
খুলনা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রী মৌমিতা রায়কে +১৬২৪৭ নম্বর থেকে বিকাশ কাস্টমার কেয়ারের পরিচয়ে ফোনে কিছু তথ্য জানতে চাওয়া হয়। আপনার মোবাইলে একটি কোড নম্বর পাঠানো হয়েছে, এটি আমাদের বলুন। অন্যথায় আপনার বিকাশ অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে। অনলাইন ক্লাসে ব্যস্ত মৌমিতা কিছু বুঝে উঠতে পারেনি। তার মোবাইলে এসএমএস করে পাঠানো কোড নম্বরটি জানিয়ে দেয়। কয়েক মিনিটের মধ্যে মৌমিতার বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে দুটি নম্বরে ২৩ হাজার টাকা ক্যাশ আউট হয়। এর একটি এজেন্ট নম্বর আর অপরটি পার্সোনাল। বিকাশ প্রতারক চক্রের শিকার বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষার্থী মৌমিতা শুভাকাক্সক্ষীদের পরামর্শে সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।
সম্প্রতি খুলনার অবসরপ্রাপ্ত এক পুলিশ কর্মকর্তার অ্যাকাউন্ট থেকে বিকাশ প্রতারক চক্র ৫০ হাজার টাকা ক্যাশ আউট করে নিয়েছে। প্রতারকচক্র ওই পুলিশ কর্মকর্তাকেও বিকাশ কাস্টমার কেয়ারের পরিচয় দিয়ে ফোন করে। কিছু তথ্য জানতে চায়। সঠিক তথ্য না দিলে তার বিকাশ অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে বলে জানানো হয়। এই ঘটনার কিছু সময়ের মধ্যে অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা খোয়া যায় সাবেক ওই পুলিশ কর্মকর্তার। এ ব্যাপারে তার দায়ের করা মামলা খুলনা পিবিআই তদন্ত করছে।
খুলনার পিআইডি অফিসের টেলেক্স অপারেটর মো. মিজানুর রহমানকে বিকাশ কাস্টমার কেয়ারের পরিচয় দিয়ে ফোন করে বলা হয়, আপনার অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। এটি পুনরায় চালু করতে হলে কিছু তথ্য জানাতে হবে। বিষয়টি বুঝতে পারেন মিজানুর। তিনি কৌশলে প্রায় দুই ঘটনা বিকাশ প্রতারক চক্রকে ভুলভাল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করে পুরো ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেন। প্রতারক চক্র শিকার বানাতে পারেনি মো. মিজানুর রহমানকে।
মৌমিতা, পুলিশকর্তা বা পিআইডির মিজানুর রহমানই নন, প্রতিনিয়ত বিকাশ প্রতারক চক্রের শিকার হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। কখনও বিকাশ এজেন্ট আবার কখনও বিকাশ কাস্টমার কেয়ারের পরিচয়ে ফোন করে বিভ্রান্তের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। তারপর বিভিন্ন বিকাশ অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে নেওয়া হচ্ছে টাকা। শহর-গ্রাম-গঞ্জের মানুষ প্রতারক চক্রের ফাদে পড়ে টাকা খোয়াচ্ছে। তবে এদের মধ্যে হাতেগোনা দুয়েকজন আইনের আশ্রয় নিলেও সিংহভাগ মানুষ নিজের বোকামির দণ্ড মনে করে চুপ যাচ্ছেন। আর আইনের পথে হাঁটা ব্যক্তিরাও প্রতারক চক্রের হদিস বা টাকা ফেরত পাওয়ার তেমন কোনো আশা দেখছেন না।
খুলনা বিশ^বিদ্যালয়ের ভাস্কর্য ডিসিপ্লিনের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী মৌমিতা জানান, ‘আমার বিকাশে আগেই কিছু টাকা ছিল। এক আত্মীয় আমাকে আরও কিছু টাকা বিকাশ করেন একটি এজেন্ট নম্বর থেকে। সব মিলিয়ে আমার বিকাশে ২৩ হাজার টাকা ছিল। এই করোনাকালীন এ ধরনের বিপদ আমাকে আরও বিদপগ্রস্ত করে দিল। লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে আমি কিছু কাজ করি, আমার সার্বিক খরচ জোগাই। আমি বড় ধাক্কা খেলাম।’ মৌমিতার প্রশ্ন, আমার বিকাশে টাকা পাঠানো হয়েছে, এ খবর কীভাবে পেল হ্যাকাররা? তার ধারণা, বিকাশ এজেন্টদের কেউ কেউ প্রতারক চক্রের সঙ্গে জড়িত। এর প্রতিকার হওয়া উচিত।
খুলনার আহসান আহমেদ রোডস্থ এক বিকাশ এজেন্ট বিপু জানান, মোবাইল ফোন কোম্পানি, বিকাশের কর্মকর্তা, বিকাশ এজেন্টÑ অনেকেই প্রতারক চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তার মতে, প্রত্যেকটি কোম্পানির সিম রাস্তায় বিক্রি হয়। এখান থেকেই প্রতারণার হাতে খড়ি শুরু হয়। সিম বিক্রির সময় আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়। তখন কোনো কোনো বিক্রেতা কৌশলে ২-৩ বার ছাপ নিয়ে নেয়। পরে একটা সিম তাকে দিয়ে বাড়তি সিমগুলো বেশি দামে প্রতারক চক্রের কাছে বিক্রি করে। তিনি জানান, সিমগুলো বহু হাত ঘোরে যে কারণে প্রতারক চক্রের হদিস পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। তবে প্রতারণার ফাঁদ পেতে প্রতিনিয়ত হাতিয়ে নেওয়া হাজার হাজার টাকা প্রতারক চক্র শেষ পর্যন্ত তাদেরই কোনো না কোনো এজেন্ট থেকে তুলছে। তবে শেষ পর্যন্ত পৌঁছানো খুবই সময়সাপেক্ষ ও জটিল ব্যাপার বলে তিনি মনে করেন।
আইটি এক্সপার্ট সোহেল মাহামুদ জানান, বিকাশের প্রতারণা বেড়েছে। প্রতারক চক্র প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে বেশ এক্সপার্ট। সে কারণে বিকাশে ট্রানজেকশন করার জন্য হোল্ডিং পিরিয়ড থাকা উচিত। তা হলে প্রতারিত ব্যক্তি ট্রানজেকশনটি বাতিল করতে পারবে। তার মতে, বিকাশের কোনো কোনো এজেন্ট এই প্রতারক চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
খুলনা পিবিআই কর্মকর্তা পলাশ রায় জানান, অহরহ বিকাশ প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। প্রতারণার শিকার কিছুসংখ্যক লোক জিডি করেন। হাতেগোনা কিছু মানুষ মামলাও করেন। তবে মামলার তদন্তের শেষ হওয়া সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তিনি জানান, খুলনার বিভিন্ন এলাকায় অনেকেই বিকাশ প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ছেন। তার মতে, সচেতনতাই পারে প্রতারণার হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করতে।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, করোনাকালীন বিকাশ প্রতারণা বেশি হচ্ছে। প্রতারক চক্র বর্তমানে বেশ সক্রিয়। তার মতে, তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ করে মূল হোতাদের কাছে পৌঁছানো বেশ কঠিন। তারপরও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে অনেকটাই সহজ হয়েছে। তবে সতর্ক হতে হবে যাতে কোনো প্রতারণা না হয়।