দেশে শিক্ষা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য, মজুরি, কর্মে অংশগ্রহণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নেতৃত্ব ইত্যাদি ক্ষে
ত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে এখন বৈষম্য রয়েছে। এ বৈষম্য নিরসন করতে সরকার ২০০৯ সালে জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন তৈরি করে। তবে শুরুতে ৪টি মন্ত্রণালয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ পায়। এর মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় উল্লেখযোগ্য। পরে পর্যায়ক্রমে ৪৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ অন্তর্ভুক্ত হয়।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য যে জেন্ডার বাজেট তৈরি করা হয়েছে তাতে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে ১৬টি মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। আর তা হলো-নারীর প্রজনন ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি ও পুষ্টির উন্নয়ন, নারীর অনুকূলে সরকারি সম্পদ ও সেবা লাভের সুযোগ, নারী শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, নারীর সার্বিক কর্মঘণ্টা কমানো, উৎপাদন থেকে শুরু করে শ্রমবাজার ও আয়বর্ধক কাজে নারীর অধিকতর অংশগ্রহণ, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর মাধ্যমে নারীর অসহায়ত্ব, দুস্থতা ও ঝুঁকি কমানো, নারীর ক্ষমতায়ন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ফোরামে নারীর অংশগ্রহণ, নারীর নিরাপত্তা ও চলাফেরা নিশ্চিত করা, নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা, নারীর সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, নারীর আইন ও বিচার প্রাপ্তি, নারীর ওপর সহিংসতা ও নির্যাতন কমানো, জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট দুর্যোগ প্রশমনে নারীর সক্ষমতা বাড়ানো ও নারীর গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ।
জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে নারীর ক্ষমতায়নে মোট বরাদ্দের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নারীর হিস্যা হচ্ছে ১৯ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের মোট বাজেটের নারীর হিস্যা হচ্ছে ১৯ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য বিভাগের ৮ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। তবে নারীর ক্ষমতায়নে বেশি জেন্ডার সংশ্লিষ্ট বরাদ্দপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় ও বিভাগ হচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগ, কৃষি ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ।
নতুন বাজেটে উৎপাদন, শ্রমবাজার ও আয়বর্ধক কাজে নারীর বেশি অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে। যার পরিমাণ ৭ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হচ্ছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। যার পরিমাণ ৩ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা।
সরকারি সেবা প্রাপ্তিতে নারীর সুযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে যেখানে ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রকৃত ব্যয় ছিল ৪৬ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা। নতুন বাজেটে এর বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৮ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। জেন্ডার বাজেটে বরাদ্দের শতকরা হার ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে ছিল ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ। সেখানে নতুন অর্থবছরে এসে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ কিছুটা কমেছে।
জানা গেছে, এই গ্রুপের মধ্যে আইন ও বিচার বিভাগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ধর্ম, ভূমি, বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেটের বরাদ্দের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। একই সঙ্গে হিস্যাও কমে গেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভূমি মন্ত্রণালয় ভূমির মালিকানা নিশ্চিতকরণে ও ভূমি-সংক্রান্ত তথ্য ও সেবা প্রদানের মাধ্যমে নারীর বৈষম্য দূর করতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। একই ভাবে ধর্ম মন্ত্রণালয় বিভিন্ন ধর্মের যথাযথ ব্যাখ্যা প্রদানের মাধ্যমে নারীর প্রতি কুসংস্কার দূর করার ব্যাপারে ভূমিকা পালন করতে পারে।
প্রতিবেদনে নারী উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেশ কয়েকটি প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-বিদ্যালয়ে কার্যকর স্কুল হেলথ কর্মসূচি না থাকা, পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ সরবরাহে ঘাটতি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প পরিচালনায় নারীর অংশগ্রহণ লক্ষণীয়ভাবে বাড়ছে। দেশে ২০১৮ সালে বিদ্যমান ৮টি উইমেন চেম্বার ছিল। ২০২২ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ১৮টি। ‘ই-বাণিজ্য করব, নিজের ব্যবসা গড়ব’ প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে মোট ৭ হাজার ৪০০ জন নারীকে ই-বাণিজ্য সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
তবে ইতিমধ্যে সারা দেশে ৫ হাজার ৬২৫ জন নারী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনায় প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে অপ্রতুলতা বিদ্যমান। এ ছাড়াও শিল্প ক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারে নারী শ্রমিকদের অনীহা ও দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। এর পাশাপাশি নতুন ব্যবসা শুরু করার ক্ষেত্রে নারী উদ্যোক্তাদের পারিবারিক ও সামাজিক বাধা রয়েছে।
প্রতিবেদনে এ ব্যাপারে ৫টি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিটি জেলায় উইমেন চেম্বার গঠন ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ তহবিল গঠন করা যেতে পারে। এ ছাড়াও বিদেশে বাণিজ্য প্রতিনিধি পাঠানোর ক্ষেত্রে উৎসাহ দিতে হবে।