নতুন আলোয় আশার ভোর

সাব্বির আহমেদ

জাতীয়

রাজনৈতিক সংকট, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও অনিশ্চয়তার এক উত্তাল সময়ে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে

2026-11-07T01:56:38+00:00
2026-11-07T02:07:22+00:00
 
  শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬,
২৩ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
জাতীয়
বিপ্লব ও সংহতি দিবস
নতুন আলোয় আশার ভোর
চব্বিশের অভ্যুত্থানের মেলবন্ধন দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা
সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১:৫৬ এএম  আপডেট: ০৭.১১.২০২৬ ২:০৭ এএম
শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ছবি : সংগৃহীত
রাজনৈতিক সংকট, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও অনিশ্চয়তার এক উত্তাল সময়ে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে। সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্য ও সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণে পাল্টে যায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। সেই ঘটনা আজও জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র ও জনগণের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে আলোচনার অবকাশ তৈরি করে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সঙ্গে ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক ঘটনার কোনো রাজনৈতিক যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়েও রয়েছে ভিন্নমত। 

বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের ঘটনাকে স্মরণের পাশাপাশি এর গণতান্ত্রিক শিক্ষা বর্তমান রাজনীতিতে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করে রাখতে চেয়েছিল, জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে দেশে একদলীয় স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করতে চেয়েছিল এবং দেশের শৌর্য, বীর্য, সাহস ও সম্মানের প্রতীক সেনাবাহিনীর গৌরব ভূলুণ্ঠিত করতে চেয়েছিল, ৭ নভেম্বর দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে তাদের পরাজয় ঘটেছিল। তাদের এই পরাজয় আর সিপাহি-জনতার বিজয়ের মধ্য দিয়ে নতুন আলোয় এক আশার ভোরের সূচনা হয়েছিল সেদিন। 

আজ ৭ নভেম্বর, ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনের মধ্যরাতে ঢাকা সেনানিবাসে সাধারণ সিপাহিরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। সাধারণ সৈনিক ও জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন। তিনি জনতার সামনে এলে ঢাকার রাস্তায় নেমে আসে সাধারণ মানুষের ঢল। ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ সেøাগানে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজপথ। সেনাসদস্য এবং সাধারণ মানুষের এই অভূতপূর্ব ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধই ইতিহাসে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ নামে পরিচিত। যে বিপ্লবকে ঐক্যের শক্তি হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কেউ কেউ ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান একই সূত্রে গাথতে চান। জাতির অস্তিত্বের সংকটে সর্বজনীন ঐক্যের শক্তির বিকল্প দেখছেন না তারা। সেই সঙ্গে ৭ নভেম্বরের প্রকৃত রাজনৈতিক শিক্ষা শুধু অতীতের গৌরব স্মরণ করা নয়; বরং সেই দিনের সঙ্গে যুক্ত জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করার তাগিদ দিচ্ছেন তারা। বিএনপি যদি জিয়াউর রহমানের ঘোষিত জাতীয়তাবাদী দর্শনকে সময়োপযোগী সংস্কার, জবাবদিহি ও জনকল্যাণের রাজনীতির সঙ্গে সমন্বয় করতে পারে তা হলে ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য বর্তমান রাজনীতিতে অর্থবহ হয়ে উঠবে বলে মত বিশ্লেষকদের।

ওই সময়ের প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সারা দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। ওই দিনই বাংলাদেশ তার নিজের চলার পথ খুঁজে নেয়। ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যা শুরু হয়েছিল তার পরিসমাপ্তি ঘটে ৭ নভেম্বর। ৩ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া ঘটনা প্রবাহের মূল চরিত্র তিনজন। সামরিক কর্মকর্তা ক্ষণস্থায়ী সেনাপ্রধান খালেদ মোশাররফ, জাসদ নেতা কর্নেল আবু তাহের ও তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। কিন্তু ৭ নভেম্বর এসে সিপাহি ও জনতার সমর্থনে জিয়াউর রহমানই মূল নায়ক হয়ে ওঠেন। এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ষড়যন্ত্রের দায় নিয়ে ছিটকে যান খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল তাহের। তখনকার বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনী থেকে শাসনক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমান নিজেকে আলাদা করে নেন। অস্থিরতা দমন করে, পরিস্থিতি সামলে নিয়ে দ্রুতই দেশকে গণতন্ত্রের পথে নিয়ে যান। স্বাধীনতার পর প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল।

তারা বলছেন, জিয়াউর রহমান একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। রণাঙ্গনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে হতবিহ্বল জাতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছেন। সেই সাহসের ওপর ভর করেই জিয়াউর রহমান ৭ নভেম্বর দেশের নেতৃত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।

ক্ষমতাসীন বিএনপি মনে করে, স্বাধীন ও স্বনির্ভর দেশ গঠনের প্রকৃত সূচনা হয়েছিল ৭ নভেম্বর বিপ্লবের হাত ধরে। ১৯৭১ সালের পর সারা দেশের মানুষ আবার ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল ৭ নভেম্বর। দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু মনে করেন, ৭ নভেম্বর জনগণের কাঙ্ক্ষিত একটি দিন। গণতান্ত্রিক অধিকার ও আইনের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই দিনটি তৈরি হয়। বর্তমান সরকার এই দিনটি এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দিতে ৭ নভেম্বরকে শুধু ধারণ করলেই হবে না; তা রক্ষা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান বাস্তবতা ও ৭ নভেম্বরের প্রাসঙ্গিকতা : ৭ নভেম্বর ও বর্তমান বাস্তবতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সংবেদনশীল আলোচনার বিষয়। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ এবং ২০২৬ সালের বর্তমান বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই দিনটির গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা নতুন মাত্রা লাভ করেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক দৃশ্যপট আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ৭ নভেম্বরের চেতনা ও বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে গভীর সংযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মূল সুর ছিল দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বহিরাগত হস্তক্ষেপের বিরোধিতা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। চব্বিশে ছাত্র-জনতাও একটি স্বাধীন, স্বনির্ভর এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয় নিয়ে আন্দোলন শুরু করে। ফলাফল ৫ আগস্ট, যা ৭ নভেম্বরের সংহতির চেতনার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

৭ নভেম্বরের ‘সংহতি’র বার্তা বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত জরুরি হলেও দেশের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে এখনও পূর্ণ ঐক্য গড়ে ওঠেনি। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক করা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭৫ সালের মতোই বর্তমান বাংলাদেশেও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে।

৭ নভেম্বরের একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে উল্লেখ করে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দেশে আজ যে জাতীয় ঐক্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তা জিয়াউর রহমানই দেখিয়ে গিয়েছিলেন।

শুক্রবার সকালে এক সেমিনারে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে কর্নেল (অব.) আবু তাহেরের ভূমিকা ছিল বলে জাসদের যে প্রচারণা রয়েছে, তা সঠিক নয়। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বন্দিদশা থেকে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেছিলেন টু ফিল্ড আর্টিলারির সৈনিকরা। তাদের সঙ্গে ছিলেন ফোর বেঙ্গলের সৈনিকরা। জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পর টু ফিল্ড আর্টিলারির কমান্ডিং অফিসারের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তার কারণ তুলে ধরেন এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের সততা, ব্যক্তিত্ব, সাহসিকতা ও নেতৃত্বের প্রতি মানুষের আস্থা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার ঘোষণা (এই তথ্য নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, তার সমাধান ইতিহাসবিদরা করবেন বলে উল্লেখ করেন বক্তা) দেওয়ার কারণে সেনাবাহিনীর বাঙালি কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনি পরিচিত ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ৭ নভেম্বরের পর সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে তিনি স্বাভাবিকভাবেই জনপ্রিয়তার কেন্দ্রে চলে আসেন।

দেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন আরও সুসংহত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন এম সাখাওয়াত হোসেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তবে বাংলাদেশ এখনও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। এ জন্য রাজনৈতিক নেতাদের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম মনে করেন, জাতীয় ঐক্যই বড় বিপর্যয় মোকাবিলার প্রধান শক্তি। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান একই সূত্রে গাথা। যখনই জাতি অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে, তখনই নিজেদের ভেতর থেকে ঐক্যের শক্তি খুঁজে নিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক সময়ের আলোকে বলেন, ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনে এই দিনটি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে পরবর্তী সময়ে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন ধারার সূচনা করে। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই বিএনপির রাজনৈতিক ভিত্তি ও বিকাশের পথ তৈরি হয়।

তিনি মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতায় বিএনপি একটি ঐতিহাসিক সুযোগের মুখোমুখি। ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে দলটি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। এখন জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করাই বিএনপির প্রধান পরীক্ষা। বিশেষ করে ক্ষমতায় থাকাকালে বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শন এবং দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা বজায় রাখা জরুরি।

এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, ৭ নভেম্বরের প্রকৃত রাজনৈতিক শিক্ষা শুধু অতীতের গৌরব স্মরণ করা নয়; বরং সেই দিনের সঙ্গে যুক্ত জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা। বিএনপি যদি জিয়াউর রহমানের ঘোষিত জাতীয়তাবাদী দর্শনকে সময়োপযোগী সংস্কার, জবাবদিহি ও জনকল্যাণের রাজনীতির সঙ্গে সমন্বয় করতে পারে, তা হলেই ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য বর্তমান রাজনীতিতে অর্থবহ হয়ে উঠবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান সময়ের আলোকে বলেন, ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের চেতনা— যা মূলত জিয়াউর রহমানের উত্থান এবং পরবর্তীকালে বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক গভীর রূপান্তর ও আদর্শিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলি বিএনপির রাজনৈতিক বৈধতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতীক। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বর্তমান বাংলাদেশে তরুণ সমাজ ও নতুন রাজনৈতিক বিন্যাসে ঐতিহাসিক বয়ানগুলোর পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক সংস্কার, সুশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিও প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় বিএনপিকে অতীত ঐতিহ্য বা একাত্তর-পরবর্তী বা পঁচাত্তরের ন্যারেসির ওপর নির্ভর করা এবং পরিবর্তিত তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা ও নতুন রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা সমান গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে। দলের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকা এবং গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতার এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কোনো বিকল্প নেই।

স্বতঃস্ফূর্ত আয়োজন : গত দেড় দশকে ৭ নভেম্বর উদযাপনে রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা বাধানিষেধ বা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। কিন্তু পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিবেশে এই দিনটি পুনরায় উন্মুক্ত ও ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। বিএনপি ও অন্য দলগুলো এই দিনটিকে কেন্দ্র করে তাদের রাজনৈতিক শক্তি ও জনসমর্থন প্রদর্শনের সুযোগ পাচ্ছে। দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে গৃহীত কর্মসূচির অংশ হিসেবে জাতির উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দিয়েছেন। একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ৭ নভেম্বরের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দলমত নির্বিশেষে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে দুর্নীতি, বৈষম্য ও সব ষড়যন্ত্রের অবসান ঘটাতে হবে।

বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ১৯৭৫ সালের ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লব বাংলাদেশের পথ নির্ধারণ করেছিল। ‘যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করে রাখতে চেয়েছিল, জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে দেশে একদলীয় স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করতে চেয়েছিল এবং দেশের শৌর্য, বীর্য, সাহস ও সম্মানের প্রতীক সেনাবাহিনীর গৌরব ভূলুণ্ঠিত করতে চেয়েছিল, ৭ নভেম্বর দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে তাদের পরাজয় ঘটেছিল। বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সব চক্রান্ত রুখে দিয়েছিল। দেশের ইতিহাসে ঐতিহাসিক দিনটি ছিল বাংলাদেশের শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করার দিন।’

বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীও জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করে। যেখানে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের পেছনে ছিল একদলীয় শাসন, দমন-পীড়ন ও জনগণের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ। ৭ নভেম্বর সিপাহিরা বিপ্লব সংঘটিত করেন, আর সাধারণ মানুষ তাতে সংহতি প্রকাশ করে। এ কারণেই দিনটি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উদযাপনে বিএনপির সাত দিনব্যাপী কর্মসূচির শুরু আজ। দিবসটি উপলক্ষে আজ শনিবার রাজধানীতে কেন্দ্রীয় শোভাযাত্রা বের করা হবে। নয়াপল্টন থেকে শুরু হয়ে বাংলামোটর ও ফার্মগেট হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে গিয়ে শেষ হবে এই শোভাযাত্রা। কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সরকারি ছুটির এই দিনে সরকারিভাবে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে দিবস ঘিরে। দেশের সব সরকারি-বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোয় যথাযথ মর্যাদায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। সশস্ত্র বাহিনী এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন দফতরে (পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও ভিডিপি, কোস্ট গার্ড ইত্যাদি) পতাকা উত্তোলন, মিলাদ মাহফিল, প্রীতিভোজ ও বিশেষ দরবার অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া ঢাকা আর্মি স্টেডিয়ামে ক্যাডেট কোরের ডিসপ্লে এবং শিল্পকলা একাডেমিতে দেশাত্মবোধক গানের আসর ও প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচ হবে।

এ ছাড়া গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে দেশের প্রধান প্রধান সড়ক ও সড়ক দ্বীপগুলো জাতীয় পতাকা দ্বারা সুসজ্জিত করা হবে। জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনা করে সুবিধাজনক সময়ে দেশের সব মসজিদে মিলাদ-মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাত এবং মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা ও অন্য উপাসনালয়গুলোয় বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। দেশের সব হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা, শিশুকেন্দ্র, শিশু পরিবার, শিশুসদন, কিশোর সংশোধনী কেন্দ্র, শান্তি নিবাস ও ভবঘুরে প্রতিষ্ঠানে সুবিধাজনক সময়ে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে। এ ছাড়া সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার ব্যবস্থাপনায় দেশের সব শিশুপার্ক শিশুদের জন্য দিনব্যাপী বিনা টিকেটে উন্মুক্ত থাকবে। নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ আলোচনা ও রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে।

এ ছাড়া তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্রগুলোয় বিশেষ নিবন্ধ, সাহিত্য-সাময়িকী ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও রেডিওতে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার এবং সিনেমা হল ও ভ্যানযোগে প্রামাণ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শনী করা হবে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে দেশাত্মবোধক গানের আসর, সব জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে আলোচনা সভা এবং জেলা সদর ও উপজেলা পর্যায়ে প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হবে। সেই সঙ্গে শহিদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাসহ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে বিশেষ স্মারক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   ৭ নভেম্বর  বিপ্লব  সংহতি  দিবস  বিপ্লব ও সংহতি দিবস  চব্বিশ  অভ্যুত্থান  মেলবন্ধন  রাজনৈতিক বিশ্লেষক  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: