সুস্থ পরিবেশ নির্মাণে ইসলামের নির্দেশনা

নূসরাত জাহান মুশফিকা

ইসলাম

ইসলাম সর্বজনীন ধর্ম। মানবজীবন পরিচালনার সবদিকের দিকনির্দেশনা এবং সব সমস্যার সমাধান ইসলাম ধর্মে বিদ্যমান। পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে ইসলাম আমাদের উৎসাহ

2026-11-06T13:24:13+00:00
2026-11-06T13:24:13+00:00
 
  শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬,
২২ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
ইসলাম
সুস্থ পরিবেশ নির্মাণে ইসলামের নির্দেশনা
নূসরাত জাহান মুশফিকা
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ১:২৪ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ইসলাম সর্বজনীন ধর্ম। মানবজীবন পরিচালনার সবদিকের দিকনির্দেশনা এবং সব সমস্যার সমাধান ইসলাম ধর্মে বিদ্যমান। পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে ইসলাম আমাদের উৎসাহ দেয়। প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে সরাসরি বর্ণনা করেছেন, ‘কোনো মুসলিম যদি একটি বৃক্ষ রোপণ করে অথবা শস্য ফলায়, আর তা থেকে কোনো পাখি, মানুষ বা পশু আহার করে, তবে তা তার জন্য দান (সদকা) হিসেবে গণ্য হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৩২০)

বৃক্ষরোপণ জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি কারও অজানা নয়। কিন্তু এখনও অনেকেরই অজানা যে, এর মূলে রয়েছে আমাদেরই মূর্খতার নিরিখে সম্পাদিত কর্মকাণ্ডগুলো। অতীতে অর্থাৎ শত বছর আগে যদিও এই বিষয়টি বর্তমানের তুলনায় কম প্রভাব বিস্তার করেছে। কারণ তখন উন্নত-শৌখিন জীবনযাত্রা ছিল না। কিন্তু সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে গড়ে ওঠা কল-কারখানা, শিল্প প্রতিষ্ঠান, বিলাসবহুল বাড়ি তৈরির শৌখিন ভাবনা আর জীবনধারণের সহজ হতে সহজ উপায় খুঁজে ফেরার এক মোহে জড়িয়ে মানুষ প্রতিনিয়ত সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি থেকে নিজের অজান্তেই নিজেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। ফলস্বরূপ কৃত্রিম আর বিলাসবহুল জীবনের মোহ মানুষকে নির্জীব-যান্ত্রিক করে তুলছে। যেমনটি হাদিসে পাওয়া যায়, ‘যদি কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তও এসে যায় আর তোমাদের কারও হাতে একটি গাছের চারা থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে দেয়।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১২৯০২)

জাতিসংঘের ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৭৮ লাখ (প্রায় ১৭৭৮১৮০৪৪ জন) এবং দেশটির মোট আয়তন প্রায় ১৪৭৫৭০ থেকে ১৪৮৪৬০ বর্গকিলোমিটার (ভূমি ও পানি মিলিয়ে প্রায় ১৪৭৬১০ থেকে ১৬৬৬২০ বর্গকিলোমিটার) এবং বাংলাদেশ বিশ্বে ৮ম জনবহুল দেশ। বিষয়টি স্পষ্টত যে, আয়তনের তুলনায় বাংলাদেশের জনসংখ্যা অত্যধিক। এমতাবস্থায় সভ্যতার অগ্রগতির রেশ ধরে নির্বিচারে গাছ কেটে বন-জঙ্গল উজাড় করা হচ্ছে নতুন নতুন শপিংমল, ডুপ্লেক্স বাড়ি, শিল্প প্রতিষ্ঠান নির্মাণের জন্য। ‘গাছ মানুষের পরম বন্ধু’— বাক্যটি কেবল পাঠ্যপুস্তকেই সীমাবদ্ধ। জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ বৃক্ষ নিধন। বৈশ্বিক উষ্ণতা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বন্যা-ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন এবং লবণাক্ততার অভিঘাত ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধের এখনই সর্বোচ্চ সময়। অনিয়মিত বৃষ্টি, নদীভাঙন, খরা ও ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ ইতিমধ্যে কৃষি, অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। ওয়ার্ল্ড ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ ১০-এ অবস্থান করছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ২০৫০ সালের দিকে দেশের ১৭ শতাংশ ভূমি তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ২০২২ সালে তার জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ) চূড়ান্ত করেছে, যাতে ১৪টি জলবায়ু ঝুঁকি চিহ্নিত করে ২০৫০ সাল পর্যন্ত ১১০টি কর্মকৌশল প্রস্তাব করা হয়েছে। এই পরিকল্পনায়, জলবায়ু সহনশীল কৃষি ও মৎস্য খাত গড়ে তোলা, উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ও বাঁধ নির্মাণ, নগরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা রোধে টেকসই নিকাশি ব্যবস্থা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ শক্তি উৎপাদন নিশ্চিত করার মতো লক্ষ্যগুলো স্থান পেয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন ২৩০ বিলিয়ন ডলার, যার বেশিরভাগই আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। 
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী শিল্পোন্নত দেশগুলোর নৈতিক দায়িত্ব বাংলাদেশের মতো ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা করা। ২০২৩ সালে কপ২৮-এ গৃহীত লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে বাংলাদেশের প্রাপ্য অর্থ দ্রুত আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো জরুরি। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক, গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) এবং অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত তহবিলের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বিশ্বব্যাংকের ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার সহায়তা যেন স্বাস্থ্য, পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোয় সরাসরি কাজে লাগে।

তাই এখনই সর্বোচ্চ সময়, অভিযোজন, শরিয়াহর মান্যতা আর কার্যকর পদক্ষেপ অতি দ্রুত গ্রহণ সাপেক্ষে জলবায়ুর এই বিরূপ পরিবর্তন রোধ করার। এটা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৮৯৩)। 

পুরো দেশে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করে ব্যাপকহারে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং পরিবেশদূষণ রোধের সব কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সরকার ও জনগণের কার্যকর ভূমিকাই পারে প্রত্যক্ষভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি হতে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে।

লেখক : ডিপার্টমেন্ট অব ইসলামিক স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডআই

  বিষয়:   ইসলাম 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: