ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু। ছবি : সংগৃহীতদুধ-কলা খাইয়ে নিজ আস্তিনের মধ্যে নেতানিয়াহুর মতো কালসাপ পুষেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই কালসাপের দংশনে আজ রাজনৈতিক অঙ্গনে মৃত্যুমুখে পতিত হতে হলো তাকে। নেতানিয়াহুর মন রক্ষায় ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় মাশুল গুনল রিপাবলিকান পার্টি। নেতানিয়াহুর যুদ্ধ কীভাবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হলো, আর এর জন্য ইসরাইলকেই বা কতটা মূল্য দিতে হবে এবং এখন ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কি হবে সেসব বিষয়ে সময়ের আলোর পাঠকদের সঙ্গে নিয়ে জানার চেষ্টা করব আজ।
ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে একটি বিষয় এখন পুরোটাই পরিষ্কার। তা হলো, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্তই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির ভরাডুবির অন্যতম প্রধান কারণ। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। যে যুদ্ধের পক্ষে একসময় জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন ট্রাম্প, সেই যুদ্ধই এখন তার দলের জনপ্রিয়তা, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং নেতৃত্বের সক্ষমতাকে আবর্জনার ভাগাড়ে নিয়ে ফেলেছে।
সিএনএন, বিবিসি, ওয়াশিংটন পোস্টসহ অন্য সব গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ধরাশায়ী হয়েছে রিপাবলিকান পার্টি। ১৯৯৩ সালে বিল ক্লিনটন হোয়াইট হাউসে প্রবেশের পর থেকে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা এবার সর্বোচ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। সিনেটেও ১০ আসনের ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে দলটি। টেক্সাস, সাউথ ক্যারোলাইনা, নর্থ ক্যারোলাইনা, কানসাস, আইওয়া, ওহাইও ও মেইনে সিনেটের আসন নিজেদের করে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। শুধু তা-ই নয়, ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া গভর্নর পদপ্রার্থী বিবেক রামাস্বামী ও গ্রেগ অ্যাবটও ওহাইও ও টেক্সাসের ভোটারদের দ্বারা চরমভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। অথচ ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই দুই রাজ্যেই বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন ট্রাম্প।
তবে এবারের নির্বাচনের এই ফল ২০২৪ সালের চিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। সেবার জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশের যুদ্ধ থেকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টি নিরঙ্কুশ জনসমর্থন পেয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন ট্রাম্প। আর শেষ পর্যন্ত সেই যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বোঝাই তাকে সিংহাসন থেকে আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করতে চলেছে। এখন অনেকের মনেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তা হলো নেতানিয়াহুর যুদ্ধই কি ট্রাম্পের পরাজয়ের কারণ?
ঘটনাক্রম লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর আগ পর্যন্ত অন্তত পাঁচবার হোয়াইট হাউস সফর করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে ট্রাম্পকে রাজি করাতে তিনি ওয়াশিংটনের প্রভাবশালী নব্য রক্ষণশীল নেতাদের সঙ্গে লিয়াজোঁ করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন প্রয়াত সিনেটর কট্টরপন্থি লিন্ডসে গ্রাহাম। কীভাবে ট্রাম্পকে যুদ্ধে জড়ানো যায়, সে বিষয়ে তাদের পরামর্শ নেন নেতানিয়াহু। তারপর যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেন ট্রাম্পকে।
যুদ্ধ শুরুর পর ইসরাইলপন্থি পডকাস্টার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালীরা ট্রাম্প ও তার সমর্থকদের আশ্বস্ত করতে থাকেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ সহজেই জেতা যাবে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। এমনকি যুদ্ধ শুরুর দুই মাস পর এপ্রিলে রক্ষণশীল সাংবাদিক উইল চেম্বারলেইন বলেছিলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইরান যুদ্ধ বড় কোনো বিষয় হবে না। বরং সামান্য প্রসঙ্গ হিসেবেই থেকে যাবে। সেপ্টেম্বরে ইসরাইলপন্থি রেডিও উপস্থাপক মার্ক লেভিন পডকাস্টার বেন শাপিরোকে বলেন, নির্বাচনে ইরান কোনোভাবেই নির্ধারক ভূমিকা রাখবে বলে মনে হচ্ছে না।
লেভিন ও শাপিরো— দুজনই দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে প্রপাগান্ডা চালিয়ে আসছেন। শাপিরোর দাবি ছিল, নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার পেছনে ইরান যুদ্ধের কোনো ভূমিকা নেই।
কিন্তু বাস্তবতা তাদের হিসাবের সঙ্গে একটুও মেলেনি। কোনো সুস্পষ্ট বিজয়ের লক্ষ্য কিংবা যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা ছাড়াই নেতানিয়াহুর চাপে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বক্তব্য অনুযায়ী ইসরাইলের সরাসরি অনুরোধেই এই যুদ্ধে জড়ায় ওয়াশিংটন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানগুলোর মধ্যে ইরান যুদ্ধই সবচেয়ে অজনপ্রিয়। তবে পিউ রিসার্চের এক জরিপে দেখা যায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর মধ্যে পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান ছিল ষষ্ঠ। শীর্ষে ছিল অর্থনীতি।
বিশ্লেষকদের মতে, অজনপ্রিয় যুদ্ধের পরও হয়তো নির্বাচনে টিকে যেতে পারত রিপাবলিকান পার্টি। কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি সরবরাহে বড় সংকট তৈরি হয়। পেট্রোলের দাম পৌঁছে যায় রেকর্ড উচ্চতায়। এতে ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ফাঁপা আওয়াজে পরিণত হয়। জো বাইডেনের আমলে আকাশ ছুঁতে চলা জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় এসেছিলেন তিনি। অথচ ইরান যুদ্ধে জড়ানোর কারণে সেই ব্যয় আরও বেড়ে যায়। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি অনুভূত হতে থাকে।
আবার খোদ ট্রাম্পের শিবিরেই ইরান যুদ্ধ নিয়ে ছিল বিভক্তি। ট্রাম্পের মূল ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ম্যাগা শিবিরের অনেকের কাছেই ইরান যুদ্ধ ছিল একটি আত্মঘাতী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তাদের মতে, এই যুদ্ধের কারণেই নির্বাচনে রিপাবলিকানদের এমন বিপর্যয় ঘটেছে। ডানপন্থি পডকাস্টার ম্যাট ওয়ালশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ট্রাম্প অজনপ্রিয় ও উদ্দেশ্যহীন একটি যুদ্ধ শুরু করেছেন। পেট্রোলের দাম বেড়েছে, মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সামর্থ্য কমেছে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি থেকে সরে এসেছেন ট্রাম্প। এ কারণেই রিপাবলিকানদের এমন শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। বিষয়টি খুবই সরল। ডানপন্থি ইনফ্লুয়েন্সার স্কট গ্রিয়ারও নির্বাচনের রাতেই লিখেছেন, ইরান যুদ্ধের কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে। বিষয়টি অস্বীকার করা মানে বাস্তবতা থেকে পালানোর চেষ্টা।
সাবেক কংগ্রেস সদস্য মার্জোরি টেলর গ্রিনও এ বিষয়ে সরাসরি নেতানিয়াহুকে দায়ী করেছেন। রুশ গণমাধ্যম আরটিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেন এমন করছেন, তা বোঝা কঠিন। তিনি এখনও নেতানিয়াহুর নির্দেশমতো কাজ করে যাচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে ইরান যুদ্ধও অব্যাহত থাকবে। নির্বাচনে হারার পর ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও এ কথা স্বীকার করেছেন।
তবে ইসরাইলপন্থি মার্কিন ডানপন্থিরা নির্বাচনি বিপর্যয়ের দায় নিতে নারাজ। নির্বাচনের রাতে ইহুদিবাদী মার্ক লেভিন বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে তাদের অধিকাংশের জীবনেই কোনো প্রভাব পড়েনি। রিপাবলিকানরা যদি পরাজিত হয়ে থাকে, তার কারণ ইরান যুদ্ধ নয়। নব্য রক্ষণশীল মতাদর্শের ইনফ্লুয়েন্সার জোয়েল বেরি তো যুদ্ধ কিংবা পেট্রোলের মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করতেই রাজি নন। তার মতে, বিদেশি একটি সুপরিকল্পিত মনোবল ভাঙার প্রচারের মাধ্যমে এসব বিষয়কে সামনে আনা হয়েছে। অর্থনীতিতে রিপাবলিকানদের সমাজতান্ত্রিক অবস্থান এবং গর্ভপাতের প্রশ্নে নমনীয়তাও পরাজয়ের কারণ বলে মনে করেন তিনি।
তবে ইরানেও মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্প শিবিরের ভরাডুবির পেছনে যুদ্ধকে দায়ী করা হচ্ছে। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মারান্দি আরটিকে বলেন, ট্রাম্পের পরাজয়ে ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসী যুদ্ধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ট্রাম্প, নেতানিয়াহু ও ইহুদিবাদী লবির বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধ, দৃঢ়তা ও অবিচল অবস্থান শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। মারান্দির মতে, ওয়াশিংটনে কার্যত দুই দলের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য না থাকলেও সাধারণ মানুষ নিজেদের মতামত জানানোর একমাত্র সুযোগ হিসেবে নির্বাচনকে বেছে নিয়েছে। ট্রাম্পের পাশাপাশি ইহুদিবাদী রাজনীতির জন্যও এটি বড় পরাজয়।
নিবন্ধের এ পর্যায়ে এসে আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে। তা হলো নেতানিয়াহুর যুদ্ধবাজি কি উল্টো ফল দিল? ইরানে হামলার জন্য ট্রাম্পকে রাজি করানোর মধ্য দিয়ে নেতানিয়াহু এমন একটি সাফল্য পেয়েছেন, যা এর আগে জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা ও জো বাইডেনের আমলে পাননি। গত বছর নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ইসরাইলের ইতিহাসে হোয়াইট হাউসের সবচেয়ে বড় বন্ধু হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টই ইসরাইলের জন্য ট্রাম্পের চেয়ে বেশি কিছু করেননি। এই তুলনায় অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট তার ধারেকাছেও নেই।
এমনকি ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রচারাভিযানে ইসরাইলপন্থি দাতারা প্রায় ১২ কোটি ৩০ লাখ ডলার ব্যয় করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী এই অর্থের বড় অংশ, প্রায় ১০ কোটি ৬০ লাখ ডলার দিয়েছিলেন ইসরাইলি-আমেরিকান ধনকুবের মিরিয়াম অ্যাডেলসন। এরপর থেকে ট্রাম্প তার ম্যাগা শিবিরে থাকা ইসরাইলবিরোধী কিংবা ইসরাইলের প্রতি সমালোচনামুখর ব্যক্তিদের একের পর এক সরিয়ে দিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন মার্জোরি টেলর গ্রিন, প্রতিনিধি থমাস ম্যাসি, সাবেক জাতীয় সন্ত্রাসবাদবিরোধী কেন্দ্রের পরিচালক জো কেন্ট এবং একসময় ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যম সহযোগী টাকার কার্লসন ও অ্যালেক্স জোন্স। কয়েক দশক ধরে নেতানিয়াহু যে যুদ্ধ চেয়ে এসেছেন, ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত সেই যুদ্ধই তাকে দিয়েছেন।
কিন্তু এর বিনিময়ে ট্রাম্পের মতো ইসরাইলকেও দিতে হচ্ছে রাজনৈতিক মূল্য। ফিলিস্তিনিদের তুলনায় ইসরাইলের প্রতি মার্কিন জনগণের সহানুভূতি এখন ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। অর্ধেকের বেশি মার্কিন নাগরিক ইসরাইলকে দেওয়া সামরিক সহায়তা বন্ধ অথবা কমিয়ে দেওয়ার পক্ষে। গত এপ্রিলে ইপসোসের এক জরিপে ৭১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে ইসরাইলের সঙ্গে তারা কোনোভাবেই জড়াতে চান না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ইসরাইলপন্থি লবির কোটি কোটি ডলারের প্রচার ও অনুদানও এবার কিছু প্রার্থীর বিজয় ঠেকাতে পারেনি। মিশিগানের সিনেটর নির্বাচিত আবদুল আল সাইয়েদ, নিউইয়র্কের প্রতিনিধি নির্বাচিত দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের, নিউ জার্সির অ্যাডাম হামাউয়ি এবং মিশিগানের ডোনাভান ম্যাককিনির মতো প্রার্থীরা প্রকাশ্যেই ইসরাইলবিরোধী অবস্থান নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন।
তাই এটি সহজেই অনুমেয় যে, ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা নতুন কংগ্রেস নেতানিয়াহুর দাবির প্রতি আগের তুলনায় কিছুটা কম নমনীয় হবে। তবে নেতানিয়াহুর নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও এখন অনিশ্চিত। গত সপ্তাহের ইসরাইলি পার্লামেন্ট নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর নতুন সরকার গঠনের জন্য তাকে জোটের সমীকরণ মেলাতে হচ্ছে। আগামী জানুয়ারিতে তার ক্ষমতায় থাকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইসরাইলপন্থি লবির প্রভাব এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। দলীয় বিভাজন পেরিয়েও তাদের প্রভাব বিস্তৃত। জানুয়ারিতে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাওয়া হাকিম জেফরিসও সেই ৩৫৪ জন প্রতিনিধির একজন, যারা আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি বা আইপ্যাকের কাছ থেকে অর্থসহায়তা পেয়েছেন। প্রতিনিধি পরিষদের মোট ৪৩৩ জন সদস্যের মধ্যে এই সংখ্যা ৩৫৪। অন্যদিকে মিশিগান থেকে নির্বাচিত আবদুল আল সাইয়েদ হবেন সিনেটের একমাত্র সদস্য, যিনি আইপ্যাক কিংবা জে স্ট্রিট বা রিপাবলিকান জিউইশ কোয়ালিশনের মতো কোনো ইসরাইলপন্থি সংগঠনের কাছ থেকে অর্থ নেননি।
‘হু ফান্ডস মাই রিপ’-এর তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে আইপ্যাক প্রায় ১২ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। সংগঠনটির সমর্থন পাওয়া ২৬৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৪৫ জনই জয়ী হয়েছেন। অর্থাৎ তাদের সমর্থন পাওয়া প্রার্থীদের জয়ের হার ৯২ শতাংশ। মারান্দির মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট কিংবা রিপাবলিকান কোনো দলের ওপরই ইসরাইলপন্থি লবির প্রভাব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তার ভাষায়, দুটি দলই মারাত্মকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং যাকে তিনি ‘এপস্টিন শ্রেণি’ বলে অভিহিত করেন, তার সঙ্গে বাঁধা। এখানে কে কার জায়গা নিল, সেটি বড় বিষয় নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মনোভাব বদলে গেছে। ক্ষমতাসীন অভিজাতরা এই পরিবর্তন উপলব্ধি করতে না পারলে তাদের বিপদ আরও বাড়বে।
তা হলে আরেকটি প্রশ্ন মনে জাগতে পারে। তা হলো মার্কিন ও ইসরাইলি নির্বাচনে কি ইরান জিতল? সত্যি বলতে রিপাবলিকানদের পরাজয়ে ইরান কতটা লাভবান হলো, তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে এখন ট্রাম্প কী সিদ্ধান্ত নেন তার ওপর। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে অনেকটা ক্ষমতাহীন বা ‘লেম ডাক’ প্রেসিডেন্টে পরিণত করতে চলেছে। একই সঙ্গে রিপাবলিকান পার্টির জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদি বড় বিপর্যয়। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা এখনও ট্রাম্পের হাতে রয়েছে। আর তার ইসরাইলপন্থি ঘনিষ্ঠ মিত্রদের একটি অংশ ঠিক সেটিই চায়; নির্বাচনের পর আরও বড় আকারে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান।
ইসরাইলপন্থি ইনফ্লুয়েন্সার লরা লুমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, এখন আর হারানোর কিছু নেই। ইরানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এসেছে। ট্রাম্পের উচিত, আর দেরি না করে কাজটি করে ফেলা। ইসরাইলি বিশ্লেষক ড. এলি ডেভিড লিখেছেন, এখনও ট্রাম্পের হাতে ইরানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার সময় রয়েছে। তা করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারবেন তিনি।
ট্রাম্প নিজেও মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধ শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত সপ্তাহে এক নির্বাচনি সমাবেশে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানকে দেখতে পাবেন তারা। বুধবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, অল্প সময়ের মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে বড় কিছু করতে হবে। আর সেই পদক্ষেপে বড় ধরনের আঘাত হানার বিষয়টি থাকতে পারে।
তবে এবার ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধে জড়ালে ট্রাম্পের হাতে সময় খুব বেশি থাকবে না। আগামী ৩ জানুয়ারি নতুন ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হবে। চলতি বছর ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করতে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে একাধিক প্রস্তাব এনেছিল। কিন্তু প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট দুই কক্ষেই রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ থাকায় সেগুলো পাস হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। এবার পরিস্থিতি বদলেছে। ভোটাররা আশা করছেন, আইপ্যাকের অর্থসহায়তা পাওয়া সিনেটর ও প্রতিনিধিরাও ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবেন। মারান্দি মনে করেন, ট্রাম্প যদি এখন ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেন, তা হলে ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি রিপাবলিকানদের একটি অংশও তার বিরোধিতা করতে বাধ্য হবে। তাদের অর্থদাতা কিংবা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকরা এতে অসন্তুষ্ট হলেও জনমতের চাপ উপেক্ষা করা কঠিন হবে।
তবে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করবেন এমন আশা করছে না তেহরান। বরং এবারের নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলকেই দীর্ঘমেয়াদি একটি বার্তা দিয়েছে। ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়, দেশের ভেতরেও তা জনপ্রিয় নয়। এমনকি হোয়াইট হাউসে যে দলই থাকুক, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জন্য রাজনৈতিক আত্মহত্যার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
শেষ পর্যন্ত মাশুল গুনতে হলো ট্রাম্পকে। আর সংশয়ের মুখে পড়ল ইসরাইল। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধের সঙ্গী হওয়ার চূড়ান্ত মূল্য দিতে হয়েছে ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টিকে। মঙ্গলবারের নির্বাচনে দলটির এমন শোচনীয় পরাজয়ের পরও কেবল কট্টর ইসরাইলপন্থিরাই দাবি করছেন, ইরান যুদ্ধ নয়, অন্য কোনো কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে। কিন্তু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ইরান যুদ্ধের প্রতি সাধারণ মানুষের বিরূপ মনোভাব মিলিয়ে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
ইসরাইলের জন্য অবশ্য হিসাবটি এখনও পুরোপুরি মেলেনি। নেতানিয়াহু কিংবা তার উত্তরসূরি ভবিষ্যতে ট্রাম্পের মতো ইসরাইলপন্থি কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাবেন কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটনে ইসরাইলের শক্তিশালী লবি এখনও সক্রিয়। কয়েক দশক ধরে মার্কিন কংগ্রেসে তাদের যে প্রভাব রয়েছে, নতুন কংগ্রেসেও তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে তারা। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনার যেকোনো উদ্যোগ কঠিন করে তুলতে পারে এই লবি। অর্থাৎ নেতানিয়াহুর যুদ্ধের দায়ে ট্রাম্পকে আপাতত বড় রাজনৈতিক মূল্য দিতে হলেও ইসরাইল এখনই সেই দায় থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইসরাইলপন্থি লবির প্রভাব কতটা অটুট থাকে, আর নতুন কংগ্রেস ট্রাম্পের যুদ্ধনীতিকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে