নিঝুমদীপ থেকে বালু তুলছে প্রভাবশালীরা। ছবি : সময়ের আলোদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র নোয়াখালীর হাতিয়ার নিঝুমদ্বীপ। পর্যটকদের কাছে দ্বীপের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এর মনোরম সি-বিচ। কিন্তু সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক সৈকত থেকেই এখন ট্রলি ভর্তি করে বালু তুলে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এতে একদিকে যেমন সৈকতের স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে উপকূলীয় পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য পড়ছে হুমকির মুখে।
সম্প্রতি সরেজমিনে নিঝুমদ্বীপের সৈকতে গিয়ে দেখা যায়, দিনের পর দিন প্রকাশ্যে সৈকত থেকে বালু উত্তোলন ও বিক্রি করা হচ্ছে। ট্রলি ভর্তি বালু স্থানীয় লোকজনের কাছে ৭০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হচ্ছে। এতে করে সৃষ্টিতে বড়বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। অথচ সৈকতের এই বালুকাবেলা নিঝুমদ্বীপের কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি দ্বীপের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও দেশের সম্পদ। কয়েকজনের ব্যক্তিগত লাভের জন্য এমন গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন আকর্ষণ ধ্বংস হতে থাকলেও কার্যকর প্রতিরোধ না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে এলাকাবাসীর মধ্যে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউনিয়ন যুবদল নেতা ইলিয়াসের বাবা বুদ্ধি মাঝি, এমরান চৌধুরী, নিজাম সেরাংসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এই বালু উত্তোলন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। তাঁদের প্রভাবের কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছেন না। কেউ কেউ প্রতিবাদ করলে হুমকির মুখে পড়তে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দারা বলেন, নিঝুমদ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম অংশ এই সি-বিচ। পর্যটকেরা এখানে আসেন সৈকতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। সৈকত না থাকলে কিংবা এর প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেলে নিঝুমদ্বীপের পর্যটন আকর্ষণ অনেকটাই কমে যাবে। এটি শুধু স্থানীয় মানুষের সম্পদ নয়, দেশেরও সম্পদ। অথচ কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থে সৈকত থেকে বালু সরিয়ে নিচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে একসময় সৈকতের অস্তিত্ব ও সৌন্দর্য দুটোই বিপন্ন হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও একটি চক্র সৈকত থেকে বালু উত্তোলন ও বিক্রি করত। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সেই তৎপরতা বন্ধ হয়নি। বরং আগের কয়েকজনের সঙ্গে নতুন করে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের যোগসাজশে বালু বিক্রির কার্যক্রম চলছে।
অভিযুক্ত এমরান চৌধুরী ও নিজাম সেরাং সৈকত থেকে বালু বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তারা বলেন, তারা বিচ থেকে কোনো বালু বিক্রি করেন না। অনেক আগে রাস্তার কাজের প্রয়োজনে সামান্য কিছু বালু নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে তারা আর বালু উত্তোলন করছেন না। তাদের দাবি, বুদ্ধি মাঝি বালু বিক্রির সঙ্গে জড়িত।
অভিযোগের বিষয়ে বুদ্ধি মাঝি বলেন, মিনারা বেগম নামে এক নারীর কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে কিছু বালু কিনেছেন তিনি। সেই বালু নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করছেন। কিছু নিজেদের জমিতে ফেলেছেন, আর কিছু রাস্তার কাজে ব্যবহার করেছেন। এ ছাড়া কয়েকজন দরিদ্র মানুষ গাড়িভাড়া বাবদ ৫০০-৬০০ টাকা দিয়ে সামান্য বালু নিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
যুবদল নেতা ইলিয়াস বলেন, এগুলো মানুষের বন্দোবস্ত পাওয়া জমি। জমির মালিকেরা তাদের বালু বিক্রি করলে তাদের কী করার আছে? আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেকেই বালু বিক্রি করেছেন, তাদের তো ফাঁসি হয়নি। তার বাবা নিজেদের প্রয়োজনে কিছু বালু নিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল বলেন, নিঝুমদ্বীপের সৈকত থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি তিনি সংবাদ পেয়েছি। দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সচিবকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের সবার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/জোই