২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করা হয় ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ নিয়ে। বলা হয়, ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপরেখা বাস্তবায়িত হবে।
আওয়ামী লীগ ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে তখন অধিকাংশ সাংবাদিক, এমনকি গণমাধ্যমেরও স্পষ্ট ধারণা ছিল না। অনেকের কাছেই ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের বিষয়টি ছিল দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এ দেশের মানুষ ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রকল্পের আসল সুফল সম্পর্কে ধারণা লাভ করে করোনা মহামারির সময়। ক্যাশলেস বিনিময় ব্যবস্থা, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ব্যবহার করে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া, হোম অফিস এবং ওয়েবিনারসহ আরও অনেক বিষয়ের জন্য আমাদের যে ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১০ বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে তোলা হয় তার শতভাগ সুফল মানুষ ভোগ করে ২০২০-২১ সালে।
মহামারি-পরবর্তী সময়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ যখন বাস্তবতা তখন প্রথম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয় স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মাণের কথা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ বিভিন্ন সময় এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা করেন। এরপর ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার এবং আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এ বিষয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু স্মার্ট বাংলাদেশ নিয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত আলোচনা তৈরি হয় আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপকমিটি আয়োজিত ফোর আই আর সম্মেলনে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে সরাসরি সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা আসে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের ঘোষণা। এ সময় প্রশ্ন উঠে স্মার্ট বাংলাদেশ কী?
স্মার্ট বাংলাদেশ নিয়ে সবচেয়ে স্পষ্ট ধারণা প্রদান করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। তিনি বলেন, স্মার্ট বাংলাদেশ ডিজিটাল বাংলাদেশের পরের ধাপ। ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রগতি আপনি জানতে পারবেন। কারণ আমরা এটি ২০০৯ সালে শুরু করে আজ পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী ২০২২ সালে ৭ এপ্রিল স্মার্ট বাংলাদেশের ধারণাটি গ্রহণ করেন ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্সের মিটিংয়ে। স্মার্ট বাংলাদেশ বলতে কী বোঝায় গত ১২ ডিসেম্বর তা তিনি চারটি পিলারসহ বিস্তারিত বুঝিয়ে বলেছেন প্রকাশ্যে। এরপর থেকেই আমরা স্মার্ট বাংলাদেশ শব্দটা ব্যবহার শুরু করেছি। ডিজিটাল বাংলাদেশের যে উদ্যোগ ছিল সেগুলোকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি আমরা। আমি মনে করি, এটিই স্মার্ট বাংলাদেশের অংশ।
স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলাটাই চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এটি এমন না যে একটা ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করে আমরা কাজ করব। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় কোনো একটি নির্দিষ্ট খাত স্মার্ট বাংলাদেশের টার্গেট নয়। উন্নত, সমৃদ্ধ, বৈষম্য-দারিদ্র্যহীন একটা দেশ গড়ে তোলাই হচ্ছে স্মার্ট বাংলাদেশ। এর জন্য আমাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। যা যা প্রযুক্তি ব্যবহার দরকার, সব ক্ষেত্রে তা ব্যবহার করা হবে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রকল্প ছিল প্রতিটি ক্ষেত্রে ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট তৈরি করা। আর স্মার্ট বাংলাদেশের কাজ হবে এই ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টগুলোকে সমন্বিত এক সেবার মধ্যে নিয়ে আসা। এ ক্ষেত্রে স্মার্ট বাংলাদেশের একটি উদাহরণ হিসেবে ‘মাইগভ’ অ্যাপসের কথা বলেন তারা। তবে এই অ্যাপসটি এখনও স্বয়ংসম্পন্ন নয় বলে মনে করেন তারা। স্মার্ট বাংলাদেশের ভিত্তি বা স্তম্ভ হিসেবে যে চারটি বিষয়ের কথা বলা হয়েছে তা হলো-স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট ইকোনমি, স্মার্ট গভর্নমেন্ট ও স্মার্ট সোসাইটি।
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই) আয়োজিত ‘লেটস টক’ অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরে ইন্টারেক্টিভ শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেখানে শিশুরা নাটক পরিবেশন, কবিতা আবৃত্তি, অভিজ্ঞতামূলক শিক্ষা এবং সক্রিয় শিক্ষার মাধ্যমে মানসম্পন্ন শিক্ষা লাভ করবে। শিক্ষার্থীরা নিজে নিজে অথবা দলগতভাবে কাজ করতে শিখবে। ফলে অল্প বয়স থেকেই তাদের যোগাযোগ, নেতৃত্ব, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, সমস্যা সমাধান এবং আরও অনেক কিছুর বিকাশ ঘটাবে।
তিনি আরও বলেন, তৃতীয় স্তরের প্রতিটি বিভাগে ভাষা, আইসিটি, সফট স্কিল এবং উদ্যোক্তাদের বাধ্যতামূলক কোর্স যুক্ত করার প্রস্তাব করেছেন। নতুন কোর্স মডিউল এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম তৈরি করা হচ্ছে। মূলত প্রাথমিক স্তরে এই নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা স্মার্ট বাংলাদেশের ভিত্তি। এর মাধ্যমে তৈরি হবে ভবিষ্যতের স্মার্ট সিটিজেন এবং স্মার্ট সোসাইটি। এ ছাড়াও সমন্বিত সেবা ব্যবস্থার জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি। আর এখানেই আসে স্মার্ট ইকোনমি এবং স্মার্ট গভর্নমেন্টের কথা।
চলতি বছর বাজেটে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রয়েছে ১০০ কোটি টাকা। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্যমতে, শুধু স্মার্ট বাংলাদেশ ধারণা প্রদানের জন্য এবং এ বিষয়ক সচেতনতা তৈরির জন্যও ১০০ কোটি টাকা বাজেট যথেষ্ট নয়। তা হলে প্রশ্ন থেকে যায়, কীভাবে এত বড় একটি প্রকল্প মাত্র ১০০ কোটি টাকায় বাস্তবায়িত হবে?
এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, স্মার্ট বাংলাদেশের জন্য স্মার্ট গভর্নমেন্ট এবং স্মার্ট বেসরকারি খাত গড়ে তোলা জরুরি। কিন্তু শুধু ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা বা প্রযুক্তির ব্যবহারই স্মার্ট বাংলাদেশ নয়। মনে রাখা উচিত ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং স্মার্ট বাংলাদেশ এক বিষয় নয়। স্মার্ট অর্থ চতুর। আপনি চতুর হয়ে সব ক্ষেত্রে কম খরচে বেশি উৎপাদন ব্যবস্থাপনা তৈরি করবেন। আমাদের দেশে সব ক্ষেত্রেই বর্তমানে প্রযুক্তির ব্যবহার হলেও সরকারি কার্যাবলী, আইন ও কোড এখনও স্মার্ট হওয়ার পথে বাধা। এবারের বাজেটে সেই প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার জন্য তেমন কোনো রূপরেখা আমার নজরে আসেনি। তবে হ্যাঁ, বাজেটজুড়ে স্মার্ট বাংলাদেশ তৈরির তীব্র আকাক্সক্ষা রয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবায়নে বাস্তবমুখী উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের কাছে বর্তমান বাজেটে সরকার ঘোষিত স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের বিষয়টি কতটুকু বাস্তবায়নযোগ্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্মার্ট বাংলাদেশ বিষয়ক কোনো ধারণা আমার কাছে নেই। সুতরাং এ বিষয়ে বাজেটে কী রয়েছে বা এটি বাস্তবায়নে বাজেটে কোনো ব্যবস্থাপনা রয়েছে কি না আমার জানা নেই। এ বিষয়ে যারা পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছেন তারাই ভালো বলতে পারবেন।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপকমিটির সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সবুর বলেন, আসলে স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মাণের বিষয়টি এখনও শুরু হয়নি। প্রায় ১৫ বছর আগে দিন বদলের সনদ বলে যেই ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিয়েছিলেন, সেখান থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন শেষে এখন আমরা স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মাণের কথা বলছি। বাজেটের এই ১০০ কোটি টাকা শুধু একটি তহবিল। কিন্তু এরই মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য বিগত বছরগুলোতে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। আমাদের শিক্ষা খাত, প্রযুক্তি খাত, সব ক্ষেত্রে এর পরিবর্তন রয়েছে। আর এটা কেবল শুরু। সামনের প্রতিটি বাজেটেই এ বিষয়ে বরাদ্দ থাকবে। আর এই ১০০ কোটি টাকা তহবিলের বাইরেও বর্তমান সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস এবং ন্যানো টেকনোলজিসহ প্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবিলার প্রস্তুতি এটি। সুতরাং এককভাবে বাজেটে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের বরাদ্দ খুঁজে পাওয়া না গেলেও, প্রতিটি সেক্টরের যে উন্নয়ন বাজেট রয়েছে, সেখান থেকেই স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মাণ করা হবে।