বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। ফাইল ছবি
প্রস্তাবিত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মাণে কতটুকু কার্যকরী তা জানতে চাওয়া হয়েছিল বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের কাছে।
ফোনে সময়ের আলোকে তিনি স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ ও বাজেট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু পয়েন্ট উল্লেখ করেছেন। প্রস্তাবিত বাজেটে স্মার্ট
বাজেটে স্মার্ট দেশনির্মাণের আকাক্সক্ষা আছে, স্পষ্ট রূপরেখা নেই বাংলাদেশ নির্মাণের তীব্র আকাক্সক্ষা রয়েছে জানিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, কিন্তু স্মার্ট বাংলাদেশ তৈরির বাস্তবতার জন্য যেই পরিবর্তন জরুরি সে বিষয়ে বাজেটে স্পষ্ট কোনো রূপরেখা নেই।
বাজেটে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে বিশেষ বরাদ্দ ১০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে দেওয়া বরাদ্দ যথেষ্ট কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাজেট বক্তব্য আমি গতকাল পড়া শেষ করেছি। এখানে কতবার স্মার্ট বাংলাদেশের কথা বলা রয়েছে তা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছি না, কিন্তু প্রতিটি অধ্যায়ে একাধিকবার স্মার্ট বাংলাদেশ বা স্মার্ট কথাটি রয়েছে। অর্থাৎ স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মাণের তীব্র আকাক্সক্ষা এই বাজেটে রয়েছে। কিন্তু স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য প্রকৃত অর্থে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে সে বিষয়ে বাজেটে আমি স্পষ্ট কোনো ধারণা পাইনি।
১০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ ও তহবিল গঠন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেই অর্থেই বলা হোক এটি সামান্য বরাদ্দ। আর স্মার্ট বাংলাদেশের মতো এত বড় পরিসরের একটি কার্যক্রম গ্রহণের জন্য সরকারি অবকাঠামো, আইন, নিয়ম, কোড-এসব ক্ষেত্রে যেই পরিবর্তন প্রয়োজন তা কীভাবে হবে, সে জন্য স্পষ্টভাবে বরাদ্দের কথাও বলা নেই। আমি এখন পর্যন্ত খুঁজে পাইনি।
স্মার্ট বাংলাদেশ ধারণা প্রসঙ্গটি বর্ণনা করে তিনি বলেন, মোটা দাগে অর্থনীতির পরিভাষায় বললে স্মার্ট বাংলাদেশ হবে স্মার্ট গভর্নমেন্ট এবং স্মার্ট বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু সরকার স্মার্ট হওয়ার জন্য কতটুকু আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে সেটা প্রশ্ন। এখানে মনে রাখতে হবে, ডিজিটাল এবং স্মার্ট এক বিষয় নয়। স্মার্ট অর্থ চতুর বা চৌকস। চতুর হলে কম খরচে বেশি উৎপাদনের ব্যবস্থাপনা তৈরি করা যায়। এ কারণেই তো সবাই স্মার্ট বা চতুর হতে চায়। কিন্তু আমাদের সরকার চতুর হচ্ছে কি না, সেটা প্রশ্ন।
এ সময় প্রকিউরমেন্ট পদ্ধতির বিষয়টিকে সামনে এনে তিনি বলেন, আমার ধারণা ১০ বছরের বেশি সময় হয়ে গেছে ই-টেন্ডার চালু হয়েছে। মূলত চাঁদাবাজি বা টেন্ডারবাজি বন্ধ, বাস্তবসম্মত মূল্যে পণ্য ক্রয়ের মাধ্যমে সরকারের সাশ্রয় এবং দ্রুত কেনাকাটার কাজটি যেন হয়, এ কারণেই ই-টেন্ডার ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু আসলেই কী তা হচ্ছে। যদি হয়, তা হলে বালিশ কাণ্ড বা এ ধরনের বেশি মূল্যে পণ্য ক্রয়ের বিষয়টি কেন ঘটছে? এর সব তথ্যই তো সাংবাদিকরা গণমাধ্যমে এনেছে। আর প্রকল্প বাস্তবায়নে বারবার সময় বৃদ্ধি দূর করতে প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ের কাজটিও কিন্তু এখনও দীর্ঘ সময় ধরে হচ্ছে। অর্থাৎ সময়ও বাঁচেনি, অর্থও বাঁচেনি। শুধু ডিজিটাল হয়েছে। তা হলে আমরা কীভাবে স্মার্ট হলাম?
আমাদের আয়কর বা রাজস্ব ব্যবস্থাপনা কি স্মার্ট হয়েছে-এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, অনলাইন টিন নম্বর নিতে পারছেন। অনলাইনে আবেদনের ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু সম্পূর্ণ কাজটি করতে যেই জটিল আইন এবং কোড রয়েছে তার সুরাহার জন্য কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ স্মার্টলি সহজে তার কাজটি করতে পারছে কি? এই খাতে পূর্বে যেই খরচ হতো, সেই খরচ কি হ্রাস হয়েছে? যদি না হয় তা হলে কীভাবে এই ব্যবস্থা স্মার্ট হলো? শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারই তো স্মার্টনেস নয়। একটি প্রযুক্তির মধ্যে আপনি ইনপুট হিসেবে আবর্জনা প্রদান করলে তার আউটপুট হিসেবেও আবর্জনাই পাবেন।
সাক্ষাৎকারের শেষ ভাগে তিনি বলেন, সরকার যেই স্মার্ট বাংলাদেশের ঘোষণা দিয়েছে তা নির্মাণের জন্য আইন, কোড, পলিসি থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে পরিবর্তন প্রয়োজন। অবকাঠামোগত পরিবর্তনও প্রয়োজন। আপনি সরকারি একজন কর্মকর্তাকে কম্পিউটার দিতে পারেন। কিন্তু কম্পিউটার কেন্দ্রিক কাজ না থাকলে তারা সেই কম্পিউটারটিকে বোরকা পরিয়ে (ঢেকে) রাখবে, এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং সরকারকে আগে স্মার্ট হতে হবে, স্মার্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।