বিদ্যুৎ-জ্বালানিতে ভুল পথে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চলমান সংকট থেকে সরকার শিক্ষা না নিয়ে এখনও ভুল পথে এগোচ্ছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর না

2023-06-23T04:40:00+00:00
2023-06-23T04:40:00+00:00
 
  শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬,
২৩ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
জাতীয়
বিদ্যুৎ-জ্বালানিতে ভুল পথে সরকার
সিপিডির সংলাপ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ জুন, ২০২৩, ৪:৪০ এএম 
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চলমান সংকট থেকে সরকার শিক্ষা না নিয়ে এখনও ভুল পথে এগোচ্ছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর না দিয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে।

এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শ মেনে এ খাতের সংকট সমাধান সম্ভব নয়। এতে শুধু ভর্তুকি সমন্বয়ের নামে ভোক্তার ওপর বাড়তি দাম চাপতে পারে। আইএমএফের পরামর্শের পাশাপাশি আরও অনেক সংস্কার করতে হবে।

বৃহস্পতিবার গুলশানের একটি হোটেলে ‘জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিষয়ক সমস্যা এবং প্রস্তাবিত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে করণীয়’ শীর্ষক সংলাপে এসব কথা উঠে আসে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়েছে। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন বন্ধ আছে। জ্বালানি আমদানি করা যাচ্ছে না। বিপুল পরিমাণ ঋণ করা হচ্ছে জ্বালানি খরচ মেটাতে। এর মধ্যে কয়লানির্ভরতা বাড়ছে। এতে আমদানি খরচ আরও বাড়বে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এখন ৪০ শতাংশ বাড়তি আছে। আরও বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে। এত বাড়তি সক্ষমতা দিয়ে কী করা হবে?

তিনি বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া (ক্যাপাসিটি চার্জ) বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) লোকসানের অন্যতম বড় কারণ। ২০২০-২১ অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়ায় পিডিবির খরচ হয়েছে ১৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা। পরের বছর (২০২১-২২) এটি প্রায় ৮২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এটি ২৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লে এটি বাড়তেই থাকবে। ২০২৫ সালে অতিরিক্ত সক্ষমতা ৪৬ শতাংশ হবে। তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া কমানোয় জোর দেওয়া উচিত।

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, শুল্ক ও কর বাবদ বিপিসি সরকারি কোষাগারে টাকা দিচ্ছে। আবার নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প নিচ্ছে। অথচ লোকসানের কথা বলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াচ্ছে। এসব হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা দরকার। দাম বাড়িয়ে বিপিসি মুনাফা করেছে। কিন্তু তা দিয়ে তো জ্বালানি তেল আমদানি করা যাচ্ছে না। আমদানির জন্য ডলার লাগবে। সামনে জ্বালানি তেলের দাম বিশ্ববাজারে বাড়তে পারে। উচ্চমূল্যে কত দিন জ্বালানি কেনা সম্ভব হবে? গ্যাসের ঘাটতি উত্তরোত্তর বাড়ছে। এলএনজি আমদানি করে ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তার মানে জ্বালানি আমদানি খরচের বড় অংশ যাবে এলএনজি খাতে।

তিনি বলেন, এবারের বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ ২৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। বাড়তি বরাদ্দের ৯৩ শতাংশ রাখা হয়েছে পাওয়ার জেনারেশনে। বাজেটে ৯৬টি প্রজেক্টের মধ্যে মাত্র ৫টি দেখতে পাচ্ছি নবায়নযোগ্য জ্বালানি। আগামীতে ২৩ হাজার মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ যোগ হতে যাচ্ছে বলে অর্থমন্ত্রী বলেছেন। বাড়তি এ বিদ্যুৎ নিয়ে কী করব, সেটাই দুশ্চিন্তার কারণ।

সিপিডির মতে, সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে মোটেই বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিচ্ছে না। বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে যে উদ্যোগ ও পরিকল্পনা করা দরকার তা হচ্ছে না। বিদ্যুৎ খাতে এলএনজির ওপর আরও নির্ভরতার কৌশল আমরা দেখতে পাচ্ছি। অথচ এ জায়গা থেকে সরে আসা দরকার। নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে এখনও এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। অথচ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যাপক বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। যে পথে সরকার যাচ্ছে, সেটি শুভকর নয়। লোডশেডিং চলমান থাকবে। জ্বালানি সেক্টরের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ আগামীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থা চলতে থাকলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে শ্বেতহস্তী (কাজে আসে না কিন্তু দামি) দেখব কি না, সেই আশঙ্কা রয়েছে। এখনই সে দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

বর্তমানে আইএমএফ-কেন্দ্রিক যে সংস্কার চলছে, সেই সংস্কার দিয়ে জ্বালানি খাতের সংস্কার সম্ভব হবে না। এর বাইরে অন্য দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও দেখতে হবে মনে করে সিপিডি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ক্যাবের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, এখন যে জ্বালানি সংকট, শিল্প কারখানায় জ্বালানি না দিতে পারার কারণে যে ইফেক্ট তৈরি হচ্ছে, কারখানায় উৎপাদন ঠিকমতো হচ্ছে না। এ ছাড়া বিদ্যুতের দাম বাড়ার কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে ও ব্যয় কমাতে কর্মচারী ছাঁটাই হচ্ছে। সংকট নিয়ে আমরা এর আগে যে কথাগুলো বহুদিন ধরে বলে আসছি, এখন সেগুলো পরিণতিতে পরিণত হচ্ছে।

তিনি বলেন, বড় বাজেট সরকার অনেক আনন্দ উৎসব করে পেশ করে, তারা যত বেশি আনন্দিত হয়, আর আমরা শঙ্কিত হই। এবারের বাজেটের অবস্থা দেখে আমার প্রথম মনে হচ্ছিল, সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা যখন বলছিলেন আমরা অনেক বড় বাজেট দিতে পেরেছি, এত বড় বাজেট দেওয়া একটা বিরাট সাহসের ব্যাপার। কিন্তু সেখানে ৭ শতাংশের বেশি জিডিপির প্রবৃদ্ধি, সেখানে মুদ্রাস্ফীতি ৬ শতাংশ, আমাদের ক্যাবের হিসাবে তা ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

শামসুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়বে, কারণ যারা বিক্রি করে বা রফতানি করে, সেই কৌশল তাদের জানা আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যদি দাম নাও বাড়ে, তারপরও তো আমাদের মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করার জন্য জ্বালানি বা বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে। তা হলে আমি এতবড় বাজেট দেখে কেন আতঙ্কিত হব না?

বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ আহমেদ বলেন, দেশে বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৭ হাজার মেগাওয়াট। বাজেটে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে তা ৬০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে। একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, মেগাওয়াট কিন্তু পাওয়ার। জ্বালানি ছাড়া মেগাওয়াট কিছুই উৎপাদন করতে পারবে না। সুতরাং জ্বালানি নিশ্চিত না করে মেগাওয়াট বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমাম বলেন, আমাদের এখন মূল সমস্যা হচ্ছে জ্বালানি সংকট ও গ্যাসের সংকট। এ সংকট সহসাই কেটে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, বরং সামনে তা আরও বাড়তে পারে। বর্তমানে জ্বালানি আমদানি করতে ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন হয়। ২০৩০ সাল নাগাদ সেই খরচ ২০ বিলিয়নে পৌঁছাবে। জ্বালানির এই চাহিদা কীভাবে মেটানো হবে? এখনও সময় ও সম্ভাবনা রয়েছে দেশীয় খাতে নজর দেওয়ার।

বক্তারা বলেন, শেভরনের অধীন বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র এবং সরকারের অধীন তিতাস গ্যাসক্ষেত্র একই মজুদ ও উৎপাদনক্ষম গ্যাসকূপ। অথচ বিবিয়ানা প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ এমএমসিএফ গ্যাস উত্তোলন করে। অন্যদিকে তিতাস উত্তোলন করে ৩০০ এমএমসিএফ গ্যাস। উৎপাদনের এই ব্যর্থতার কারণ হলো কারিগরি সমস্যা। এদিকেও নজর দিতে হবে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে দ্রুত বিদ্যুৎ দিতে পারায় শিল্পায়ন বেড়েছে। এখন ব্যবসায়ীদের কাছে পরিস্থিতি অন্ধকার, বিদ্যুৎ নেই। জ্বালানি আমদানিনির্ভর হয়ে গেছে। জ্বালানির প্রাপ্যতা মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। ডলার সংকটে ঠিকমতো ঋণপত্র খোলা যাচ্ছে না। নগদ টাকা দিয়ে ব্যবসায়ীরাও ঋণপত্র খুলতে পারছেন না।

Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: