বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই বাজেটের

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাজেট

অর্থনৈতিক সংকটকে উপেক্ষা করে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, বার্ষিক উন্নয়ন ও বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রায়

2023-06-03T03:35:17+00:00
2023-06-03T03:35:17+00:00
 
  বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬,
২০ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
বাজেট
বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই বাজেটের
সিপিডির সংবাদ সম্মেলন
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ৩ জুন, ২০২৩, ৩:৩৫ এএম 
অর্থনৈতিক সংকটকে উপেক্ষা করে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, বার্ষিক উন্নয়ন ও বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রায় যে চমক দেখানো হয়েছে তা উচ্চাভিলাষী, বাস্তবসম্মত নয়। তাই বাজেট বাস্তবায়নে হোঁচট খেতে হবে বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)।

শুক্রবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়। বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে পর্যালোচনা তুলে ধরেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। ব্রিফিং শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সংস্থাটির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এবং গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। ফাহমিদা খাতুন বলেন, আমরা যদি বৈদেশিক আয়ের দিকে তাকাই তা হলে দেখব রেমিট্যান্স নিম্নমুখী। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও নিম্নমুখী। বৈদ্যুতিক এবং জ্বালানি খাতে বড় একটা ঘাটতি দেখা গেছে। ফলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি বলেন, গত দুই অর্থবছরের উন্নয়নের যে সূচক দেখানো হয়েছে তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। নতুন অর্থবছর ২০২৩-২০২৪ এ জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। গত অর্থবছরেও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছিল। পরে এটাকে নামিয়ে ৬ শতাংশ করা হয়েছে।

আমরা যদি সরকারি বিনিয়োগের হার দেখি সেটা ৬ দশমিক ২ শতাংশ ধরা হয়েছে। ২০২৪ সালের জন্য ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ জিডিপির অংশ হিসেবে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ ধরা হয়েছে। কিন্তু ২০২৩ সালে আমরা দেখেছি যেটা ধরা হয়েছিল, সেটা কম হয়েছে এখন পর্যন্ত এবং সেটা ২১ দশমিক ৮ শতাংশ। এখান থেকে লাফ দিয়ে ২৭ শতাংশ কীভাবে হবে? সেটা আমাদের কাছে মনে হচ্ছে একটি উচ্চাকাক্সক্ষা।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং পণ্যের ঊর্ধ্বমুখীর  লাগাম টেনে ধরার জন্য যে প্রস্তাবনা করা হয়েছে ও যে সমাধান দেওয়া হয়েছে তা কিন্তু সম্ভব নয়। মূল্যস্ফীতির হার যে তারা ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলছেন, তা সম্ভব হবে না। মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য যে আর্থিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সেখানে আমদানি করা কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে কর রেয়াত দিলে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেত। কিন্তু তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

করযোগ্য নয় এমন ব্যক্তিকেও করের আওতায় আনা বৈষম্যমূলক বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার একদিকে করমুক্ত আয়ের সীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়িয়ে সাড়ে ৩ লাখ নির্ধারণ করা করেছে। অন্যদিকে যে ব্যক্তির আয় করযোগ্য নয় তিনি কোনো প্রয়োজনে টিআইএন সার্টিফিকেট নিতে গেলেই ২ হাজার টাকা কর দিতে হবে।

তিনি বলেন, এ ছাড়া আমাদের অর্থনৈতিক সংস্কারের যে কথা ছিল সেগুলোর বিষয়ে বাজেটে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই। এই বাজেট এমন একটা সময় প্রণয়ন করা হয়েছে যখন আইএমএফের বিভিন্ন শর্ত আছে ঋণ দেওয়ার। বাজেট উপস্থাপনায় তিনবার আইএমএফের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু শর্তের বিষয়ে পরিষ্কার কিছু বলা হয়নি। কিন্তু আমরা দেখেছি, বিভিন্ন যে লক্ষ্যমাত্রা আছে সেই শর্তগুলো পরিপালনের ক্ষেত্রে কিছুটা ইঙ্গিত রয়েছে। 

ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ ১৫ শতাংশ ধরা হয়েছে। এই বছরের ঋণপ্রবাহ যেটা ধরা হয়েছে সেটা গত বছরের ধরা ঋণপ্রবাহের সঙ্গে মিলছে না। এ ছাড়া ব্যক্তি খাতের যে বিনিয়োগের হার ধরা হয়েছে এমন ঋণপ্রবাহ দিয়ে কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তা আমাদের বোধগম্য নয়।

আইএমএফকে খুশি করার জন্য বাজেট করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে ফাহমিদা খাতুন বলেন, এই বাজেটে আইএমএফকে খুশি করার কথা বলা হলেও বাজেটের কোথাও আইএমইএফের শর্তের বিষয়ে তেমন কিছুই বলা হয়নি। পুরো বাজেট বক্তৃতায় তিনবার আইএমএফ শব্দটি অর্থমন্ত্রী উচ্চারণ করেছেন। তবে সেটি দেশের অর্থনীতি নিয়ে আইএমএফ কখন কী বলেছে তার আলোকে বলেছেন। তাই আইএমএফকে খুশি করার মতো তেমন কিছু চোখে পড়েনি। আবার ব্যবসায়ীরাও বলছেন তারাও খুশি না। সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা বাড়িয়েছে। তাই সাধারণ মানুষও খুশি না। সুতরাং বাজেটে কে খুশি হলো আমি খুঁজে পাচ্ছি না।

সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা যে বলি বছরের পর বছর অনুমানগুলো সত্য হয় না এবং বাস্তবতার সঙ্গে মিল থাকে না। যখন বাজেট করা হয় সেই বাজেটের পরিণতি সেটাই হয় যেটা অনুমিতির কারণে দুর্বল ছিল। আপনারা দেখেছেন চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে ৭ শতাংশ সেখানে হয়েছে ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ। রিজার্ভ ৪৬ বিলিয়নের জায়গায় ৩১ বিলিয়ন (২৯ বিলিয়ন) হলো। ডলার এক্সচেঞ্জ রেইট ১০৮ টাকা হলো। মুদ্রাস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশ হলো। বাস্তবতাকে বিবেচনা না করে আকাক্সক্ষাকে মাথায় রেখে বাজেট করলে এ অবস্থা হয়।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নতুন অর্থবছরের বাজেটের মূল উদ্দেশ্যে থাকা উচিত ছিল চলমান অর্থনীতিতে যে স্থিতিশীলতার সংকট রয়েছে সেটা ঠিক করা। কিন্তু এবারের বাজেট যেসব অনুমিতির ভিত্তিতে করা হয়েছে, সেই জায়গায় দুর্বলতা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে এসব দুর্বল জায়গার প্রতিটিতে বাজেট পরিকল্পনা হোঁচট খাবে। এ বাজেট বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে।

ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া প্রসঙ্গে সিপিডির এই বিশেষ ফেলো বলেন, দেখতে হবে সংস্কারের কোন জায়গাগুলোতে শক্তভাবে হাত দিয়ে এই সমস্যা সমাধান করা যাবে। আমরা অনেক দিন ধরে বলছি একটি ব্যাংকিং কমিশন করার জন্য। ২০০৯ সালে যখন এই সরকার ক্ষমতায় আসে তখন ঋণখেলাপি ছিল ২১ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আজকে ঋণখেলাপি ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। এটা নিয়ে কারও কোনো দুশ্চিন্তা নেই। এটা কারা নিচ্ছেন (ঋণ), আর কারা দিচ্ছেন। এ কারণে ব্যাংকিং খাতে অনেক সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।

বাজেটের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে বড় ঋণের পরিকল্পনা সরকারের। এ বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যাংকে তারল্য সংকট চলছে। এমন অস্থির সময়ে সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ পাবে না। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দারস্থ হতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিমধ্যে টাকা ছাপিয়ে (হার্ড মানি) সরকারকে ঋণ দিয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।

এবারের বাজেট নির্বাচনি কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকারের হাতে এবার খুব বেশি বড় রাজস্ব নেই। সরকার ঘাটতির অর্থ দিতে পারেনি। যে কাজটি সরকার করেছে, যে সুবিধাগুলো আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী কমিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছে সেই সুবিধাগুলোতে সরকার হাত দেয়নি, বিভিন্ন সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে। তার ভেতরে রয়েছে কর কাঠামোতে হাত না দেওয়া, তার ভেতরে রয়েছে ব্যক্তিশ্রেণির যে ইনকাম ট্যাক্স তাতে হাত না দেওয়া, তার ভেতরে রয়েছে রফতানি প্রণোদনার জন্য যে টাকাটি সেখানে হাত না দেওয়া। নতুবা কিন্তু এই বছর থেকেই এগুলোতে হাত দেওয়ার কথা ছিল। সম্ভবত সরকার নির্বাচনের পরে এই সংস্কারগুলোতে হাত দেবেন, যদি আইএমএফের সঙ্গে অব্যাহতভাবে এই সংস্কারগুলো অব্যাহত রাখে।

তিনি আরও বলেন, ডিরেক্ট ট্যাক্স (প্রত্যক্ষ কর) বাড়ানোর ক্ষেত্রে এখনও আমাদের চরম অনীহা। এবং সেই ডিরেক্ট ট্যাক্সের ভেতরে সুবিধাভোগী কারা যাদের জন্য আমরা এগুলো করতে চাচ্ছি না, তারা বড় বড় ব্যবসায়ী ও বড় বড় আয়গোষ্ঠীর মানুষ। তাদের আমরা টাচ (স্পর্শ) করতে চাচ্ছি না। আমরা ইনডিরেক্ট ট্যাক্স (পরোক্ষ কর) বাড়াতে চাচ্ছি।

Advertisement
Loading...
Loading...
বাজেট- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: