নবী হোসেন (৪৬) মূলত রোহিঙ্গা সদস্য। বসবাস করেন মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকা মংডু জেলার ডেকুপুনিয়া উপজেলার চাকমাকাটা গ্রামে। তার বাবার নাম মো. মোস্তফা আহমেদ। নবী হোসেন সশস্ত্র সন্ত্রাসীগোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মির (আরসা) প্রাক্তন সদস্য এবং আরাকান রোহিঙ্গা আর্মির (এআরএ) প্রতিষ্ঠাতা। মিয়ানমারে ওই গ্রামে বাঙ্কারের ভেতর লুকিয়ে থাকলেও তিনি মূলত দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী এবং অস্ত্র-মাদক কারবারি। জনবল নিয়ে সবসময় থাকেন সশস্ত্র অবস্থায়। মিয়ানমার হয়ে টেকনাফ-উখিয়ায় অবৈধ মাদক এবং অস্ত্র ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কয়েকজন সদস্য। নবী হোসেনের সঙ্গে ওই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সরাসরি কানেশন রয়েছে।
আন্ডারওয়ার্ল্ডের সদস্য মহিউদ্দিন থাকেন আমেরিকায়। মিয়ানমারের অস্ত্র-মাদক পাচারকারীদের মধ্যে রয়েছে রোহিঙ্গা সদস্য পাপ্পু, আতিক, হোসেন, আমব্রু ও ইকবাল। তারা বসবাস করেন মিয়ানমারের মংডুতে। তারা হাজার কোটি টাকার মালিক বলে জানা গেছে। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ও অস্ত্র-মাদকের চোরাকারবারি আরও ৪ জন রয়েছেন সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও ইউরোপে। মূলত অস্ত্র-মাদক নিয়ন্ত্রণে অর্থের জোগানদাতা তারা। নবী হোসেনের মাধ্যমেই মিয়ানমার থেকে অস্ত্র-মাদকের চালান বাংলাদেশে পাচার হয়ে থাকে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, নবী হোসেন অবৈধ অস্ত্র-মাদক বিক্রির টাকা সরাসরি বিদেশে থাকা মাফিয়াদের কাছে পাচার করে থাকেন। আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাফিয়াদের মধ্যে একজন হলেন আমেরিকায় অবস্থান করা মহিউদ্দিন। নবী হোসেন গ্রুপের কয়েকজনকে গ্রেফতারের পর মহিউদ্দিনের নাম পেলেও তার পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা কিছুই পাওয়া যায়নি। এ ছাড়াও অস্ত্র ও মাদকের টাকা হুন্ডির মাধ্যমে মালয়েশিয়া, সৌদি আরব ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে পাচার করে থাকেন নবী হোসেন। এমন তথ্য রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে।
তবে স্থানীয় সূত্র জানায়, মিয়ানমার থেকে যেসব অস্ত্র ও মাদক আনা হয়, তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ গলিয়ে আসছে। এসব পাচারের ক্ষেত্রে সীমান্তে নিরাপত্তায় থানা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসাধু কর্মকর্তারাও জড়িত।
সম্প্রতি টেকনাফ ও উখিয়ায় সরেজমিন কয়েকজন রোহিঙ্গা মাঝির সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্থিরতার মূল কারণই হলো অস্ত্র এবং মাদক পাচার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে। এখানে কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত থাকলেও অস্ত্র-মাদক চোরাচালানের জন্যই মূলত অপহরণ, নির্যাতন এবং খুনোখুনি ঘটে।
রোহিঙ্গা মাঝিরা বলেন, উখিয়ার পালংখালী, আঞ্জুমান, রহমতের বিল, ধামনখালী এবং বালুখালি কাস্টমস পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করে সন্ত্রাসী নবী হোসেন। তিনি মিয়ানমারের জিরোপয়েন্ট ঘুমধুমে কংক্রিটের ব্যাংকার তৈরির ঘরে চৌকি বসিয়েছেন। নবী হোসেন ঘুমধুম থেকে হ্নীলা পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বর্ডার এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সেখান থেকে নবী হোসেন গ্রুপের সদস্যরা পালংখালী, কুতুবপুর, বালুখালী, থ্যাংকখালী, রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১ থেকে ১৮ নম্বর ক্যাম্প এলাকা দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৩০ লাখ পিস ইয়াবা এবং ২০ কেজি ক্রিস্টাল মেথ আইস প্রবেশের পাশাপাশি অস্ত্র চোরাচালান হয়ে থাকে। প্রায় ১২ হাজার রোহিঙ্গা সদস্য নবী হোসেনের হয়ে এই পাচার কাজে জড়িত।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, নবী হোসেনের আরেক সহযোগী রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী হ্নীলা থেকে টেকনাফ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী জাবু গ্রুপ। সম্প্রতি জাবুর ৯ লাখ পিস ইয়াবাসহ জাবু গ্রুপের ৩ জনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের পর তারা জানায়, এই রুট দিয়ে ৩০ লাখ পিস ইয়াবা এবং ২০ কেজি আইস পাচার হয়ে থাকে। প্রতি প্যাকেটে ১০ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট থাকে।
তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বলেন, জেলেরা যখন মাছ ধরতে যান তখন সঙ্গে ইয়াবা ও আইস নিয়ে আসেন।
গোয়েন্দা সূত্র আরও জানায়, মিয়ানমারের মংডুতে রয়েছে দুটি আইসের কারখানা। ওই কারখানা দুটিতে প্রতিদিন গড়ে ৩০ কেজি আইসের উৎপাদন হয়। এ ছাড়াও ওই এলাকা ইয়াবার কারখানায় সয়লাব। সেখান থেকে কৌশল পাল্টে ঢুকছে ইয়াবা। মিয়ানমারের বিজিপি ও আর্মিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কারখানাগুলো। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেই বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে পাচার করা হয় অস্ত্র-মাদক।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অস্ত্র ও মাদক পাচারে নবী হোসেন বাহিনীর রয়েছে ১২ হাজার রোহিঙ্গা সদস্য। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গড়ে প্রতিদিন আনুমানিক ৩০ লাখ পিস ইয়াবা এবং ২০ কেজি আইস দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে। মাদক ও অস্ত্র কেনাবেচায় নবী হোসেনের সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সদস্যদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকায় সেই অর্থ লেনদেন করা হয় হুন্ডির মাধ্যমে।
সম্প্রতি কক্সবাজার জেলার টেকনাফ ও উখিয়ায় সরেজমিন স্থানীয় সূত্র ও গোয়েন্দা সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। গোয়েন্দাদের করা আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাধ্যমে নবী হোসেনের মাদক পাচারে রোডম্যাপও সংগ্রহ করেছে সময়ের আলো।
ওই রোডম্যাপ অনুযায়ী সরেজমিন দেখা গেছে, টেকনাফের নাফ নদের শাখা কাঁটাতারে ঘেরা মাছের ঘের। দূর থেকে সেই ঘের প্রত্যক্ষ করে দেখা গেছে সেখানে কোনো মানুষের চলাচল নেই।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মাছের ঘের ঘিরে নবী হোসেনের রহস্য লুকিয়ে আছে। ঘেরের আশপাশের এলাকাজুড়ে অন্তত ৪০টি ল্যান্ড মাইন্ড পুঁতে রাখা হয়েছে। অপরিচিত কেউ সেখানে প্রবেশ করতে চাইলেই সেটি পর্যায়ক্রমে বিস্ফোরণ ঘটবে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নবী হোসেনের সিন্ডিকেটের সদস্যরা কেউ থাকে মিয়ানমারের মংডুতে। আবার কেউ থাকে বাংলাদেশের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা সদস্যদের ক্যাম্পে। মূলত মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প হয়েই মাদক পাচার হয়ে আসে। এমনটাই দাবি করে সাধারণ রোহিঙ্গারা। মাদক পাচার, অস্ত্র কেনাবেচা এবং অপহরণের অর্ধশত মামলার আসামি নবী হোসেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখে মোস্ট ওয়ান্টেড আসামি। কক্সবাজার ব্যাটেলিয়ন (৩৪ বিজিবি) রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নবী হোসেনকে ধরিয়ে দিতে পারলে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে নবী হোসেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নবী হোসেন মিয়ানমারের জিরো পয়েন্টে থাকে। উখিয়ার বালুখালী নয়াপাড়া এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। আর তার ভাই বুলুর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে টেকনাফের হোয়াইকং উলুবুনিয়া। মাদক ও অস্ত্র পাচারে নবী বাহিনীর ৪০০ সদস্যের খাবারের জোগান দেয় উলুবুনিয়া ও পালংখালী খাল দিয়ে পালংখালী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড বাবুল মেম্বারের নেতৃত্বে ১৫ থেকে ২০ জন। মাদকের ছোট-বড় চালান নিয়ে এসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৌঁছে দেয় তারা। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নবী হোসেনের ভায়রা থ্যাংখালী খাল দিয়ে খাবার পাচার করে এবং মাদকের ছোট-বড় চালান নিয়ে এসে রোহিঙ্গাদের কাছে পৌঁছে দেন। আঞ্জুমান পাড়ার কলিমুল্লার ছেলে মো. খায়ের ও তার ভাই তাহের গ্রুপের ২৫ থেকে ৩০ জন সবাই একই এলাকার বাসিন্দা। রতমাতার বিলের মো. কাউসার রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নবী হোসেনের সম্পর্কে ছোট বোনের জামাই। তাদের সঙ্গে রয়েছে জানে আলম, আবদুর রহিম, হাজির বাড়ির সারওয়ার। দামনখালিতে তাদের নেতৃত্ব দেয় মনির ও ফারুক। ঘুমধুম ইউনিয়নের নয়াপাড়া এলাকায় নবী হোসেনের মামা আবুল কাশেম এবং জয়নাল খাদ্য সংগ্রহ করে দেয় এবং মাদকের ছোট-বড় চালান নিয়ে আসে। তাদের গ্রুপে ১০-১২ জন কাঁটা পাহাড় খাল দিয়ে মাদক পাচার করে থাকে। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ১০ থেকে ১২টি করে মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
সাবেক ও বর্তমান রোড : নাফ নদের শাখা কাঁটা পাহাড় খাল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কাঁটাতারের বেড়ায় নয়াপাড়ার-রহমতের বিল। নদীর ওপারে মিয়ানমার সীমান্ত খালের পাশে কাঁটাতারের জিরোপয়েন্টে নবীর মাছের ঘের। ছোট ছোট খুপরিঘর। ওই ঘরগুলো দূর থেকে গোলপাতা ও জঙ্গলের কারণে দেখা যায় না। সেই ঘরেই নবী হোসেনের সশস্ত্র সন্ত্রাসী এবং মাদক পাচারকারী, অস্ত্র সরবরাহকারীদের বসবাস। ওপারে একাংশের পুরো এলাকা নবী হোসেনের নিয়ন্ত্রণে। তার সঙ্গে বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) সঙ্গে আঁতাত করেই মাদক ও অস্ত্র সরবরাহ করে বাংলাদেশে। নবী হোসেনের মাদক ও অস্ত্র পাচারের রোডম্যাপে দেখা যায় বাংলাদেশের টেকনাফের বালুখালী, নয়াপাড়া বিল ও রহমতের বিল এলাকা। মিয়ানমার থেকে এই রোডগুলোই ব্যবহার করা হয় মাদক ও অস্ত্র পাচারে।
ম্যাপে দেখা গেছে, মিয়ানমারের নাফ নদের শাখা (খাল) মংডু এবং বাংলাদেশে টেকনাফ ও উখিয়া প্রান্তে নয়াপাড়া, রহমতের বিল। মিয়ানমারের কাঁটাতারে মাছের ঘেরে রয়েছে নবী হোসেনের তিনটি স্পট। তার মধ্যে একটি হলো নবী হোসেনের সেন্ট্রাল পোর্ট।
অস্ত্র-মাদক পাচারে নতুন রোড : আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, মাদক কারবারিরা সবসময় কৌশল অবলম্বন করে থাকে। বর্তমানে নবী হোসেনের সদস্যরা জলপথে মিয়ানমার থেকে শিপইয়ার্ডে (মালবাহী জাহাজে) করে সরাসরি অবৈধ অস্ত্র ও মাদক পাচার করছে বরিশাল ও চাঁদপুরে। সেখান থেকে এসব ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীসহ সারা দেশে। এ ছাড়াও মিয়ানমারসংলগ্ন কাঁটাতারের বেড়া ভেদ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতর দিয়ে বান্দরবান এবং রাঙামাটির দুর্গম পাহাড় দিয়ে চট্টগ্রামে মাদক অস্ত্র ও মাদক পাচার করা হয় বলে তথ্য রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশের ভাষা হুবহু শিখে ফেলায় ঢাকায় অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের কাছে চলে যায় পাচার হওয়া অস্ত্র ও মাদক।
এ প্রসঙ্গে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সময়ের আলোকে বলেন, টেকনাফ ও উখিয়াকেন্দ্রিক রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি পাচারকারীদের অনেককে আমরা গ্রেফতার করেছি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের পর জানতে পারি পাচারকারীদের একটি বড় অংশ আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে জড়িত। ওই আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদাররা নবী হোসেনের মাধ্যমেই অবৈধ অস্ত্র, ইয়াবা ও আইস পাচারে নিয়ন্ত্রণ করছে। সম্প্রতি আইসের সবচেয়ে বড় চালান জব্দ করার পর অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। আন্ডারওয়ার্ল্ড সদস্যদের শনাক্ত এবং বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রকদের গ্রেফতারের চেষ্টা করছি।
সময়ের আলো/আরএস/