আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় থমকে গেছে প্রকল্প

তৌহিদুল বকশী ঠান্ডা, কুড়িগ্রাম

সারাদেশ

ব্রহ্মপুত্রের বুকে বয়ে আসা বালুতে লুকিয়ে আছে মূল্যবান খনিজ সম্পদের বিশাল ভান্ডার। যে বালুকে এতদিন নদীভাঙন, বন্যা আর চর জাগার

2026-11-05T23:25:58+00:00
2026-11-05T23:25:58+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬,
২১ কার্তিক ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
বালুর নিচে লুকিয়ে সম্পদের ভান্ডার
আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় থমকে গেছে প্রকল্প
তৌহিদুল বকশী ঠান্ডা, কুড়িগ্রাম
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:২৫ পিএম 
ব্রহ্মপুত্রের যে বালুকে এতদিন নদীভাঙন, সেই বালুই হতে পারে দেশের অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। ছবি : সময়ের আলো
ব্রহ্মপুত্রের বুকে বয়ে আসা বালুতে লুকিয়ে আছে মূল্যবান খনিজ সম্পদের বিশাল ভান্ডার। যে বালুকে এতদিন নদীভাঙন, বন্যা আর চর জাগার উপকরণ হিসেবে দেখা হয়েছে, সেই বালুই হতে পারে দেশের অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। সঠিক প্রযুক্তি ও পরিকল্পনায় এই বালু থেকে আহরণ করা সম্ভব টাইটানিয়াম, জিরকন, ম্যাগনেটাইটসহ নানা মূল্যবান খনিজ। গড়ে উঠতে পারে খনিজভিত্তিক শিল্প, সৃষ্টি হতে পারে বিপুল কর্মসংস্থান, কমতে পারে আমদানিনির্ভরতা। বদলে যেতে পারে দেশের অন্যতম দরিদ্র জেলা কুড়িগ্রামের অর্থনৈতিক চিত্র। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে নেওয়া হয়েছিল প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘কুড়িগ্রাম বালু গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র’ স্থাপনের উদ্যোগ। পরিকল্পনায় ছিল আধুনিক গবেষণাগার, খনিজ পৃথকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর প্রযুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের রূপরেখা। প্রকল্পটির মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু বিপুল সম্ভাবনা, গবেষণা ও প্রাথমিক প্রস্তুতির পরও প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তায়। মাঠ পর্যায়ের ইতিবাচক তথ্যের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের সভার কার্যবিবরণীতে উঠে আসা নেতিবাচক বক্তব্যের অমিল নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। জেলা প্রশাসনের দাবি, প্রকল্পের বিপক্ষে কোনো প্রতিবেদন তারা পাঠায়নি। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তারাও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ করে প্রতিবেদন পাঠানোর কথা জানিয়েছেন। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই উদ্যোগটি কেন এখনও বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ।

বালুর নিচে লুকিয়ে থাকা সম্পদের ভান্ডার  

বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের (জিএসবি) গবেষণায় উঠে এসেছে, হিমালয় অববাহিকা থেকে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর মাধ্যমে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বালু বাংলাদেশে প্রবেশ করে। গবেষণাসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী এর পরিমাণ প্রায় এক বিলিয়ন টন। এই বালুর মধ্যে রয়েছে গারনেট, কোয়ার্টজ, ম্যাগনেটাইট, জিরকন, ইলমেনাইট ও রুটাইলের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব খনিজের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ইলমেনাইট ও রুটাইল হলো টাইটানিয়াম উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল। রং, প্লাস্টিক, ওষুধ ও বিভিন্ন শিল্পে এর ব্যবহার রয়েছে। জিরকন ব্যবহৃত হয় সিরামিক, উন্নত প্রযুক্তি ও বিভিন্ন শিল্পপণ্যে। ম্যাগনেটাইট ইস্পাত উৎপাদনসহ ভারী শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অন্যদিকে গারনেট ও কোয়ার্টজ ব্যবহৃত হয় অলংকার, কাচ, ইলেকট্রনিকস এবং শিল্প-কারখানার বিভিন্ন কাজে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব খনিজের যথাযথ অনুসন্ধান, পৃথকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সক্ষমতা তৈরি করা গেলে বাংলাদেশে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি নতুন শিল্প খাত গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে। তবে বালুতে খনিজের উপস্থিতি থাকলেই তা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য হবে, এমন নয়। এ জন্য প্রয়োজন বিস্তারিত অনুসন্ধান, খনিজের ঘনত্ব নিরূপণ, পরিবেশগত মূল্যায়ন ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই।

৫০ বছরের মহাপরিকল্পনায় শিল্পায়নের স্বপ্ন  

চলতি বছরের ১১ জুন বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের একটি নীতিনির্ধারণী মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ২০২৬ থেকে ২০৭৫ সাল পর্যন্ত ৫০ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় ১৫ একর জমিতে একটি পাইলট রিসার্চ প্ল্যান্ট এবং রাজারহাট উপজেলার টগরাইহাট এলাকায় ১০ একর জমিতে মূল গবেষণাকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়। মূল কেন্দ্রটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘মিনারেল স্যান্ডস রিসার্চ হাব’। এখানে খনিজ গবেষণার পাশাপাশি বিরল মৃত্তিকা উপাদান বা রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস নিয়ে গবেষণার পরিকল্পনা রয়েছে। যুক্ত করার কথা রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন, স্কাডা প্রযুক্তি, স্মার্ট মাইনিং এবং জিওলজিক্যাল বিগ ডাটা সেন্টার।

প্রকল্পের পরিকল্পনাকারীদের প্রত্যাশা, গবেষণাকেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হলে শুধু কুড়িগ্রাম নয়, সারা দেশের খনিজ গবেষণা ও শিল্পায়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। খনিজ সম্পদভিত্তিক শিল্পের কাঁচামাল দেশে উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়বে। ইতিমধ্যে গণপূর্ত অধিদফতর প্রস্তাবিত জমির জরিপ ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ করে সংশ্লিষ্ট দফতরে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে।

ইতিবাচক তথ্যের পরও কেন ফাইলবন্দি  

প্রকল্পটির অগ্রগতিতে বড় বাধা তৈরি হয় গত ১৯ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় সভায়। সভার কার্যবিবরণীর ১০ নম্বর আলোচ্য সূচিতে উল্লেখ করা হয়, কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাব্য ব্যয়ের তুলনায় সরকারের প্রাপ্তি উল্লেখযোগ্য হবে না বলে অভিমত দিয়েছেন। এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। কারণ জেলা প্রশাসনের দাবি, তাদের পক্ষ থেকে প্রকল্পের বিরুদ্ধে এমন কোনো প্রতিবেদন পাঠানো হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের ৫ মার্চ কুড়িগ্রাম সদর, চিলমারী ও রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা প্রস্তাবিত প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত ও নকশা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছিলেন। ফলে জেলা প্রশাসনের নামে নেতিবাচক অভিমতটি কীভাবে মন্ত্রণালয়ের কার্যবিবরণীতে যুক্ত হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, আমার যোগদানের আগে সাবেক জেলা প্রশাসকদের সময়ে বালু গবেষণাকেন্দ্র স্থাপনের জন্য সম্ভাব্য জমির সব তথ্য-উপাত্ত কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু গত ১৯ জুলাইয়ের সভায় জেলা প্রশাসনের যে নেতিবাচক অভিমতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, আমাদের দফতর থেকে এ ধরনের কোনো প্রতিবেদন কখনোই পাঠানো হয়নি। এ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জেলাবাসীর আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটবে।

কুড়িগ্রাম গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার বালুতে যে মূল্যবান ও বিরল খনিজ রয়েছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা ইতিমধ্যে জমির সম্ভাব্যতা ও কার্যকারিতা যাচাই শেষ করে প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দফতরে অনেক আগেই পাঠিয়েছি।

মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে যা বলছেন মন্ত্রী 

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং জেলা প্রশাসনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্তের বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে বালু গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন নিয়ে কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা তথ্যের বিভ্রান্তি তৈরি হয়ে থাকলে আমি নিজে উদ্যোগী হয়ে তা দ্রুত নিরসনের ব্যবস্থা নেব।

গবেষকদের চোখে নতুন অর্থনীতির সম্ভাবনা 

বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের উপপরিচালক (ভূতত্ত্ব) ড. সোহেল রানা বলেন, হিমালয় থেকে আসা ব্রহ্মপুত্রের এই বালু সম্পূর্ণ পুনর্বহনযোগ্য ও নবায়নযোগ্য। আমরা যদি এই বালু থেকে হেভি ও লাইট মিনারেল, যেমন রুটাইল, জিরকন ও কোয়ার্টজ আলাদা করতে পারি তা হলে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশে টাইটানিয়াম ও জিরকোনিয়ামভিত্তিক বিশাল শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হবে। গবেষকদের এই আশাবাদ কুড়িগ্রামের মানুষের মধ্যেও নতুন স্বপ্ন তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বন্যা, নদীভাঙন, কর্মসংস্থানের অভাব ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা এ অঞ্চলের মানুষ প্রকল্পটিকে অর্থনৈতিক মুক্তির সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন। জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, মেগা প্রকল্পটি শুরুই হলো না, অথচ মন্ত্রণালয় কীভাবে বলতে পারে লাভ হবে না ক্ষতি হবে? এটি বাস্তবায়িত হলে মঙ্গাপীড়িত কুড়িগ্রামের দারিদ্র্যের কলঙ্ক মুছে পুরো দেশের অর্থনীতি বদলে যেতে পারে। আমরা দ্রুত এর বাস্তবায়ন চাই।

কুড়িগ্রাম হিতৈষী সংঘের সভাপতি সামিউল হক নান্টু বলেন, কুড়িগ্রামের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, এমন প্রকল্পের বিকল্প নেই। স্থানীয় সম্পদ কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব।

জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এই জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্পে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে এক হতে হবে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এনএন

  বিষয়:   আমলাতান্ত্রিক জটিলতা  থমকে গেছে প্রকল্প  ব্রহ্মপুত্র  কুড়িগ্রাম  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: