লম্বাশিয়ায় পাহাড় কেটে বালু উত্তোলন বন্ধের উদ্যোগ

লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

সারাদেশ

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের লম্বাশিয়ায় পাহাড় কেটে বালু উত্তোলন-পাচার বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে চুনতি বনবিভাগ। মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে

2026-11-04T20:58:24+00:00
2026-11-04T20:58:24+00:00
 
  বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬,
২০ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
সময়ের আলোতে সংবাদ প্রকাশ
লম্বাশিয়ায় পাহাড় কেটে বালু উত্তোলন বন্ধের উদ্যোগ
লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ৮:৫৮ পিএম 
চুনতি বন রেঞ্জ সাতগড় লম্বাশিয়া এলাকায় বিকল্প পাহাড়ি পথ গাছ দিয়ে পথ বন্ধ করে দিয়েছে। ছবি : সময়ের আলো
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের লম্বাশিয়ায় পাহাড় কেটে বালু উত্তোলন-পাচার বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে চুনতি বনবিভাগ। মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে চুনতি বন রেঞ্জ সাতগড় লম্বাশিয়া এলাকায় বিকল্প পাহাড়ি পথ গাছ দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে। গত ৩১ অক্টোবর সময়ের আলো অনলাইনসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ‘চুনতি সংরক্ষিত বনে আবারও বালু উত্তোলন-পাচারের পাঁয়তারা’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর বনবিভাগ এ উদ্যোগ নেয়।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের চুনতি রেঞ্জ বন কর্মকর্তা আবির হাসান বলেন, পাহাড় কেটে বালু পাচার রোধে চুনতি বনাঞ্চলের লম্বাশিয়া নামক স্থানে বান্দরবানের দিকে যে পাহাড়ি পথ রয়েছে তাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। বালু উত্তোলন ও পরিবহন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এটি যাতে পুনরায় চালু না হয় তাই এই উদ্যোগ করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, লম্বাশিয়া এলাকায় বনবিভাগের নিয়মিত টহল জোরদার রয়েছে। আগে উত্তোলিত বালু সরিয়ে নেওয়া কিংবা পাহাড় ধ্বংস করে নতুন করে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। এ ধরণের অপচেষ্টা কেউ করলে কঠোরভাবে দমন করা হবে। 

জানা গেছে, বনবিভাগ, উপজেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদফতর বিভিন্ন সময় অভিযান, মামলা এবং বালু পরিবহনের সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেও দীর্ঘদিনের এ তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। সর্বশেষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের নির্দেশনায় বালু উত্তোলনস্থলে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ করে সুরক্ষাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। 

তবে অভিযোগ উঠেছে, সেই ব্যবস্থা এড়িয়ে নতুন রাস্তা তৈরি করে আগে উত্তোলন করা বালু পরিবহন এবং পুনরায় পাহাড় কেটে বালু উত্তোলনের পায়তারা শুরু হয়েছে। এতে সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষায় নেওয়া উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দীর্ঘ বহু বছর ধরে চুনতি ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাতগড় লম্বাশিয়া এলাকায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাহাড় কেটে ও ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উপজেলা প্রশাসন ও বনবিভাগ অভিযান চালিয়েছে। কখনো বালু পরিবহনের রাস্তা কেটে দেওয়া হয়েছে, কখনো যন্ত্রপাতি জব্দ ও মামলা করা হয়েছে। তবে অভিযান শেষে কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবারও বালু উত্তোলন শুরু হতো। ফলে দীর্ঘদিনেও বন্ধ করা যায়নি বনাঞ্চল ধ্বংসের এই তৎপরতা।

২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল ওই এলাকা পরিদর্শন করেন তৎকালীন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এ সময় তিনি পাহাড় কাটায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং বালু উত্তোলনস্থল এমনভাবে সুরক্ষিত করার নির্দেশ দেন। উপদেষ্টার নির্দেশনার পর বালু উত্তোলনস্থলে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। 

এতে পাহাড় কেটে বালু উত্তোলন ও পরিবহনের কার্যক্রম বন্ধে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। তবে সম্প্রতি বন্ধ করে দেওয়া প্রবেশপথের বিকল্প হিসেবে নতুন রাস্তা তৈরি করে আগে উত্তোলন করা বালু পরিবহন এবং পুনরায় পাহাড় কেটে বালু উত্তোলনের পায়তারার অভিযোগ উঠেছে একটি মহলের বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, নতুন রাস্তা ব্যবহার করে বালু পরিবহনের সুযোগ তৈরি হলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আবারও পাহাড় ধ্বংসের কার্যক্রম শুরু হতে পারে। এতে বন রক্ষায় নেওয়া আগের উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, লম্বাশিয়া এলাকায় প্রায় এক যুগ ধরে পাহাড় কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের চুনতি রেঞ্জের সাতগড় বনবিটের আওতাধীন এ এলাকায় বালু উত্তোলনে শ্যালো মেশিন স্থাপন, পাহাড়ি ছড়া থেকে বালু সংগ্রহ এবং তা পরিবহনে অস্থায়ী সড়ক নির্মাণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ২০২৩ সালের ২৪ নভেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তর ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১০ জনকে আসামি করে থানায় মামলা করে। এর মাত্র তিন দিন পর ২৭ নভেম্বর অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে সৃষ্ট গভীর গর্তের পানিতে পড়ে একটি বন্যহাতির মৃত্যু হয়।

এরপর ২০২৪ সালের ৯ জানুয়ারি উপজেলা প্রশাসন ও বনবিভাগ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে বালু পরিবহনের জন্য তৈরি সড়কের বিভিন্ন অংশ কেটে দেয়।

এতে কয়েক মাস বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও পরবর্তী সময়ে সড়ক সংস্কার করে আবারও উত্তোলন কার্যক্রম শুরু করে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২০ মার্চ উপজেলা প্রশাসন ও বনবিভাগের যৌথ অভিযানে বালু পরিবহনের পাঁচটি স্থানে সড়ক কেটে দেওয়া হয়। তবে এসব অভিযানেও স্থায়ী সমাধান আসেনি। অভিযান শেষ হওয়ার কিছুদিন পরই আবারও বালু উত্তোলনের তৎপরতা শুরু হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর অভিযান পরিচালনা ও পরিবহনের সড়ক বিচ্ছিন্ন করা হলেও অবৈধ বালু উত্তোলন স্থায়ীভাবে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে একটি মহল উত্তোলিত বালু পরিবহণ ও নতুনভাবে পাহাড় ধ্বংস করে বালু উত্তোলনের অপচেষ্টা চলাচ্ছে। ফলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন তারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, লম্বাশিয়ায় পাহাড়ের দিকে যাওয়ার পথে একটি সেতুর দুই পাশে বালুবাহী যানবাহনের চলাচল বন্ধ রাখতে প্রতিবন্ধকতা এখনো বহাল রয়েছে। আগে উত্তোলিত ৩টি বালুর স্তূপ এখনো আগের মতোই আছে। তবে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, ওই স্থানে নতুন রাস্তা তৈরি করে আগে উত্তোলন করা বালু পরিবহন ও পাচারের পাশাপাশি পুনরায় পাহাড় কেটে বালু উত্তোলনের অপচেষ্টা চালাচ্ছে একটি মহল।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, চুনতি সংরক্ষিত বনাঞ্চল কেবল গাছপালার সমষ্টি নয়। এটি বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে এশীয় হাতিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর বিচরণ ও চলাচলের জন্য এ বনাঞ্চলের ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লম্বাশিয়ায় পাহাড় কেটে বালু উত্তোলনের ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তিত হচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে গভীর গর্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাহাড়ি ছড়া ও আশপাশের ভূমি। এ ধরনের কার্যক্রম দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকলে ভূমিক্ষয় ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও খাদ্যের উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের স্বাভাবিক বিচরণ ও চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বায়েজীদ বিন আখন্দ জানান, লম্বাশিয়া এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, ও পরিবেশ ধ্বংসের অপচেষ্টা চলালে তাদের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বালু উত্তোলন বা পরিবহনের চেষ্টা করলে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। লম্বাশিয়ায় অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে নজরদারি অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর চট্টগ্রামের প্রধান সমন্বয়কারী মুনিরা পারভীন রুবা বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পাহাড় কেটে বালু উত্তোলন ও পাচারের সাথে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা উচিত। বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় প্রশাসনকে জোরালো ভূমিকা রাখা দরকার।

সময়ের আলো/এনএন
  বিষয়:   লোহাগাড়া  চট্টগ্রাম  লম্বাশিয়া  পাহাড় কেটে বালু উত্তোলন  বন্ধ  সময়ের আলোতে সংবাদ প্রকাশ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: