সংগৃহীত ছবিএকটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ তার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশে এখন সেই জনগোষ্ঠীর অনুপাত বাড়ছে। বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করছেন। অর্থনীতির জন্য এটি হওয়ার কথা ছিল উৎপাদন, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর বড় অংশেরই নেই মানসম্মত কর্মসংস্থান। কেউ কাজ করছেন অনানুষ্ঠানিক খাতে, কেউ শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ পেশায়।
আবার অনেকে শ্রমবাজারেই প্রবেশ করতে পারছেন না। এর মধ্যেই সামনে আসছে আরেকটি সংকট— কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত আর মাত্র দুই দশক পর কমতে শুরু করবে। অর্থাৎ যে জনসংখ্যা একসময় অর্থনীতির শক্তি হওয়ার কথা, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অভাবে সেটিই ভবিষ্যতে বাড়তি বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের নতুন এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জন্য এমন সতর্কবার্তাই দেওয়া হয়েছে। ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া : ফ্রম টেইলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৪৫ সালে বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর থেকে তা কমতে থাকবে। একই সময়ে বাড়বে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা। ২০৫১ সালের মধ্যে দেশের মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশের বয়স হবে ৬৫ বছর বা তার বেশি।
মঙ্গলবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য বাংলাদেশের হাতে সময় আছে আর প্রায় দুই দশক। কিন্তু কর্মসংস্থান, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তার বর্তমান পরিস্থিতি সেই সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত : বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের ব্যাপকতা। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশের কর্মজীবী মানুষের প্রায় ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। সংখ্যায় প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ। এসব কাজে সাধারণত নিয়োগপত্র, নির্ধারিত মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার নিশ্চয়তা থাকে না। ফলে কর্মসংস্থানে যুক্ত থাকলেও তাদের একটি বড় অংশ অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করে।
পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক উচ্চশিক্ষিতদের ক্ষেত্রে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্নাতক ডিগ্রিধারীদের ৪৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। অন্য একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, স্নাতক বা তার বেশি শিক্ষিতদের ৬০ শতাংশের বেশি যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি না পেয়ে অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হচ্ছেন। এসব কাজে তাদের আয় আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের তুলনায় ৪৫ থেকে ৮৪ শতাংশ কম।
শুধু ছোট প্রতিষ্ঠান নয়, মাঝারি ও বড় প্রতিষ্ঠানেও মোট কর্মসংস্থানের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বার্ষিক হার মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ। ৮২টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের গড় হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি আন্তর্জাতিক গড়ের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে অনানুষ্ঠানিক খাতের ৪৫ থেকে ৭০ শতাংশ উদ্যোক্তা বিকল্প বা নিয়মিত চাকরি না পেয়ে নিজেদের উদ্যোগ শুরু করেছেন। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে নতুন ব্যবসার সম্ভাবনার চেয়ে কর্মসংস্থানের অভাব বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাড়বে কর্মক্ষম মানুষ, বাড়বে না কি বেকারত্বও?
জনসংখ্যার বয়স কাঠামোর পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য যে সুযোগ তৈরি করেছে, তা কাজে লাগানোর অন্যতম শর্ত উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশে শ্রমের জোগান কর্মসংস্থানের চেয়ে ১ কোটি ৩০ লাখ বেশি হতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেও সবার জন্য কাজের ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ২০০০ সাল থেকে কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত বৃদ্ধির কারণে জিডিপিতে বার্ষিক ০ দশমিক ৪ শতাংশ এবং শ্রম উৎপাদনশীলতায় ১ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এসেছে। কিন্তু ২০৫০ সাল নাগাদ জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে জনমিতিক পরিবর্তনের বার্ষিক অবদান কমে মাত্র ০ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে শুধু কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে না। প্রয়োজন তাদের দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা এবং কাজের সুযোগ বাড়ানো।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও প্রস্তুতির ঘাটতি : জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে তরুণদের দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার মাত্র ৩৬ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় এ হার গড়ে ৬২ শতাংশ। স্বাস্থ্যসেবায় শহর ও গ্রামের বৈষম্যও প্রকট। দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করলেও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাত্র ২০ শতাংশ সেখানে কর্মরত। শহরে চিকিৎসকের ঘনত্ব গ্রামের তুলনায় ১৮ গুণ বেশি।
অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর মাত্র ১৮ শতাংশে প্রয়োজনীয় সব উপাদান রয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম পাওয়া যায় মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ কেন্দ্রে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশে ইনজেকশনযোগ্য ইনসুলিন পাওয়া যায়। হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান একসঙ্গে রয়েছে ১ শতাংশেরও কম প্রতিষ্ঠানে।
প্রবীণদের দায়িত্ব নেবে কে?
কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত কমে গেলে অর্থনীতিতে নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর চাপ বাড়বে। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। অথচ পেনশন ও সামাজিক সুরক্ষায় দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থাই দুর্বল।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ অঞ্চলের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ১৭ শতাংশ কোনো পেনশন ব্যবস্থায় অবদান রাখেন। আর ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সিদের মাত্র ১০ শতাংশ পেনশন সুবিধা পান।
বাংলাদেশে সরকারি বয়স্ক-ভাতা মাসে ৫০০ টাকা। দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের গড় আয়ের তুলনায় এই ভাতার পরিমাণ মাত্র ৫ থেকে ৮ শতাংশ। সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ের মাত্র ২ শতাংশ পায় পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুরা। ২০২৩ সালে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালু হলেও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য উল্লেখযোগ্য পেনশন কর্মসূচি নেই।
দুই দশকের মধ্যে কী করতে হবে : বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমের মতে, বাংলাদেশের জনমিতিক সম্ভাবনা কতটা কাজে লাগবে, তা নির্ভর করছে এখন নেওয়া পদক্ষেপের ওপর। এ জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা, তরুণদের বাজারভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ এবং নারীদের শ্রমবাজারে প্রবেশের বাধা দূর করতে হবে।
বিশ্বব্যাংক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজ করা, ব্যবসার নিয়মকানুন সংস্কার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী করার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি বয়স্কদের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও বার্ধক্যকালীন আয়-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তুতি এখনই নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে।
সময়ের আলো/কেএইচও