প্রকাশ: রোববার, ৩ জানুয়ারি, ২০২১, ১০:৩৬ পিএম (ভিজিট : ৭৫৬)
আব্দুল্লাহ আল মাসউদ
মুসলমানের প্রতিটি সময় মূল্যবান। দুনিয়ার জীবনে মানুষের কর্তব্য হচ্ছে প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর হুকুম পালন করা। মৃত্যুর পর মানুষের প্রতিটি সময়, শ^াস-নিশ^াসের হিসাব নেওয়া হবে। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হাশরের ময়দানে মানুষ এক কদমও নড়াচড়া করতে পারবে নাÑ যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে তার জীবনকাল সম্পর্কে, সে তা কোন কাজে অতিবাহিত করেছে, তার জ্ঞান-বিবেক কোন কাজে ব্যয় করেছে, সম্পদ কীভাবে উপার্জন করেছে এবং কীভাবে খরচ করেছে এবং তার শরীর কোন কাজে ক্ষয় করেছে!’ (তিরমিজি : ২৪১৭)। এ জন্য প্রতিটি মুহূর্তই কাজে লাগানো কর্তব্য। প্রতিটি আমলই নিয়মিত করা, অল্প হোক তবু তাতে ধারাবাহিকতা রক্ষার সওয়াব ও ফজিলত অনেক বেশি।
অনেক মানুষ সপ্তাহে এক দিন মসজিদে আসেন, মাঝেমধ্যে দুয়েক ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, অনেকে এক রাতে বারো রাকাত তাহাজ্জুদ পড়ে তারপর অনেক খবর থাকে না; খণ্ড খণ্ড এসব ইবাদত ও আমলের সওয়াব তো অবশ্যই পরকালে সঞ্চিত হবে, কিন্তু আল্লাহ তায়ালার কাছে এর বিশেষ মূল্য নেই। এভাবে সপ্তাহে এক দিন নামাজ পড়ায় কোনো ফজিলত নেই। আবার এক দিনে কয়েক দিনের আমল করে গাফেল হয়ে যাওয়ার মধ্যেও ফজিলত নেই। এক দিন বারো রাকাত তাহাজ্জুদ পড়ে এক সাপ্তাহ ঘুমানোর মধ্যে ফজিলত নেই। বরং কম ইবাদত ধারাহিকভাবে আদায় করার মধ্যে হচ্ছে প্রকৃত ফজিলত। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘তোমরা সে নারীর মতো হয়ো না, যে তার পাকানো সুতো শক্ত করে পাকানোর পর টুকরো টুকরো করে ফেলে।’ (সুরা নাহল : ৯২)। অর্থাৎ কোনো একটি কাজ করে তা বিনষ্ট করে দেওয়া ঠিক নয়। এমনিভাবে কোনো নেক আমল শুরু করে তা পরিহার করাও অনুচিত। যে নেক আমলই শুরু করা হবে তা যেন ধরে রাখা হয়। ইবাদতটা যেন নিয়মতান্ত্রিক হয়। ধারাবাহিক হয়।
কোনো ইবাদত নিয়মতান্ত্রিকভাবে করার ফজিলত সম্পর্কে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেনÑ ‘শ্রেষ্ঠ নেক আমল সেটাই, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা সংখ্যায় অল্প হয়।’ (ইবনে মাজা : ৪২৪০)। অন্য এক সাহাবিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে আব্দুল্লাহ! তুমি অমুক ব্যক্তির মতো হয়ো না, যে রাতে নামাজ পড়ত, কিন্তু পরে রাতে নামাজ পড়া ছেড়ে দিয়েছে।’ (বুখারি : ২৫২)। রাসুল (সা.) আমলে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কখনও কখনও নফল নামাজেরও কাজা পড়েছেন।
সুন্নত নামাজও ছুটে গেলে দ্বিতীয়বার আদায় করেছেন। আম্মাজান আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনÑ ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) যদি অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে কোনো রাতে তাহাজ্জুদ আদায় করতে না পারতেন, তখন তিনি পরদিন বারো রাকাত নামাজ আদায় করে নিতেন।’ (মুসলিম সূত্রে রিয়াদুস সালেহিন : ১১৮১)। অথচ তাহাজ্জুদ ফরজ ছিল না। ওয়াজিবও ছিল না। তবু পরদিন তা কাজা করে নিতেন। শুধু আমলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে। নিয়মানুবর্তিতা
ধরে রাখতে।
নবীজি (সা.) নিজেই নিয়মিত আমলের প্রতি যত্নবান ছিলেন এমন নয়, সাহাবিদেরকেও উদ্বুদ্ধ করতেন, যেন তারা কোনো নফল ইবাদত ছুটে গেলে সেটা পরে আদায় করে নেন। হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনÑ ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রাতে তার জিকির পাঠ না করে ঘুমিয়েছে, অথবা আদায় করেছে তবে কিছু বাকি রয়েছে অতঃপর তা ফজর ও জোহরের মধ্যবর্তী সময়ে পড়ে নেয়, তার জন্য রাতে পাঠের সওয়াব দেওয়া হয়।’ (মুসলিম)। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনÑ নবীজি (সা.) এক দিন আমার কাছে এসে দেখেন, এক মহিলা আমার কাছে বসা।
তারপর নবীজি (সা.) বললেন, সে কে আয়েশা? আয়েশা (রা.) বললেন, ‘অমুক মহিলা, যে প্রচুর নামাজ পড়ে।’ তখন নবীজি (সা.) বললেন, ‘থামো! তোমরা সাধ্যমতো আমল করো। আল্লাহর কসম! আল্লাহ ক্লান্ত হন না, যতক্ষণ না তোমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ো। আর আল্লাহর কাছে ওই আমল বেশি প্রিয়, যা আমলকারী ধারাবাহিকভাবে করে যেতে থাকে।’ (বুখারি : ১১২২; মুসলিম : ৭৪১; নাসায়ি: ৭৬২)। হাদিসে ‘আল্লাহ ক্লান্ত হন না’Ñ এ কথার উদ্দেশ্য হচ্ছেÑ বান্দা যতক্ষণ আমল করতে থাকে আল্লাহও ততক্ষণ তার আমলনামায় সওয়াব দিতে থাকেন।
ধারাবাহিক কোনো আমল করার কারণে বান্দার মধ্যে যদি কখনও অবসাদ চলেও আসে, তবু আল্লাহ সওয়াব দিতে থাকেন। তাই বান্দার কর্তব্য হচ্ছে কোনো আমল একবারে খুব বেশি না করে অল্প অল্প করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে করা। সুতরাং আমল কম হোক; কিন্তু নিয়মিত যেন হয়, ধারাবাহিকতা যেন রক্ষিত হয়, তবেই আমাদের ইবাদত ও আমল আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় হবে। ইবাদতে স্বাদ আসবে। আমলে
তৃপ্তি আসবে। আল্লাহ সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন।