প্রকাশ: সোমবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ১০:১৫ পিএম (ভিজিট : ৩৪০১)
মুহাম্মদ মুনিরুল হাছান
কিছু মানুষ এমন রয়েছে যারা শারীরিকভাবে সুস্থ হলেও মানসিকভাবে অসুস্থ। তারা অন্যকে ঘৃণা করে, অন্যের উন্নতি ও সুখ সহ্য করতে পারে না। অন্যের ভালো অর্জন দেখলেই নিজেদের মধ্যে জ্বালা-যন্ত্রণা আরম্ভ হয়। এরাই হলো হিংসুক। হিংসার কারণে মানুষের শান্তি নষ্ট হয়। সামাজিক শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়। রাসুলে করিম (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের পূর্ববতী জাতিসমূহের মুণ্ডনকারী (ধ্বংসকারী) রোগ-ঘৃণা ও হিংসা তোমাদের দিকে হামাগুড়ি দিয়ে আসছে। আমি চুল মুণ্ডনের কথা বলছি না। বরং তা হলো দ্বীনের মুণ্ডনকারী।’ (তিরমিজি)
হিংসার একটি বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে বদনজর। এটা কোনো মুমিনের কাজ হতে পারে না। মানুষের মধ্যে হিংসা প্রবলতর হলে মানুষ অন্যের দিকে বদনজর করে। যা মানুষের জন্য মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাসুলে পাক (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর নির্ধারিত বিষয় ও ফয়সালার পর আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় বদনজরের কারণে।’ (সহিহুল
জামে : ৪০২২; সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহা : ৭৪৭)। হজরত জাবির বিন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিতÑ রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘মানুষের বদনজর একজন মানুষকে অসুস্থ করে কবর পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। আর উটকে নিয়ে যায় রান্নার পাত্রে।’ (সহিহুল
জামি : ১২৪৯)। অর্থাৎ মানুষ উটকে জবাই করতে বাধ্য হয়। ইসলামে মূল শিক্ষা হলো একে অন্যের কল্যাণ কামনা করা। কেননা ইসলাম হলো কল্যাণের ধর্ম। আর পরস্পর কল্যাণ কামনা করা হলো মুমিনেরই উজ্জ্বলতর বৈশিষ্ট্য। প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘পরস্পর কল্যাণ কামনাই হলো দ্বীন।’
বদনজর একটি রোগ। এর মূল অর্থ হলো কাউকে নিজের চোখ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত করা। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তির সফলতা বা সৌন্দর্য দেখার পর তার দিকে হাহাকার, হতাশা ও কদর্যতা দিয়ে কুদৃষ্টি দিলে তাকে বদনজর বলা হয়। যা থেকে নবী করিম (সা.) আমাদের বেঁচে থাকতে বলেছেন। হজরত আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, নবী করিম (সা.) আমাকে বদনজর থেকে বাঁচার জন্য ঝাড়ফুঁক করতে আদেশ করেছেন। হজরত আবু হুরায়ারা (রা.) থেকে বর্ণিতÑ প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, ‘বদনজর সত্য। তাই খারাপ মানুষের খারাপ দৃষ্টিকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।’
(মুসলিম : ৫৫৯৪; আবু দাউদ : ৩৮৭৯)
প্রিয় নবী (সা.) যখন ইসলামের প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব পালন করতে লাগলেন তখন মক্কার কাফির মুশরিকরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে তারা যখন কোরআন তেলাওয়াত শুনতে পেত তখন তাদের বুকের জ্বালা যন্ত্রণা আরও বেড়ে যেত। তারা প্রিয় নবীর দিকে বদনজরে বা তির্যক দৃষ্টিতে তাকাত।
ইমাম বগভী (রহ.) বর্ণনা করেন, মক্কার জনৈক ব্যক্তির কু-নজর ছিল। অর্থাৎ বদনজরের জন্য সে খুব প্রসিদ্ধ ছিল। এমনকি ওই ব্যক্তি উটের মতো জন্তু-জানোয়ারকে নজর দিলে সেটি তৎক্ষণাৎ মরে যেত। মক্কার কাফেররা নবীজি (সা.)-এর বিরুদ্ধে ওই লোকটিকে ডেকে আনল। সে সর্বশক্তি দিয়ে প্রিয় নবীকে (সা.) নজর লাগাতে চেষ্টা করল। কিন্তু সে ব্যর্থ হলো। আল্লাহ তায়ালা প্রিয় নবীকে হেফাজত করেন। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এবং অবশ্যই কাফিরদেরকে তো এমনি মনে হচ্ছে যেন তাদের কুদৃষ্টি নিক্ষেপ করে আপনার পতন ঘটাবে যখন তারা কোরআন শ্রবণ করে এবং বলে এটি বোধশক্তি থেকে অনেকদূরে। তা তো নয়, কিন্তু উপদেশ সমগ্র জাহানের জন্য।’ (সুরা কলম : ৫১-৫২)। এ আয়াতের তাফসিরে হজরত হাসান বসরী (রহ.) বলেন, ‘নজর লাগা ব্যক্তির শরীরে উপরোক্ত আয়াত দুটি তেলাওয়াত করে ফুঁক দিলে নজর লাগার অশুভ প্রতিক্রিয়া দূর হয়ে যাবে।’ (তাফসিরে মাযহারি)
বদনজর মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আক্রান্ত মানুষের জ্ঞান হারিয়ে যায়। এটি অত্যন্ত বাস্তব যে বদনজরের মাধ্যমে মানুষের রোগব্যাধি থেকে শুরু করে বিপদাপদের সম্মুখীন হতে পারে। নিম্নোক্ত হাদিসে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। হজরত সাহাল বিন হুনাইফ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল করিম (সা.) সাহাবায়ে কেরামদের সঙ্গে মক্কার উদ্দেশে বের হলেন। পথিমধ্যে জুহফা নামক স্থানে হাররা ঘাঁটিতে তারা অবতরণ করল। সেখানে সাহাল বিন হুনাইফ (রা.) গোসল করতে গেলেন। তিনি ছিলেন ধবধবে ফর্সা। তার চেহারা ও চামড়া ছিল দুধের মতো সাদা আলতায়। সেখানে আদি বিন কাব গোত্রের আমের বিন রবিআও গোসল করছিলেন। তিনি তার দিকে নজর দিয়ে বললেন, ইতঃপূর্বে আমি এত সুন্দর কাউকে দেখিনি। এমন লাবণ্যময় তকও দেখিনি। সঙ্গে সঙ্গে সাহাল (রা.) অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। অতঃপর প্রিয় নবীজির (সা.) কাছে নেওয়া হলো। বলা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি সাহালকে কিছু করবেন? আল্লাহর কসম তিনি মাথা তুলতে পারছেন না। রাসুল (সা.) বললেন, ‘তার ব্যাপারে কারও বিরুদ্ধে কি তোমাদের অভিযোগ করছ? তারা বললেন, আমের বিন রবিআহ তার দিকে তাকিয়েছিল। রাসুলে করিম (সা.) আমের বিন রবিআহকে ডাকলেন। তার ওপর রাগত স্বরে বললেন, তোমাদের কেউ কেন তার ভাইকে হত্যা করে? তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে তুমি কেন বরকতের দোয়া করলে না? অতঃপর তাকে বললেন, তুমি তার জন্য গোসল কর। সাহাবা (আমের বিন রবিআহ) তার চেহারা দুই হাত, দুই কনুই, দুই টাখনু, দুই পায়ের পাশর্^দেশ এবং লুঙ্গির ভেতরের অংশ একটি পাত্রে ধৌত করেন। অতঃপর ওই পানি সাহালের গায়ে ঢেলে দেওয়া হয়। এক ব্যক্তি পেছনের দিক থেকে পিঠে ও মাথায় ঢেলে দেন। অতঃপর পাত্রটি তার পেছনে রাখা হয় এবং অনুরূপ আবার করা হয়। এরপর সাহাল (রা.) লোকদের সঙ্গে চলতে সক্ষম হলেন। তার কোনো সমস্যা হলো না। (মুসনাদে আহমদ)
বদনজরের কুপ্রভাব থেকে বাঁচার জন্য প্রিয় নবী (সা.) আমাদেরকে কিছু আমল করতে বলেছেন এবং কিছু কিছু আমল তিনি নিজেও করেছেন। তবে সর্বপ্রথম করণীয় হলো আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে হিংসুকের হিংসা থেকে আশ্রয় চাওয়ার শিক্ষা দিয়ে বলেন, ‘হিংসুকের হিংসার অনিষ্ট থেকে (আল্লাহর কাছে পানাহ চাই) যখন সে হিংসা করে।’ (সুরা ফালাক : ৫)। হাদিসে রয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা বদনজর থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর, কেননা বদনজর সত্য।’ (ইবনে মাজা : ৩৫০৮)। আল্লাহর রাসুল (সা.) এভাবে দোয়া করতেনÑ ‘আউজু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন কুল্লি শাইতানিন ওয়া হাম্মাতিন ওয়া মিন কুল্লি আইনিল লাম্মাতিন’, অর্থাৎ, ‘আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমা দ্বারা প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং প্রত্যেক বদনজরের অনিষ্ট হতে পানাহ চাচ্ছি।’ (বুখারি : ৩১৩২)
ষ সহকারী শিক্ষক, ইসলাম শিক্ষা
চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল