক কোয়ার্টার মিলটির করুণ অবস্থার চিত্র তুলে ধরছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় অনেক স্থাপনা জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
মিলের ভেতরে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহের চেষ্টা করলে বাধা দেন নিরাপত্তাকর্মী। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া প্রবেশ ও ছবি তোলা যাবে না বলে জানান তিনি। তবে মিল কর্তৃপক্ষের এমন অসহযোগিতার বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মিলের প্রধান ফটকে ঝোলানো একটি নোটিশে বন্ধ রাখার কারণ হিসেবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নোটিশে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজারে পাটজাত পণ্যের চাহিদা কমেছে। কাঁচা পাটের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং মানসম্মত পাটের সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে উৎপাদিত পণ্য বিক্রিতে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়, মিলের যন্ত্রপাতি ৫০ থেকে ৫৫ বছরের পুরোনো হওয়ায় সেগুলোর কর্মক্ষমতা কমে গেছে। এতে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। লোকসানের মুখে পড়ায় মিলের আধুনিকায়ন ও নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজনের জন্য পরিচালনা পর্ষদের কাছে আবেদন করা হয়েছে। আধুনিকায়ন প্রকল্পের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আপাতত মিল বন্ধ রাখা অথবা আংশিকভাবে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে কিছু বিভাগ চালু রাখা হতে পারে। মিল পুনরায় চালুর তারিখ পরে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের কাজের বিপরীতে বকেয়া ও সাপ্তাহিক মজুরি নিয়ম অনুযায়ী পরিশোধের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতার পর দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করা এবং পাটশিল্পের বিকাশের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে ময়মনসিংহ নগরের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের চর কালিবাড়ি এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে প্রায় ৬৯ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠা করা হয় ময়মনসিংহ জুট মিলস লিমিটেড। তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম ১৯৭৪ সালের ৯ মে আনুষ্ঠানিকভাবে মিলটির উদ্বোধন করেন।
ময়মনসিংহ অঞ্চল উন্নতমানের পাট উৎপাদনের জন্য পরিচিত হওয়ায় কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং নৌপথে যোগাযোগের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত উৎপাদনে যায় প্রতিষ্ঠানটি। মিলটির স্বর্ণযুগে দৈনিক ভিত্তিক ও নিয়মিত মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক এবং দেড় শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর কর্মসংস্থান হয়েছিল। দৈনিক প্রায় ৫০ মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল কারখানাটির। সে সময় দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে উৎপাদন ভালো থাকলেও পরবর্তী সময়ে নানা অব্যবস্থাপনা, জটিলতা, দুর্নীতি ও লোকসানের কারণে সংকটে পড়ে মিলটি। একপর্যায়ে ১৯৯৩ সালে তৎকালীন সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও লোকসানের কারণ দেখিয়ে এটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। একসঙ্গে ছাঁটাই করা হয় কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের। এতে রাতারাতি কর্মহীন হয়ে পড়েন কয়েক হাজার মানুষ।
শ্রমিকদের অভিযোগ, মিল বন্ধের সময় তাদের কোটি টাকার বেশি বকেয়া মজুরি ও সার্ভিস বেনিফিট পরিশোধ করা হয়নি। জীবিকার তাগিদে অনেকে রিকশা চালানো, দিনমজুরি ও কুলির কাজ শুরু করেন। তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও অনেক সাবেক শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার এখনো পাওনা পুরোপুরি বুঝে পাননি। পাওনা আদায়ের অপেক্ষায় থাকা অনেক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর সরকারের পাটকল বেসরকারীকরণ নীতির আওতায় ২০১৪ সালের অক্টোবরে প্রায় ৪৭ একর জায়গাসহ মিলটি বেসরকারি খাতে দেওয়া হয়। শিল্পপ্রতিষ্ঠান শামীম এন্টারপ্রাইজ প্রাইভেট লিমিটেড ইজারা বা মালিকানার মাধ্যমে এর দায়িত্ব নেয়। তবে নানা জটিলতায় পরবর্তী সময়ে আবারও উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
মিলটির সাবেক শ্রমিক আব্দুল মালেক আকন্দ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা না পেয়ে তারা ঋণের বোঝায় জর্জরিত। হঠাৎ মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগও পাননি অনেকে। সন্তানদের পড়াশোনা ও পরিবারের চিকিৎসার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে তাদের চলতে হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলিফ বলেন, জুট মিলটি একসময় এ অঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল। মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ছোট-বড় অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুরো এলাকায় অর্থনৈতিক স্থবিরতা নেমে এসেছে। পাশাপাশি চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনাও বেড়েছে।
ময়মনসিংহ জেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মফিদুল ইসলাম মোহন বলেন, তাদের দাবি, জুট মিলটি বিজেএমসির কাছে হস্তান্তর করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পুনরায় চালু করা হোক। সরকারি উদ্যোগে মিলটি চালু হলে হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থান ফিরে আসবে এবং তাদের পরিবারগুলো উপকৃত হবে। দীর্ঘদিন ধরে কর্মহীন শ্রমিকেরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাঁদের জীবিকা ও অধিকার রক্ষায় দ্রুত মিলটি চালু করা প্রয়োজন।
সাবেক কোতোয়ালি শ্রমিক দলের সভাপতি ও জুট মিলের সমবায় সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বলেন, মিলটি চালু হলে হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তাদের পরিবারগুলোও ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারবে। শুধু শ্রমিকেরাই নন, মিল বন্ধ থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও। এলাকাটি মূলত শ্রমিকনির্ভর হওয়ায় কারখানার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে পুরো অঞ্চলে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মিলটি বন্ধ থাকায় যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন মালামাল চুরি হচ্ছে। ইতোমধ্যে কোটি কোটি টাকার সম্পদ খোয়া গেছে। তার মতে, সমবায় সমিতির সদস্যরা আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখলে মিলটি বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদার বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বন্ধ কলকারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শরিফুল আলম সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে নিয়ে বন্ধ জুট মিলটি পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শন শেষে তিনি একটি প্রতিবেদন দিয়েছেন। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমানে কাজ চলছে।
মোতাহার হোসেন তালুকদার আরও বলেন, তারা চান দ্রুত মিলটি চালু হোক। এতে শ্রমিকেরা চাকরি ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাবেন। অন্যথায় তাদের পরিবারের পুনর্বাসনের বিষয়টিও বিবেচনায় আসবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অচলাবস্থা কাটিয়ে ঐতিহ্যবাহী ময়মনসিংহ জুট মিল পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, সরকারি উদ্যোগে মিলটির উৎপাদন শুরু হলে একদিকে যেমন হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে ফিরবে স্থানীয় অর্থনীতির হারানো গতি।
সময়ের আলো/জোই