ছবি : সংগৃহীত সাম্প্রতিক পুলিশের ওপর হামলা ও নাশকতার একাধিক ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও তাদের স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
তবে এসব হামলা পুলিশের পেশাদারিত্বে কোনো প্রভাব ফেলবে না। আইন অনুযায়ী পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অন্যদিকে, জনমনে আস্থা বজায় রাখতে এ ধরনের পরিস্থিতি কঠোরভাবে মোকাবিলার পরামর্শ দিয়েছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
গত তিন দিনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তাদের স্থাপনাকে লক্ষ্য করে অন্তত পাঁচটি ককটেল হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন কয়েকজন পুলিশ সদস্য। এর মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল থেকে চালানো হামলায় ওসিসহ সাত পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
সর্বশেষ গতকাল শনিবার চট্টগ্রামের বন্দর থানায় আওয়ামী লীগের মিছিলে বাধা দিতে গেলে পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। ভাঙচুর করা হয় পুলিশের গাড়ি। এতে থানার ওসিসহ ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে ৭০ থেকে ৮০টি মোটরসাইকেলের একটি বহর ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে কুড়িল বিশ্বরোডের দিকে যাওয়ার সময় ক্যান্টনমেন্ট থানার টহল গাড়ি লক্ষ করে ককটেল নিক্ষেপ করে। এতে থানার একজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
একই দিন রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের ৩ নম্বর গেটের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি মোটরসাইকেলে এসে দুর্বৃত্তরা ককটেল নিক্ষেপ করে দ্রুত পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি।
শুক্রবার রাতে রাজধানীর খিলগাঁওয়ে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) সদর দফতরের ভেতরে এবং আদাবর থানার সামনে শক্তিশালী ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় দুর্বৃত্তরা।
এদিকে, একই দিন বগুড়ার সোনাতলা উপজেলায় পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে এক আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় দুই পুলিশ সদস্যকে মারধর এবং পুলিশের পিকআপ ভ্যান ভাঙচুর করা হয়।
এর আগে ২ থেকে ৪ নভেম্বর রাজধানীসহ আশপাশের জেলা ও মহানগর এলাকায় পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে শতাধিক পুলিশ সদস্য আহত হন। এর মধ্যে শুধু আশুলিয়াতেই আহত হন অর্ধশতাধিক পুলিশ সদস্য। মিরপুরে এক পুলিশ সদস্যকে একা পেয়ে মারধর করা হয়। গাজীপুরে আরেক পুলিশ সদস্যকে মারধরের পর তার মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়।
সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এসব হামলার জন্য কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের দায়ী করেছেন। তাদের দাবি, শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে এসব হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান বলেন, একটি ফ্যাসিস্ট শক্তি আন্দোলনের নামে পুলিশকে লক্ষ্যবস্তু করে সহিংসতা চালিয়েছে। শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে তারা পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটিয়েছে।
পুলিশকে লক্ষ করে এসব হামলা তাদের পেশাদারিত্বে কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. সায়েদুর রহমান। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, পুলিশের ওপর আক্রমণ নতুন কিছু নয়। এ ধরনের হামলা পেশাদারিত্বের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। পুলিশ আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।
তিনি আরও বলেন, ক্ষমতাচ্যুত একটি অপশক্তি পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এটি তাদের ভুল পথ। কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো দলের প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ নেই। এ ধরনের যেকোনো পরিস্থিতি পুলিশ আইন অনুযায়ী পেশাদারিত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করবে।
অন্যদিকে সরকার ও পুলিশকে ব্যর্থ প্রমাণ এবং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই পুলিশের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে বলে মনে করেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ ব্যর্থ হচ্ছে— জনমনে এমন ধারণা তৈরি এবং আতঙ্ক ছড়াতেই পুলিশের ওপর আক্রমণ করা হচ্ছে। তবে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও মানুষের উদ্বেগ কমছে না।
তিনি বলেন, অপরাধীরা যদি মনে করে অপরাধ করে বা পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েও পার পাওয়া যাবে, সহজে গ্রেফতার হতে হবে না কিংবা গ্রেফতার হলেও দ্রুত জামিন পাওয়া যাবে, তা হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। জনমনে যাতে পুলিশের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পেশাদারিত্ব ও সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে