
গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার জয়নাল মিয়া ঢাকায় রিকশা চালান ১২ বছর ধরে। পরিবার নিয়ে মোহাম্মদপুর আদাবর শনিরবিল এলাকায় থাকেন ভাড়া বাসাতে। ঈদের মার্কেট করা হয়েছে কি? জানতে চাইলে তিনি একটা শ্বাস ছেড়ে বললেন, গরিব মানুষ ক্যামনে করি মার্কেট! আমাগো মতন গরিবের আবার ঈদ!
-রিকশা চালালে তো ইনকাম ভালো হয় মামা।
-হয়, তবে ঢাকা শহরে ইদানীং ড্রাইভার বেড়ে গেছে। ভাড়া পাই কম। তা ছাড়া আমার শরীরও তেমন ভালো থাকে না। পরিবারে পাঁচজন সদস্য। এদের খাবার-দাবার, আমার ওষুধ-বড়ি আর বাসা ভাড়াতেই চলে যায় আমার একার ইনকাম।
-প্রতিবার ঈদেই কি এমন পরিস্থিতি থাকে?
না, অন্যান্য ঈদে মোটামুটি ভালোই ছিল অবস্থা। পরিবারের সবার জন্য মার্কেট করেছিলাম, তবে এই ঈদে কোনো টাকাই নাই। যা কামাই তাতেই তো সংসার চলছে না, বাড়তি ঝামেলা ক্যামনে পোহাবো।
রাজধানী ঢাকার মিরপুর-১১’র একটি গার্মেন্টসে চাকরি করেন মুন্সীগঞ্জ জেলার তসলিমা আক্তার। কেমন আছেন আপু? জি¦ ভালো। একটু সময় হবে? কেন? না মানে একটু কথা বলব। বলুন, কী বলবেন। প্রতি বছর ঈদ কেমন কাটে? এমন প্রশ্নে নীরব থাকলেন তিনি কিছুটা। তারপর চোখে পানি ঝুলিয়ে বললেন
ঈদ আসে আমার জীবনে নিরানন্দ আবহ নিয়ে। কেন? কী আর বলুম ভাই, আমার বাবা নেই। দীর্ঘ অসুস্থতা নিয়ে মারা গেছেন। বাবার চিকিৎসা করাতে আমাদের ভিটেমাটি বিক্রি করা হয়েছিল। মা মালেশিয়ায় থাকলেও বেশি সুবিধায় নেই এখন। আগে ভালো অবস্থায় থাকলেও মামারা মায়ের অনেক টাকা আটকে রেখেছে। একটা ছোট ভাই আছে, গ্রামে থাকে। আমাদের আত্মীয়রাও আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন না। তাই ঈদে কোথাও যাই না। খুব মন খারাপ থাকে।
ফার্মগেটে ক্যাপ বিক্রি করেন বি-বাড়ীয়ার হুসাইন। বয়সে তরুণ। বিক্রি কেমন চলছে? এই তো চলছে কোনোরকম। ঈদে কিছু কিনছেন কি? না, এখনও কিনতে পারিনি। তবে, মায়ের জন্য একটা শাড়ি কেনার ইচ্ছা আছে। পরিবারে আর কে কে আছে? একটা ছোট ভাই ও তিনটা বোন, বাবা মৃত।
বছর ঘুরে আসে ঈদ। ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। এ আনন্দ, এ খুশি সবার জন্য। এটাই জানা কথা, এটাই প্রসিদ্ধ। কিন্তু আসলেই কি ঈদ সবার জন্য, ঈদ এলে সত্যিই কি ধনী-গরিব সবার মধ্যে আনন্দ জেগে ওঠে, সবাই কি নতুন জামা-কাপড়, মজার খাবার পায়, সবাই কি মজতে পারে ঈদের উৎসবে এসব প্রশ্নের উত্তর খুব সহজেই পাওয়া গেল এই গরিবদের কাছে।
অথচ, মহানবী (সা.)-এর যুগে ঈদ ছিল সত্যিকারের ঈদ। ধনী কি গরিব সবার জন্যই খুশির বার্তা নিয়ে আসত ঈদ। নবীজি ছিলেন অসহায়দের সহায়। তার অনুসারী সাহাবারাও ছিলেন তেমন। প্রিয় নবীর (সা.) জীবনেও ঈদুল ফিতর এসেছিল। কিন্তু প্রাণের নবী, করুণার ছবি, বিশ্বনবী (সা.) কখনও একা ঈদ উপভোগ করেননি। বরং গরিব-দুঃখী, এতিম-অসহায়দের সঙ্গে নিয়ে ঈদ করেছেন। একবার মহানবী (সা.) ঈদের নামাজ আদায় করার জন্য ঈদগাহে যাচ্ছিলেন। পথে এক অসহায় ছোট্ট শিশুকে কাঁদতে দেখে তার কাছে গেলেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন, শিশুটি জানাল, আমার পিতা-মাতা নেই। আমি অসহায়। দয়াল নবীজির অন্তর গলে গেল। তিনি বললেন, আমি যদি তোমার পিতা হই, আয়েশা যদি তোমার মা হয় এবং ফাতেমা যদি তোমার বোন হয় তাহলে তুমি কি খুশি হবে? ছেলেটির মুখে তখন ঈদের আনন্দ ঝলমল করে উঠল। তখন প্রিয় নবী (সা.) তাকে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। আম্মাজান আয়েশা ছেলেটিকে নিজ হাতে গোসল করিয়ে সুন্দর পোশাক পরিয়ে দিলেন। এরপর প্রিয় নবী (সা.) ছেলেটিকে সঙ্গে নিয়ে ঈদের জামাতে শরিক হলেন। আমরা সামর্থ্যবানরা কি পারি না একেকটা অসহায় পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে ঈদ করতে?