বিদায় ২০২০ : আলোড়নের শীর্ষ দশ

আলমগীর হোসেন

প্রথম পাতা

ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানোর পালা। বিদায় নিচ্ছে ২০২০ সাল। জীবন থেকে চলে যাচ্ছে আরও একটি বছর। তবে বিদায় নিলেও রেখে যাচ্ছে

2020-12-31T21:54:00+00:00
2020-12-30T23:25:29+00:00
 
  শনিবার, ৬ জুন ২০২৬,
২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
প্রথম পাতা
বিদায় ২০২০ : আলোড়নের শীর্ষ দশ
আলমগীর হোসেন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২০, ৯:৫৪ পিএম  আপডেট: ৩০.১২.২০২০ ১১:২৫ পিএম  (ভিজিট : ৫৪৪)
ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানোর পালা। বিদায় নিচ্ছে ২০২০ সাল। জীবন থেকে চলে যাচ্ছে আরও একটি বছর। তবে বিদায় নিলেও রেখে যাচ্ছে ঘটনাবহুল একটি বছরের বিভিন্ন আলোচিত বা চাঞ্চল্যকর ঘটনার স্মৃতিকথা। যার মধ্যে অনেক ঘটনায় দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় আলোড়নের। সীমানা পেরিয়ে আলোচিত হয় বিদেশেও। সেসব আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে শীর্ষ দশটি বিষয় বা ঘটনাকে সামনে এনে পাঠকদের আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রয়াস রেখেছে দৈনিক সময়ের আলো।
যেখানে স্থান পেয়েছে গোটা বিশ^কে স্থবির করে দেওয়া মহামারি করোনাভাইরাস, দেশের অগ্রযাত্রার নিদর্শন স্বপ্নের পদ্মা সেতু, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ঘোষিত ‘মুজিব বর্ষ’, কক্সবাজারে মেরিন ড্রাইভে চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ হত্যাকাণ্ড, সিলেটে পুলিশ ফাঁড়িতে যুবক রায়হানকে হত্যা, আলু ও কাঁচা মরিচের গগণচুম্বী দাম বৃদ্ধি, মহাপ্রতারক শাহেদ, ডা. সাবরিনা ও পাপিয়ার অপকর্ম, ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলনের মাঝে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর নিয়ে গণবিস্ফোরণ, অসহায় নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনসহ সিলেটে এমসি কলেজে গৃহবধূকে গণধর্ষণ ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারামুক্তি।
ঘটনাগুলো বিশ্লেষণে দেখা গেছেÑ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো করোনার ভয়াল থাবার শিকার হয়েছে বাংলাদেশও। যেখানে বহু মানুষের প্রাণহানি বা অসুস্থতার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য তথা অর্থনৈতিকভাবে বড় ধাক্কার শিকার হয়েছে বাংলাদেশসহ অধিকাংশ দেশ। যার রেশ চলছে এখনও। চলছে করোনা মোকাবিলার যুদ্ধ। তবে বৈশি^ক এই মহামারির মাঝেও বাংলাদেশে বিস্ময়কর কিছু উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এমনকি ব্যাংক খাতে রেমিট্যান্সের রিজার্ভও রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। যা বিশ^কে তাক লাগিয়েছে। উন্নয়ন দৃষ্টান্তের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সবগুলো স্প্যান স্থাপনের মাধ্যমে স্বপ্নের পদ্মা সেতু দৃশ্যমান হওয়ার বিষয়টি। তবে নৃশংস বা নিষ্ঠুরতার ঘটনাও ঘটেছে ২০২০ সালে। মাদক বাণিজ্যের খবর জেনে যাওয়ায় পুলিশের চেকপোস্টে পরিকল্পিত হত্যার শিকার হতে হয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহাকে। বছরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক শাহেদের মহাপ্রতারণা, মাস্ক ও করোনা পরীক্ষার নামে প্রতারণায় ডা. সাবরিনার কাণ্ড ও যুব মহিলী লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী পাপিয়ার পাপাচার। নোয়াখালীতে মাঝবয়সি নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। পাশাপাশি সিলেটে এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে কতিপয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মী দ্বারা গণধর্ষণের শিকার হন এক গৃহবধূ। এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে সময়ের দাবি অনুসারে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ হয় মৃত্যুদণ্ড। এ বছরের রাজনৈতিক ইস্যুগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারামুক্তি। তবে এই দশ বিষয়ের বাইরেও ২০২০ সালে আরও অনেক আলোচিত ঘটনা ছিল। তিন দফায় দেশে ভয়াবহ বন্যা, ধর্ম অবমাননার মিথ্যা তথ্য রটিয়ে লালমনিরহাটে যুবককে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যার পর লাশ আগুনে পোড়ানোর মতো নৃশংসতা ও বিনোদন জগতের একাধিক তারকার কৌশলে মানবপাচারসহ নানা ঘটনা আলোচিত হয়। এর মধ্যে সময়ের আলোর বিশ্লেষণে শীর্ষ দশ ঘটনা তুলে ধরা হচ্ছেÑ
মহামারি করোনাভাইরাস : ২০২০ সালের শুরুর দিকেই পৃথিবীজুড়ে মহাআতঙ্ক জারি করে করোনাভাইরাস। করোনা শনাক্ত শুরু হলে দেশব্যাপী ভয়াবহ আতঙ্ক দেখা দেয়। মৃত্যুশঙ্কায় মানুষ হয়ে পড়ে দিশেহারা। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দীর্ঘ লকডাউন দেওয়া হয়। ২৬ মার্চে প্রথম দেশজুড়ে লকডাউন ঘোষণা করে সরকার। দোকানপাট ও অফিস-আদালতসহ সব কিছু বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তাঘাট হয়ে পড়ে জনশূন্য। করোনা আতঙ্কে মানুষ মানুষকে এড়িয়ে চলতে থাকে। করোনায় মৃত ব্যক্তির লাশের সামনেও যাননি অনেক স্বজন। সাধারণ মানুষকে ঘর থেকে বের না হতে বারবার সতর্ক করতে থাকে স্বাস্থ্য অধিদফতর। করোনায় বিপর্যস্ত হয়েছে দেশের অর্থনীতি। করোনার সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে সাংবাদিকদের মধ্যে প্রথম প্রাণ হারান দৈনিক সময়ের আলোর চিফ রিপোর্টার হুমায়ুন কবির খোকন। এর কয়েকদিন পরই করোনায় মারা যান সময়ের আলোর সিনিয়র সহসম্পাদক মাহমুদুল হাকিম অপু, ভোরের কাগজের সিনিয়র রিপোর্টার আসলাম রহমানসহ বেশ কয়েকজন গণমাধ্যম কর্মী। একইভাবে করোনার সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে চিকিৎসক, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু কর্মকর্তা বা সদস্য মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে প্রাণ বিসর্জন দেন। করোনায় মারা যান সরকারের মন্ত্রী, কয়েকজন সংসদ সদস্য (এমপি) ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারাও। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এখন বিরাজ করছে। প্রতিদিনই মরছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ। আক্রান্তের হারও যথেষ্ট রয়েছে। তার মাঝে আবার করোনার নতুন ধরন নিয়েও উদ্বেগ বেড়েই চলেছে। দেশে সংক্রমণের শুরুর দিকে ধীরগতি থাকলেও গত মে মাসের মাঝামাঝি ভাইরাস দ্রুত ছড়াতে থাকে। গত জুনে করোনাভাইরাস তীব্র আকার ধারণ করে। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে সংক্রমণ কমতে শুরু করলেও নভেম্বরের শুরু থেকে আবার করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি দেখা দেয়।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, দেশে এখন পর্যন্ত (২৫ ডিসেম্বর) সরকারি হিসাবে করোনা শনাক্ত হয়েছে ৫ লাখ ৭ হাজার ২৬৫ জনের। মারা গেছে ৭ হাজার ৩৯৮ জন। সুস্থ হয়েছে ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৮০৩ জন। শনাক্তের হার ১৬ দশমিক ১১ শতাংশ। বিশ^ জরিপ সংস্থা ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্যানুযায়ী, করোনাতে মৃত্যুর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৩৩তম, যা দক্ষিণ এশিয়ায় তৃতীয়।
দৃশ্যমান স্বপ্নের পদ্মা সেতু : দেশের গৌরব স্বপ্নের পদ্মা সেতুর সর্বশেষ স্প্যানটি স্থাপন সম্পন্ন হয় ১০ ডিসেম্বর। সর্বশেষ স্প্যানটি বসানোর পর সেতুর পুরো ৬ দশমিক ১৫০ কিলোমিটার দৃশ্যমান হয়েছে। মুন্সীগঞ্জ ও শরিয়তপুর জেলার সেতুবন্ধনের মাধ্যমে সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে দক্ষিণের ২১ জেলার। বিজয়ের মাসে সেতুটির সর্বশেষ স্প্যানটি বসিয়ে পদ্মা জয় করা হয়। এ বিশাল কর্মযজ্ঞে দেশি-বিদেশি ২০ হাজার প্রকৌশলী-শ্রমিকের মেধা ও অক্লান্ত পরিশ্রম জড়িত। কাজ শুরুর দিকে নানা অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও পদ্মা সেতু এখন দৃশ্যমান হওয়ায় দক্ষিণের ২১ জেলাসহ সারা দেশেই আনন্দ-উচ্ছ্বাস বিরাজ করছে।
২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যান বসানো হয়। এরপর একে একে নানা বাধা পেরিয়ে ও নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ৩ বছর ২ মাস ১০ দিনে সেতুর সব স্প্যান বসানোর কাজ শেষ হয় ১০ ডিসেম্বর। সব স্প্যান বসাতে তিন বছর দুই মাসের বেশি সময় লাগলেও ২০২০ সালেই বসানো হয় ২১টি স্প্যান। সেতুর মোট ৪২টি পিলারে সর্বমোট স্প্যান বসানো হয় ৪১টি। তবে রোডওয়ে সø্যাব, রেলওয়ে সø্যাব ও সুপার-টি গার্ডার বসানোসহ এখনও সেতুর আনুসঙ্গিক আরও কিছু কাজ বাকি আছে। যদিও আগামী নতুন বছর তথা ২০২১ সালের শেষদিকে এসব কাজ শেষে স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আভাস দিয়েছেন সরকারের সংশ্লিষ্টরা।
অনাড়ম্বর মুজিব বর্ষ : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে শুরু হয়েছে ‘মুজিব বর্ষ’। এ উৎসব চলবে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত। ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ ও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের যৌথ সভায় মুজিব বর্ষ উদযাপনের ঘোষণা দেন। এরপর থেকেই সারা দেশে সাজ সাজ রব শুরু হয়। মুজিব বর্ষের উদ্বোধনী অনষ্ঠান ঘিরে বিশ^ নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। অনেক দেশেরই রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের ওই অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথাও জানা যায়। কিন্তু বৈশি^ক মহামারি করোনাভাইরাস সব কিছু যেন উল্টে দেয়। মহাধূমধামে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজন না হলেও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে মুজিব বর্ষ উপলক্ষে নানা আয়োজন পালন করে যাচ্ছে।
মেজর সিনহা হত্যা : ৩১ জুলাই রাতের ঘটনা। কক্সবাজারের টেকনাফে মেরিন ড্রাইভে শ্যামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নৃশংসভাবে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ। তিনি টেকনাফের মারিশবুনিয়া পাহাড়ে প্রামাণ্যচিত্র তৈরির কাজ শেষে মেরিন ড্রাইভ দিয়ে হিমছড়ির নীলিমা রিসোর্টে ফিরছিলেন। এ ঘটনায় টেকনাফের বরখাস্তকৃত ওসি প্রদীপ কুমার ও বাহারছড়া ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীর বিরুদ্ধে মেজর সিনহাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে সশস্ত্র বাহিনী থেকে শুরু করে সারা দেশে সাধারণ মানুষের মাঝেও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনার পর ৫ আগস্ট নিহত সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে টেকনাফ বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের তৎকালীন ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে প্রধান আসামি করে টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ৯ জন পুলিশ সদস্যকে আসামি করেন। আদালত মামলাটির তদন্ত করার আদেশ দেন র‌্যাবকে। ১৩ ডিসেম্বর র‍্যাব-১৫-এর সহকারী পুলিশ সুপার ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম মেজর সিনহা হত্যা মামলায় ওসি প্রদীপ ও পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ১৫ জন‌কে অ‌ভিযুক্ত ক‌রে চার্জশিট দা‌খিল করেন। এর ম‌ধ্যে ১৪ জন জেলহাজ‌তে আছেন। একজন আসামি পলাতক।
পুলিশ ফাঁড়িতে যুবক রায়হান হত্যা : দেশব্যাপী আলোচিত হওয়া আরেকটি হৃদয়বিদারক ঘটনা হচ্ছে সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে যুবক রায়হান আহমদ হত্যা। এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত বরখাস্তকৃত এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে ৯ নভেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ গ্রেফতার করে। ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পথে কানাইঘাটের ডোনা সীমান্ত থেকে জেলা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। দেশে এসআই আকবরকে গ্রেফতারের আদেশ জারি হওয়ার পর থেকে পালিয়ে বেড়ানো আকবর কৌশলে সিলেটের কানাইঘাটের ডোনা সীমান্ত পার হয়ে খাসিয়াদের মতো বেশভূষা ধরে সেখানে অবস্থান করছিলেন। তবে তাকে স্থানীয়রা সন্দেহ করে আটক করে। এরপর তার হাত-পা বেঁধে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। সেখান থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।
উল্লেখ্য, ১১ অক্টোবর অফিস থেকে বের হয়ে বন্দরবাজার এলাকায় যাওয়ার পর হুট করেই এএসআই আশেক এলাহীর খপ্পরে পড়েন রায়হান আহমদ নামে স্থানীয় এক যুবক। আশেক তাকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যান। সেখানে টাকার দাবিতে পুলিশের পৈশাচিক নির্যাতনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন রায়হান। পরিবারটি টাকা দিলেও অসুস্থ হয়ে মারা যান যুবক রায়হান। সিলেট মহানগর পুলিশের তদন্ত কমিটি ঘটনার সত্যতা পেয়ে বন্দর বাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবরসহ চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করে।
নারীকে বিবস্ত্র-ধর্ষণে ফুঁসে ওঠে দেশ : ২ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকের ঘটনা। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাসপুর ইউনিয়নের খালপাড় এলাকায় স্বামীকে পাশের কক্ষে বেঁধে রেখে মাঝবয়সি এক গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে ধর্ষণের চেষ্টাসহ বর্বরোচিত নির্যাতন চালায় একদল নরপশু। এ সময় গৃহবধূ বাধা দিলে তারা বিবস্ত্র করে বেধড়ক মারধর করে মোবাইলে ভিডিওচিত্র ধারণ করেন। সেটি তারা ছড়িয়ে দেয় ইন্টারনেটেও। এ ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ধর্ষকদের কঠোর শাস্তির দাবিতে পথে নামে লাখো মানুষ। এর মাঝে ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে এক গৃহবধূকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে সেখানকার ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় মহানগর পুলিশের শাহপরাণ থানায় গৃহবধূর স্বামী বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযুক্ত অধিকাংশ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে। ধর্ষণের প্রতিবাদ আন্দোলন আরও চড়াও হতে থাকে। দেশজুড়ে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনবিরোধী আন্দোলন এবং ধর্ষণকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবির প্রেক্ষাপটে সরকার আইনটি সংশোধনের পদক্ষেপ নেয়।
সংসদ অধিবেশন না থাকায় সংশোধিত আইন কার্যকর করতে ১৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ’ জারি করেন। পরে ৮ নভেম্বর নিয়ম অনুযায়ী অধ্যাদেশটি সংসদে তোলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। এক পর্যায়ে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ১৭ নভেম্বর জাতীয় সংসদে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল’ বিল পাস হয়েছে। এতে বিদ্যমান আইনের ‘ধর্ষিতা’ শব্দটির বদলে ‘ধর্ষণের শিকার’ শব্দ যুক্ত করা হয়েছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা বিলটি পাসের প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।
বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর, পক্ষে-বিপক্ষে আন্দোলন : ২০২০ সালের শেষদিকে এসে ভাস্কর্যের পক্ষে ও বিপক্ষে ব্যাপক আন্দোলন হয়। মূলত হেফাজতে ইসলামসহ ‘ধর্মভিত্তিক’ কিছু সংগঠন ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলনে নামলে এ নিয়ে উত্তাপ ছড়াতে শুরু করে। এক পর্যায়ে ৪ ডিসেম্বর গভীর রাতে কুষ্টিয়ায় নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙচুর করে স্থানীয় একটি মাদ্রাসার দুই শিক্ষার্থী। এ নিয়ে ভাস্কর্যবিরোধীদের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে সারা দেশ। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের প্রতিবাদে রাজপথে নামে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন সংগঠন। প্রতিবাদ ছড়িয়ে যায় দেশের বাইরেও। তার মাঝেই কুষ্টিয়াতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা বাঘা যতীনের ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তবে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনার পর সাধারণ মানুষ চরম ক্ষুব্ধ হয়। ধর্মকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করে ভাস্কর্য ইস্যুতে রাজনৈতিক ফায়দা লুটের অপচেষ্টারও অভিযোগ ওঠে।
মহাপ্রতারক সাহেদ-সাবরিনা ও পাপিয়া কাণ্ড : করোনা টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট প্রদান, অর্থ আত্মসাৎসহ প্রতারণার অভিযোগে রিজেন্ট গ্রুপ ও রিজেন্ট হাসপাতাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান সাহেদ করিম ওরফে মো. সাহেদকে গ্রেফতার করে র‍্যাব। ১৫ জুলাই সাতক্ষীরার সীমান্ত এলাকা থেকে মহাপ্রতারক শাহেদকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগেই ৬ জুলাই রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখায় অভিযান চালায় র‌্যাব। অভিযানে ভুয়া করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট, করোনা চিকিৎসার নামে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়সহ নানা অনিয়ম উঠে আসে। পরে রোগীদের সরিয়ে রিজেন্টের উত্তরা ও মিরপুর শাখা সিলগালা করে দেওয়া হয়। গ্রেফতার করা হয় আটজনকে। বিভিন্ন টকশোতে অংশ নেওয়া ও মন্ত্রী এমপিদের সঙ্গে ছবি তুলে আলোচিত হওয়া সাহেদের মহাপ্রতারণা জানাজানি হলে সারা দেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। তারই মাঝে করোনা পরীক্ষা নিয়ে জেকেজি হেলথ কেয়ারের প্রতারণার ঘটনা ফের আলোচনা সমালোচনার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। করোনা পরীক্ষার নামে ভয়ঙ্কর প্রতারণা করা জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান ও জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ‘স্টাইলিস্ট’ এই নারী চিকিৎসকের প্রতারণার কাহিনি জেনে হতভম্ভ হয় মানুষ।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় করোনার নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা না করেই প্রতিষ্ঠানটি ১৫ হাজার ৪৬০ টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট সরবরাহ করে। পুলিশ জানিয়েছে, জেকেজি হেলথ কেয়ার থেকে ২৭ হাজার রোগীকে করোনার টেস্টের রিপোর্ট দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১১ হাজার ৫৪০ জনের করোনার নমুনার আইইডিসিআরের মাধ্যমে সঠিক পরীক্ষা করানো হয়েছিল। বাকি ১৫ হাজার ৪৬০ রিপোর্ট কোনো ল্যাবে নয়, প্রতিষ্ঠানটির ল্যাপটপে ‘ভুয়াভাবে’ তৈরি করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেফতারকৃত সাবরিনার স্বামী আরিফ চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পুলিশকে জানান, জেকেজির ৭-৮ কর্মী ভুয়া রিপোর্ট তৈরির কাজে নিয়োজিত ছিল। পুলিশ জানান, জেকেজির মাঠকর্মীরা ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে করোনা উপসর্গ দেখা দেওয়া মানুষের নমুনা সংগ্রহ করতেন। প্রতি রিপোর্টে ৫-১০ হাজার টাকা নেওয়া হতো। আর বিদেশিদের কাছ থেকে নেন ১০০ ডলার। সেই হিসাবে করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্টে প্রায় ৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে জেকেজি।
এ ছাড়াও ২০২০ সালে অপরাধের সম্রাজ্ঞী হিসেবে আরেকটি আলোচিত নাম ছিল পাপিয়া। শামিমা নূর পাপিয়া নরসিংদীর যুব মহিলা লীগের নেত্রী। তার স্বামী মফিজুর রহমানও ছাত্রলীগের সাবেক নেতা। এই দম্পতিকে র‍্যাব ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আটক করে।
র‌্যাব ও পুলিশ জানায়, পাপিয়া ও তার স্বামী সংঘবদ্ধভাবে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা, মাদক ব্যবসা, চোরাচালান ব্যবসা, জাল নোটের ব্যবসা, চাঁদাবাজি, তদবির বাণিজ্য, জমি দখল ও উঠতি তরুণীদের দিয়ে দেহ ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপকর্মের মাধ্যমে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হন। ঢাকার পাঁচ তারকা হোটেলে নারীদের দিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতেন যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত এই নেত্রী। যার পেছনে অনেক ক্ষমতাশালীদের মদদ ছিল বলেও আলোচিত হয়।
খালেদা জিয়ার মুক্তি : ২৫ মার্চ সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২৫ মাস কারাগার থেকে মুক্তি পান। শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক দলের এই নেত্রীর কারাবন্দি নিয়ে নানা আন্দোলন কর্মসূচি পালন করে আসছিল দলটি। যদিও বিএনপির সেসব আন্দোলন প্রতিবাদ সরকারকে তেমন কোনো বেকায়দা পরিস্থিতিতেও ফেলতে পারেনি। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দেয় বলেও মন্তব্য করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কেননা খালেদা জিয়ার মুক্তির পর বিএনপির আন্দোলনমুখী কর্মকাণ্ড আরও চুপসে যায়।
গগণচুম্বী দাম ছিল আলু-মরিচের : সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরসহ কয়েকটি মাসে লাগামহীন ছিল আলু ও মরিচের দামে। মরিচের দাম ছিল আকাশছোঁয়া। যা গত বছরের পেঁয়াজের মতো এই বছরে মরিচের দাম রেকর্ড গড়ে। ঢাকার বাজারে ১ কেজি মরিচের দাম ছিল ২০০ টাকা। এ ছাড়া ১ কেজি আলুর দাম ছিল ৫০-৬০ টাকা। পাশাপাশি পেঁয়াজের দামও ছিল বেশ চড়া। দরিদ্র শ্রেণির মানুষদের জন্য আলু-মরিচ ও পেঁয়াজসহ কাঁচা তরকারির অস্বাভাবিক মূল্য সাধ্যের বাইরে চলে যায়। তিন দফায় বন্যাসহ নানা কারণ দেখিয়ে এসব পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়।

Loading...
Loading...
প্রথম পাতা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: