মঙ্গলবার মিরপুর-১১ নম্বর ও ১২ নম্বরের মধ্যবর্তী অংশে পোশাকশ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের চিত্র। ছবি : সংগৃহীত মজুরি বাড়ানোর দাবিতে বিক্ষোভরত পোশাকশ্রমিকদের বিরুদ্ধে পুলিশ যাতে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ না করে, সে আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। একই সঙ্গে বিক্ষোভের সময় সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের প্রতি এ আহ্বান জানায় এইচআরডব্লিউ। প্রতিবেদনটি সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে মজুরি বাড়ানোর দাবিতে বিক্ষোভরত হাজারো পোশাকশ্রমিককে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে। বিক্ষোভ চলাকালে অগ্নিসংযোগ, কারখানায় ভাঙচুর এবং পুলিশের ওপর হামলার খবরও পাওয়া গেছে। কারখানার মালিক ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে এসব সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে, পুলিশ যেন কেবল প্রয়োজন হলেই বলপ্রয়োগ করে এবং সেই বলপ্রয়োগ যেন প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত না হয়। পাশাপাশি সহিংসতায় দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
গত ৩ নভেম্বর তৌফিক হোসেন নামের এক পোশাকশ্রমিক মারা যান। তার এক সহকর্মী এইচআরডব্লিউকে বলেন, ‘দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা কারখানায় ফিরছিলাম। এ সময় তৌফিক বিক্ষোভরত শ্রমিক এবং বিক্ষোভ দমনের জন্য অন্য একটি পোশাক কারখানা থেকে ভাড়া করে আনা লোকজনের মাঝে পড়ে যান। পেছনে ফিরে দেখি, তৌফিক মাটিতে পড়ে আছেন। ভাড়া করে আনা লোকজন তাকে নির্মমভাবে পিটিয়েছিল।’
আন্দোলনরত শ্রমিকরা মাসিক ৩০ হাজার টাকা মজুরি দাবি করছেন। ২০২৩ সালে তাদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। গত ১ নভেম্বর সরকার একটি মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ড জানিয়েছে, নতুন মজুরিকাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার পর তা ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে।
৩১ বছর বয়সি এক সেলাই মেশিন অপারেটর বলেন, ‘আমার বাসা ভাড়া ৬ হাজার টাকা। রান্নার গ্যাসের দাম এখন ২ হাজার ৩০০ টাকা। আমি মাসে বেতন পাই ১৩ হাজার ৫০০ টাকা। এ বছর সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানোর সামর্থ্য আমার নেই। বলুন তো, খাবারের জন্য আর কত টাকা থাকে?’
এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, শ্রমিকদের জীবনধারণের উপযোগী মজুরির যৌক্তিক দাবি বিবেচনায় না নিয়ে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভে উসকানি দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক বিরোধীদের দায়ী করছে।
গত ৩ নভেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানায়, নাশকতার অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ৩৩ জন সমর্থককে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপির যুব সংগঠনের সদস্যরা বিক্ষোভরত শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মিছিল করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ওইদিন আশুলিয়ায় তিনজন শ্রমিকনেতাকে আটক করা হয়েছে বলেও খবর পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া সন্ত্রাসবিরোধী আইনে হাজারো অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ।
গ্রেফতার হওয়া এক ব্যক্তির ২৮ বছর বয়সি স্ত্রী বলেন, ‘তারা আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে গেছে। সে অল্প সময়ের জন্য বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিল। কোনো ধরনের সহিংসতায় সে জড়িত ছিল না।’
গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। গত এপ্রিলে গৃহীত শ্রম আইনের একটি সংশোধনীতে প্রতি তিন বছর পরপর মজুরি পর্যালোচনার বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ট্রেড ইউনিয়নের সংগঠকদের কালো তালিকাভুক্ত করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, মজুরি নিয়ে আলোচনা ঘিরে সহিংসতা ও দায়মুক্তির চক্র বন্ধ করতে হবে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোরও ভূমিকা রয়েছে। সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তির সময় ব্র্যান্ডগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে, চুক্তির শর্ত যেন কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনে উৎসাহ না জোগায় কিংবা তাদের জীবনধারণের উপযোগী মজুরি দেওয়া অসম্ভব করে না তোলে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা