আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় নেতাকর্মীদের এলাকায় গণসংযোগ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। কিন্তু এ নির্দেশের পরও মনোনয়ন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এলাকায় যেতে চান না শতাধিক নেতা। দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গ্রিন সিগন্যাল পেয়েই এলাকায় যেতে চান তারা। এই নেতারা মনে করেন, নেত্রীর গ্রিন সিগন্যাল না পেয়ে এলাকায় গিয়ে গণসংযোগের জন্য টাকা খরচ করার কোনো মানেই হয় না। অবশ্য আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের অনেকেরই দাবি, তারা নিয়মিত নির্বাচনি এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। দলকে সংগঠিত রাখতে যা যা করা দরকার তারা তা করছেন।
এদিকে টানা তৃতীয় দফায় আওয়ামী লীগ সরকারে থাকায় অনেক নেতাকর্মীই অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছেন। তাদের অনেকেই এলাকায় দলের মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ করছেন। তারা জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠে তৎপরতা দেখাচ্ছেন। ঈদসহ বিভিন্ন দিবসভিত্তিক শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্টার সাঁটিয়েছেন। অর্থের শক্তিতে তারা এলাকায় নিজ নিজ বলয়ও গড়ে তুলেছেন। এমন অন্তত শতাধিক নেতা রয়েছেন যারা দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী। যদিও তারা এলাকায় যান না। ঢাকায় বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য করেন। আর তাদের অনুসারীদের দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তৈরি করছেন। এতে কোথাও কোথাও সংঘাতের ঘটনাও ঘটছে। মূলত তারা জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে মাঠ ফাঁকা করার ফন্দি আঁটছেন। তারা পরিকল্পিতভাবেই একে অপরের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচারও চালাচ্ছেন। যদিও স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় দ্বন্দ্ব-কোন্দল-সংঘাত সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কেন্দ্র থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনের সময় দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সতর্ক করে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। তবে বেশিরভাগই এ হুঁশিয়ারিকে আমলে নেননি।
এই কাতারে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একাধিক সংসদ সদস্য ও দলীয় মনোয়নপ্রত্যাশী সময়ের আলোকে বলেন, স্থানীয় নেতাদের অনেকেই আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী। তাই তারা পরিকল্পিতভাবেই সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচারে নেমেছেন। এ ছাড়া তারা দলের শীর্ষ নেতাদের বাসা বা অফিসে গিয়ে তাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন, যাতে মনোনয়ন পাওয়া যায়। এমন চিত্র আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ আসনেই রয়েছে। ফলে আগেভাগে এলাকায় গিয়ে কোনো লাভ হবে বলে মনে হয় না। এ ছাড়া দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো বলেই দিয়েছেন, তাদের সবার আমলনামা তার টেবিলে রয়েছে। ফলে দলীয় সভাপতির গ্রিন সিগন্যাল না পেয়ে এলাকায় গণসংযোগ করে কী হবে? আগে নির্বাচনি পরিবেশ তৈরি হোক, তখন সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে বিগত দিনের সরকারের উন্নয়ন ও অগ্রগতি তুলে ধরব।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রংপুর বিভাগের এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্য সময়ের আলোকে বলেন, আমি তো সংসদ সদস্য আছিই। এলাকার সঙ্গে যোগাযোগও রাখছি। তবে যেহেতু ঢাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য আছে, তাই এলাকায় যাওয়ার সুযোগ হয় না। তারপরও ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে যাই। তবে দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোভাব বোঝা দুরূহ। তাই এখনই এলাকায় গিয়ে কী করব। নির্বাচনি পরিবেশ সৃষ্টি হলে অবশ্যই যাব।
চট্টগ্রাম বিভাগের আরেক সংসদ সদস্য সময়ের আলোকে বলেন, মাঝেমধ্যে এলাকায় যাই। কিন্তু সময়ের অভাবে গণসংযোগ করার সুযোগ পাই না। এ ছাড়া দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গ্রিন সিগন্যাল এখনও পাইনি। তবে যেহেতু জাতীয় নির্বাচন সামনে, তাই শিগগিরই এলাকায় গণসংযোগে যাব।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী ও মনোনয়নপ্রত্যাশী আরেক নেতা বলেন, ইচ্ছা থাকলেও সময়ের অভাবে এলাকায় যেতে পারেন না তিনি। দলের সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশ রয়েছে এলাকায় গিয়ে গণসংযোগ করার। একই সঙ্গে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- জনগণের কাছে তুলে ধরার। কিন্তু দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচির সঙ্গে থাকায় আসলে সময় পাই না। তাই এলাকায় কম যাওয়া পড়ে। তবে যেহেতু নির্বাচন এসেছে, ধীরে ধীরে নির্বাচনি পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, তাই এখন থেকে এলাকায় যাব।
আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতা বলেন, গত ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় এবং এ সময়ের মধ্যে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক নেতার ধারণা, দলীয় মনোনয়ন পেলেই নির্বাচিত হওয়া সম্ভব। যেমন সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলের মনোনয়ন পেলেই এমপি নির্বাচিত হওয়া অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যায়। প্রায় প্রতিটি আসনেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের এমন ধারণা। তাদের প্রচেষ্টা শুধু দলীয় টিকেট পাওয়া। এলাকার মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন, ভোটারদের মন জয় করা বা নিজের পরিচ্ছন্ন ইমেজ গড়ে তোলার দিকে তাদের নজর নেই। শুধু দলীয় মনোনয়ন পাওয়া নিশ্চিত করেই তারা এমপি হতে চান। এটা দলের জন্য খুব খারাপ লক্ষণ। জনপ্রতিনিধি হবেন অথচ জনগণের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ থাকবে না, সেটা এবার হবে না। তাই জনগণের কাছে যেতে হবে। ইতিমধ্যে দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যাদের জনসম্পৃক্ততা নেই, তারা দলীয় মনোনয়ন পাবেন না। সবার আমলনামা প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে আছে। ফলে কেউ দলীয় মনোনয়ন চাইলেই পাবেন না। নেত্রীর হাতে যে আমলনামা আছে, সেই অনুযায়ী মনোনয়ন দেওয়া হবে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লী ও মনোনয়ন বোর্ডের এক সদস্য সময়ের আলোকে বলেন, মুখে যাই বলুক শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে আসতে পারে বিএনপি। তাই দলটির কর্মকা- নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া দলটিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে মাঠে নেতাকর্মীর প্রয়োজন। এ জন্য নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতাকর্মীদের জনগণের কাছে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে কেউ যদি জনগণের কাছে না গিয়ে মনে করেন মনোনয়ন পাবেন, তারা ভুল করছেন। এবার তাদেরই দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে, যাদের বিরুদ্ধে জনবিচ্ছিন্নতার কোনো অভিযোগ নেই। বরং জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে। কারও মুখ দেখে মনোনয়ন দেওয়া হবে না। তারপরও দলীয় মনোনয়ন পেতে হলে বিগত দিনে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলোর প্রচারে গুরুত্ব দিয়ে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফর উল্ল্যাহ সময়ের আলোকে বলেন, নেত্রী তো নির্দেশ দিয়েই দিয়েছেন, এলাকায় গিয়ে জনগণের সঙ্গে মিশে যেতে হবে। পাশাপাশি বিগত দিনে সরকারের উন্নয়নের কর্মকা- জনগণের কাছে তুলে ধরতে হবে। অর্থাৎ জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। এ নির্দেশের পর এখন অনেক নেতাই নিয়মিত এলাকায় যান। যারা দলে সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মানবেন, তারাই দলের মনোনয়ন পাবেন। এ ছাড়া দলের মনোনয়ন বোর্ডের সবার মতামতের ভিত্তিতেই দলীয় মনোনয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর আরেক সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনমুখী দল। আগামীতে সংবিধান অনুযায়ী যথাসময়ে নির্বাচন হবে। ইতিমধ্যে নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এলাকায় যেতে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে নেতাকর্মীরা এখন এলাকামুখী। আর কেউ এলাকায় না গিয়ে দলীয় মনোনয়ন আশা করলে তিনি ভুল করছেন।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নেতাকর্মীদের এলাকায় গিয়ে গণসংযোগ করতে বলেছেন। সেই নির্দেশ মেনে অনেকেই যাচ্ছেন। যারা নির্দেশ মানবেন না, সেটি তাদের বিষয়।