
ক্যালেন্ডারের পাতায় শেষ হয়ে এলো করোনাভাইরাসের বিষমাখা ২০২০ সাল। বিদায়ি এই বছরের শুরুতেই ইসির জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সম্পন্ন করা। এই দায়িত্ব সফলভাবে শেষ করতে পারলেও ইসিকে বছর শেষ করতে হচ্ছে অপবাদের ঝুড়ি মাথায় নিয়েই। একেবারে শেষ সময়ে এসে ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক বিভিন্ন ইস্যুতে প্রশ্নবিদ্ধ করেন নির্বাচন কমিশনকে (ইসি)।
যদিও এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন ইসি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এর জের আসছে বছরেও উত্তাপ ছড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বিশিষ্টজনদের দাবি করোনা মহামারির মধ্যেও বিভিন্ন সংসদীয় এলাকার উপনির্বাচনসহ নির্বাচন সর্বশেষ পৌরসভার প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা ইসির সক্ষমতারই স্মারক।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগরপিতা নির্বাচনে একযোগ ভোটগ্রহণ কার্যক্রম পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। টানা ২১ দিনের প্রচারণার পর ৩০ জানুয়ারি রাত ১২টায় শেষ হয় মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রচার সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম। ভোটগ্রহণ চলে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। সব কেন্দ্রেই ভোটগ্রহণ চলে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) মাধ্যমে। যা ছিল নগরবাসীর জন্য সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। তবে এই ধাপ অতিক্রম করে প্রায় সফলভাবেই ভোটগ্রহণ শেষে ঢাকা দক্ষিণের নগরপিতা হিসেবে মনোনীত হন ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস এবং উত্তর সিটিতে পুনঃনির্বাচিত হন আতিকুল ইসলাম।
এরপরই দেশজুড়ে শুরু হয় করোনা মহামারি। এ সময় বিভিন্ন সংসদীয় এলাকায় উপনির্বাচন পরিচালনা করা ছিল অনেকটা চ্যালেঞ্জের। তারপরও ১২ নভেম্বর ঢাকা-১৮ ও সিরাজগঞ্জ-১ আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত করে ইসি। স্বাস্থ্যবিধি মেনে দুটি আসনেই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে ভোট নেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সাহারা খাতুন ৯ জুলাই মারা যাওয়ার কারণে শূন্য হয়ে পড়ে ঢাকা-১৮ আসনটি। পরে ভোটের মাধ্যমে এই আসনে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হাবিব হাসান। একইভাবে সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাসিম ১৩ জুন মারা গেলে ওই আসন শূন্য হয়ে পড়ে। এ আসনে তার ছেলে তানভীর শাকিল জয় উপনির্বাচনে জয়লাভ করেন। এই ভোটগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করাও নির্বাচনের কমিশনের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সর্বশেষ সারা দেশে পৌরসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে মহামারি সময়কালের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নেয় সংস্থাটি। ২২ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন প্রথম ধাপে ২৫টি পৌরসভায় ২৮ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করার পাশাপাশি ভোটগ্রহণও পরিচালনা করে। পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৃণমূলে যে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে এ অবস্থায় এর ভোটগ্রহণের মতো সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন অনেকেই। কিন্তু বিতর্ক তৈরি হয় কমিশনের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে দেশের ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিকের অভিযোগের ভিত্তিতে।
নির্বাচন সংক্রান্ত গুরুতর অসদাচরণ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান দেশের ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক। তারা ১৪ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ তুলে ধরেন। সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তারা। এ বিষয়ে সরাসরি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলার সময় চেয়ে অনুরোধ করেন তারা। শুধু তাই নয়, একই ধরনের চিঠি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছেও পাঠানো হবে বলে উল্লেখ করেন তারা। ১৯ ডিসেম্বর এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনারদের বিশেষ বক্তা হিসেবে দুই কোটি টাকা গ্রহণ, নিয়োগের নামে চার কোটি আট লাখ টাকার দুর্নীতি, নিয়মবহির্ভূতভাবে তিনটি করে গাড়ি ব্যবহার এবং ইভিএম কেনায় অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়। আর একাদশ জাতীয় সংসদ, ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর, খুলনা, সিলেট রাজশাহী ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগও করেন তারা।
এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন যেভাবে আর্থিক অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছে, আগে কখনও দেখা য়ায়নি। তারা আগের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। নির্বাচন কমিশনের নাম অবমাননা ও কলঙ্কিত করেছে। রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেছি। একই সঙ্গে সরকারপ্রধানের কাছে যাব, প্রধানমন্ত্রীর কাছেও আবেদন করব। যতদিন সিদ্ধান্ত না হয় ততদিন সিইসি ও কমিশনারা স্বেচ্ছায় দায়িত্ব ছেড়ে দিতে পারেন, কেউ কেউ স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে পারেন বলে আমরা আশা করব। চিঠিতে সই করাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অবসরপ্রাপ্ত মহা হিসাবনিরীক্ষক এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান, অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলী খান, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, রাশেদা কে চৌধুরী। তবে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিশিষ্ট নাগরিকদের এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন, অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা।
২৪ ডিসেম্বর বিকালে নির্বাচন ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে তা অনভিপ্রেত। প্রশিক্ষণ ব্যয়ে আর্থিক অনিয়ম ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি কিংবা বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ ভিত্তিহীন। নির্বাচন প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতেই ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। ইভিএম কেনার সঙ্গে সরাসরি নির্বাচন কমিশন যুক্ত নয় উল্লেখ করে সিইসি বলেন, তাই বিবৃতিতে এ বিষয়ে যে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে তাও অসত্য। জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও নিজেদের কাজ ঠিকমতো করে যাচ্ছেন বলেই মনে করেন প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরতরা।