বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। গত মে মাস থেকে দুই সপ্তাহের বেশি টানা তাপদাহ তার জ্বলন্ত উদাহরণ। আর ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ নিম্ন বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থান করছে।
তাই জলবায়ু পরিবর্তন তাড়িত দুর্যোগে এখন ঝুঁকিগ্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ করে বন্যা হওয়া থেকে শুরু করে ঘূর্ণিঝড়, অসময়ে বৃষ্টিপাত, তাপদাহ সবকিছু যেন জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত।
বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা এই অঞ্চলের জলবায়ু পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের আভাস দিয়েছে। এর মধ্যে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, বন্যা পর্যায়ক্রমে বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের দুর্বলতা নিয়ে বিশ্বব্যাংক ইতিমধ্যে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আবার এই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সম্প্রতি এক নোটে উল্লেখ করেছে, শুধু গ্রীষ্মম-লীয় ঘূর্ণিঝড়ের কারণেই বার্ষিক গড় ক্ষতির পরিমাণ প্রতি বছর এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা জিডিপির ০ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থনৈতিক বিপন্নতার কথা চিন্তা করে বাংলাদেশ দ্বিমুখী কৌশল গ্রহণ করেছে। আর এই কৌশল নেওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবিলা করা।
জানা গেছে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ তিনটি খাতে কার্বন নিঃসরণ প্রচলিত মাত্রা থেকে ৫ শতাংশ কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপন্নতা কমানো ও সব স্তরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় জলবায়ু অভিযোজনকে সমন্বিত করার জন্য পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আর পরিকল্পনা অনুযায়ী জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা গত বছর অর্থাৎ ২০২২ সালে সরকার অনুমোদন দিয়েছে। আটটি খাতে এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ও এর ক্ষতিকর প্রভাব প্রশমনের জন্য সরকার বেশ কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এই সব কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জলবায়ু অর্থায়ন করা হচ্ছে। যা জলবায়ু অর্থায়ন নামে পরিচিত। জলবায়ু সম্পৃক্ত ২৫টি মন্ত্রণালয় বিগত কয়েক বছর থেকে বরাদ্দ পেয়ে আসছে। তবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি জলবায়ু ট্রাস্ট নামে একটি সংস্থা নিয়মিত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়ন করে আসছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৬টি থিমেটিক এরিয়ায় ২৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বরাদ্দ পেয়ে আসছে। থিমেটিক এরিয়ার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য অন্যতম। এই তিনটি খাতে অর্থ বিভাগ থেকে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়ে আসছে। আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে ১৫ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য বাজেট বরাদ্দ ছিল ১৩ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা। তবে সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৭ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা। মোট জলবায়ু সম্পৃক্ত বরাদ্দের শতকরা হার ৪২ দশমিক ২৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের তুলনায় সংশোধিত বাজেটে বৃদ্ধি পেয়েছে ৪৭ দশমিক ৬২ শতাংশ।
জানা গেছে, পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বাজেট কাঠামোতে মধ্যমেয়াদি কৌশলগত উদ্দেশ্যের সঙ্গে সংগতি রেখে অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে-কার্বন নিঃসরণ কমাতে সিডিএমসহ কার্যক্রম বাস্তবায়ন, প্রশমন ও অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানো, সামাজিক বনায়ন ও সবুজ বেষ্টনি তৈরি করা, বায়ুদূষণ কমানো ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা। এ ছাড়াও বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ কর্মকৌশল ও কর্মপরিকল্পনা ও অভিযোজন পরিকল্পনা হালনাগাদকরণ বাস্তবায়ন। এই মন্ত্রণালয়ের প্রশমন ও লো কার্বন ডেভেলপমেন্ট থিমেটিক এরিয়ায় ৩০ দশমিক ৯৭ শতাংশ বরাদ্দ পেয়ে সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে।
আগামী অর্থবছরে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে জলবায়ু সম্পৃক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯৭৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ ছিল ৯০০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। তবে সংশোধিত বাজেটে কমিয়ে তা করা হয়েছে ৮৮৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। উন্নয়ন বাজেটে জলবায়ু সম্পৃক্ততার হার ৩৭ দশমিক ৩১ শতাংশ।
কৃষি মন্ত্রণালয়ে জলবায়ু সম্পৃক্ত বরাদ্দের পরিমাণ আগের অর্থবছরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে জলবায়ু সম্পৃক্ত বরাদ্দের পরিমাণ চলতি অর্থবছরের তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি অর্থবছরে ছিল ৩২৮ কোটি টাকা। আর চলতি অর্থবছরের বরাদ্দের পরিমাণ ৩২৮ কোটি টাকা ২৭ লাখ টাকা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের পরিমাণ আগামী অর্থবছরে চলতি অর্থবছরের তুলনায় কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগে বরাদ্দের পরিমাণ চলতি অর্থবছরের তুলনায় আগামী অর্থবছরের বরাদ্দ কমে গেছে। চলতি অর্থবছরে ছিল ৬৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। আর আগামী অর্থবছরের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
জানা গেছে,আগামী অর্থবছরে স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্য বেশ কয়েকটি প্রকল্পে জলবায়ু সম্পৃক্ত বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, অতি বৃষ্টি ও বন্যায় সিলেট মহানগরীর ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো উন্নয়ন। এর জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৪৭৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। তবে চলতি অর্থবছরের তুলনায় বরাদ্দ বাড়ছে। তবে কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ে বাজেট বরাদ্দ কমছে।
আগামী বাজেটে নির্বাচিত মন্ত্রণালয় ও বিভাগের শতাধিক প্রকল্প ও কর্মসূচিগুলো জলবায়ু সংশ্লিষ্টতার ভারযুক্ত মানদ- হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে-খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও নলেজ ম্যানেজমেন্ট, প্রশমন ও লো কার্বন ডেভলপমেন্ট, দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা জোরদার করা।