ই-কমার্সের আড়ালে সক্রিয় এমএলএম প্রতারক চক্র

রফিকুল ইসলাম সবুজ

প্রথম পাতা

মিথ্যা প্রলোভনে গ্রাহকদের প্রায় আড়াইশ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ১৪ আগস্ট রাজধানীর বাড্ডা থেকে গ্লোবাল গেইন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামের

2020-09-05T22:56:00+00:00
2020-09-04T23:57:31+00:00
 
  রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬,
৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
প্রথম পাতা
ই-কমার্সের আড়ালে সক্রিয় এমএলএম প্রতারক চক্র
রফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১০:৫৬ পিএম  আপডেট: ০৪.০৯.২০২০ ১১:৫৭ পিএম  (ভিজিট : ১৮০৯)
মিথ্যা প্রলোভনে গ্রাহকদের প্রায় আড়াইশ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ১৪ আগস্ট রাজধানীর বাড্ডা থেকে গ্লোবাল গেইন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামের একটি এমএলএম কোম্পানির আটজনকে আটক করেছিল র‌্যাব। সদস্য হওয়া ও প্রশিক্ষণের জন্য আড়াই হাজার টাকা করে নেওয়ার পাশাপাশি অধিক মুনাফার ফাঁদে ফেলে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করত প্রতিষ্ঠানটি। শুধু গ্লোবাল গেইন নয়, ই-কমার্সের আড়ালে ডেসটিনির মতো মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসার নামে রাজধানীতে সক্রিয় এ রকম একাধিক প্রতারক চক্র। প্রতারণা ও গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতের দায়ে ডেসটিনি বন্ধ হওয়ার পর এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িতরাই ই-কমার্সের নামে এমএলএম কোম্পানি খুলে প্রতারণা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, পল্টন, বিজয়নগর, কাকরাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় বড় পরিসরে অফিস নিয়ে রাতারাতি ধনী হওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করছে। তাদের প্রতারণার ফাঁদে পা দিলেই ধরিয়ে  দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন প্যাকেজের পণ্য। এসব প্যাকেজে আছে গৃহস্থালি পণ্য, ইলেকট্রনিক্স, প্রসাধন ও টয়লেট্রিজ পণ্য এবং হারবালসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য। এসব পণ্যের অযৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ই-কমার্সের আড়ালে ডেসটিনির মতো এমএলএম ব্যবসা পরিচালনার নামে প্রতারণার অভিযোগে এনেক্স ওয়ার্ল্ডওয়াইড লিমিটেড নামের একটি কোম্পানির চট্টগ্রামের সাত কর্মকর্তাকে গত বছর আটক করেছিল পুলিশ। কিন্তু এ কোম্পানিটি খোদ রাজধানীর কাকরাইলে মুসাফির টাওয়ারে অফিস খুলে এমএলএম ব্যবসা পরিচালনা করছে। এই প্রতিষ্ঠানটি প্রশিক্ষণের নামে তরুণ-তরুণীদের কাছ থেকে ৬-৮ হাজার টাকা নেয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রশিক্ষণের পর তাদেরকে নিয়ে নতুন নতুন প্রশিক্ষণার্থী সংগ্রহ করা হয়। এ ছাড়া উচ্চমূল্যে হারবাল জাতীয় বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করে। এ ছাড়া কারওয়ান বাজারে ‘ফরএভার লিভিং প্রোডাক্ট লি.’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান এমএলএমের আদলে ‘নেটওয়ার্ক মার্কেটিং’ ব্যবসা করছে। এই মার্কেটিংয়ে যুক্ত হতে কিনতে হবে ২৫ হাজার ৫০০ টাকার ‘কম্বো প্যাক’। এই প্যাকের পণ্য হচ্ছে ঘৃতকুমারী বা ‘অ্যালোভেরা’ দিয়ে তৈরি প্রসাধন সামগ্রী ও আয়ুর্বেদিক ওষুধ। এরপর নিচের সারিতে ক্রেতা যুক্ত হলে মিলবে পণ্য বিক্রির ওপর বিশেষ কমিশন। ধাপে ধাপে মিলবে বিভিন্ন পদ। লোভনীয় অফার দিয়ে অভিনব এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে ফরএভার লিভিং প্রোডাক্ট নামের একটি কোম্পানি। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের অফিস নিয়ে প্রসাধনী ও আয়ুর্বেদিক ওষুধ উচ্চ দামে সদস্যদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে কোম্পানিটি।
২০ হাজার বেকার যুবক ও তরুণকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি ও পণ্য বিক্রির মাধ্যমে টাকা উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় ৭০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে লাইফওয়ে বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি শুরুতে ঢাকায় প্রতারণার ব্যবসা করলে র‌্যাবের অভিযানে উত্তরার অফিস গুটিয়ে পালিয়ে যায়। পরে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে অফিস নিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এমএলএম কোম্পানি ‘ওএম বাজার’ দ্রুত কোটিপতি হওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দেশের প্রতিটি জেলা ও থানা পর্যায়ে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা মাইক্যাশের ডিলার নিয়োগের নামে প্রতারণা করছে।
ডেসটিনি গ্রুপ অনিয়ম-দুর্নীতি ও প্রতারণার মাধ্যমে এমএলএম পদ্ধতির ব্যবসার মাধ্যমে ২০০০ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সময়ে মানুষের কাছ থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রতারণা করে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গ্রাহকের অর্থে তারা নিজেদের নামে বাড়ি-গাড়ি করেছেন। শত কোটির বেশি টাকা পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিংয়ের দায়ে ডেসটিনির ৪৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ডেসটিনির প্রতারণা ধরা পড়ার পর সরকার এমএলএম ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে ২০১৩ সালের অক্টোবরে প্রণয়ন করে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কার্যক্রম (নিয়ন্ত্রণ) আইন। এ আইনের অধীনে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে করা হয় বিধিমালা, যা আবার সংশোধন করা হয় একই বছরের ২২ জুলাই। আইনে এমএলএম পদ্ধতিতে ব্যবসার জন্য লাইসেন্স নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। আর লাইসেন্স দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা করা হয় রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (রেজসকো)। এ আইন অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া এমএলএম ব্যবসা করা অপরাধ। আইনে বলা রয়েছে, পিরামিডসদৃশ বিপণন কার্যক্রম চালানো, সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ মোড়কজাত না করে পণ্য বিক্রি, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পণ্য বা সেবা বিক্রি না করা, পণ্য বা সেবার অযৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ, নিম্নমানের পণ্য বা সেবা বিক্রি করা এবং অসত্য, কাল্পনিক ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে কোনো এমএলএম কোম্পানির লাইসেন্স নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অবৈধভাবে দেশে শতাধিক এমএলএম কোম্পানি ব্যবসা করছে। তারা মূলত ই-কমার্সের নামে এমএলএম পদ্ধতিতে ব্যবসা করছে। কোনো কোনো কোম্পানি ফুড সাপ্লিমেন্ট, প্রসাধন সামগ্রী ও হারবাল ওষুধ বিপণনের নামে এমএলএম কার্যক্রম চালাচ্ছে। যদিও ওষুধ (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ ১৯৮২-তেও ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা আছে। অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো সদস্য বানাচ্ছে সহজ-সরল তরুণ-তরুণীদের। এর মাধ্যমে নিম্নমানের ইলেকট্রনিক সামগ্রী ৩-৪ গুণ বেশি দামে সদস্যদের ধরিয়ে দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কোম্পানি। সম্প্রতি ই-ভ্যালির বিভিন্ন প্রতারণা ও অনিয়মের অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও এমএলএম ব্যবসার বিরুদ্ধে সরব হয়।
কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ই-কমার্সের নামে বা এমএলএম কোম্পানির নামে প্রতরণা বন্ধে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে ভোক্তাকেও সতর্ক থাকতে হবে। জেনে-শুনে-বুঝে পণ্য বা সেবা ক্রয় করতে হবে। না বুঝে লোভে পড়ে অধিক লাভের জন্য প্রতারকদের খপ্পরে না পড়তে ভোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ই-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মের মধ্যে থেকে ব্যবসা পরিচালনা করুক এটাই চায় সরকার। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো নিয়ন্ত্রণে কাজ করা হচ্ছে। ই-কমার্সের নামে কেউ প্রতারণা করলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, অনিয়ম বন্ধ করতে যা যা করণীয় সরকার তা করবে যাতে কেউ অন্যায়ভাবে কোনো সুবিধা নিতে না পারে।



Loading...
Loading...
প্রথম পাতা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: