
একের পর এক বেরিয়ে আসছে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর লুটপাটের কাহিনি। এ তালিকায় এবার সামনে এসেছে ধামাকা শপিং ডটকম। প্রতারণার মাধ্যমে ৩ লাখ গ্রাহকের ৭৫০ কোটি টাকা লুটে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ধামাকার মূল মালিক আগেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও বুধবার এর সিওও সিরাজুল ইসলামসহ আরও দুই কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। এর আগে ই-অরেঞ্জ, ইভ্যালির এমডি-চেয়ারম্যানকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক বা কর্মকর্তাদের গ্রেফতার করা হলেও প্রতারিত গ্রাহকরা তাদের টাকা ফেরত পাচ্ছেন না, এমনকি পণ্য ফেরত পাওয়ারও কোনো আশা দেখছেন না। বাধ্য হয়ে গ্রাহকরা এখন রাজপথে নেমেছেন আন্দোলনে, কিন্তু কোথাও কোনো আশার আলো দেখছেন না।
এদিকে গ্রাহক ঠকানো ও প্রতারণার অভিযোগে ইভ্যালি ডটকম লিমিটেড, ধামাকা শপিং, সিরাজগঞ্জ শপ ও গ্লিটার্স আরএসটি ওয়ার্ল্ডের সদস্যপদ স্থগিত করেছে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)। সংগঠনটির পরিচালক আসিফ আহনাফ সদস্যপদ স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো চটকদার অফার ও নানা রকম প্রলোভন দেখিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়েছে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। দেশে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা, আলেশা মার্ট। সম্প্রতি ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া মেহজাবিন, তার স্বামী মাসুকুর রহমানকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এই প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক বনানী থানার ওসি তদন্ত শেখ সোহেল রানা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় ভারতে গ্রেফতার হয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে গ্রাহকের ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ‘নিরাপদ ডটকম’ নামের একটি ই-কমার্স সাইটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকেও (সিইও) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শাহরিয়ার খান নামে ওই ব্যক্তি ই-কমার্স সাইট খুলে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সাধারণ গ্রাহকদের আকৃষ্ট করেন। ৫০ শতাংশ মূল্য ছাড়ে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ফ্রিজ, ওভেনসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্য ৩০ দিনের মধ্যে হোম ডেলিভারি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেন।
দেশে এখন সবচেয়ে আলোচিত নাম ইভ্যালি। প্রতিষ্ঠানটি ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ লোপাট করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে ক্রেতার কাছ থেকে অগ্রিম হিসেবে নিয়েছে ৩১১ কোটি টাকা, মার্চেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ইভ্যালির কাছে পাবে ২০৬ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির এমডি ও সিইও মোহাম্মদ রাসেল এবং তার স্ত্রী ও ইভ্যালির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে। প্রতারণার অভিযোগে শুক্রবার ওই দম্পতিকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দুজনেই এখন কারাগারে। ইভ্যালির লাখ লাখ গ্রাহক এখন টাকা ফেরত পেতে বা পণ্য পেতে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে।
সম্প্রতি সময়ে আরও যেসব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষের অর্থ লোপাট করেছে তার মধ্যে আছে- ধামাকা ৭৫০ কোটি টাকা, এসপিসি ওয়ার্ল্ড ১৫০ কোটি টাকা, সুমন প্রোডাক্ট ৫০ কোটি টাকা, চলন্তিকা ৩১ কোটি টাকা, নিউ নাভানা ৩০ কোটি টাকা, কিউ ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং ১৫ কোটি টাকা এবং নিরাপদ ডটকম ৮ কোটি টাকা। এভাবে একের পর ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার কারণেই মূলত ই-কমার্স খাত শুরুতেই মহাসঙ্কটে পড়েছে।
গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে বর্তমানে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা শপিং ছাড়াও কিউকম, এসপিসি ওয়ার্ল্ড, বুমবুম, আদিয়ান মার্ট, নিডস, দালাল, সিরাজগঞ্জ শপ, নিরাপদ ডটকম, আলাদিনের প্রদীপ, এসকে ট্রেডার্স ও মোটরস, ২৪ টিকেট ডটকম, গ্রিনবাংলা, এক্সিলেন্ট বিগবাজার, ফাল্গুনিশপসহ প্রায় ২৬টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দুদক, পুলিশ, র্যাব, সিআইডিসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন। তবে একের পর এক প্রতারণার ঘটনা সামনে এলেও হচ্ছে না প্রতিকার। বড় বড় প্রতিষ্ঠানের বাইরে দেশব্যাপী কাজ করছে এ রকম কয়েক হাজার ছোট প্রতিষ্ঠান। ফেসবুক, ইউটিউব ছাড়া নিজেদের অ্যাপস, ওয়েবসাইট খুলে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
ধামাকার ধামাকা প্রতারণা : প্রতিষ্ঠানটির নাম যেমন ধামাকা, গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণায়ও চরম ধামাকা দেখিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ধামাকা শপিং ডটকমের কোনো প্রকার অনুমোদন ও লাইসেন্স ছিল না। ছিল না প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট। ব্যবসা পরিচালনায় ইনভেরিয়েন্ট টেলিকম বাংলাদেশ লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে লেনদেন করা হতো। এ পর্যন্ত প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ধামাকা ডিজিটাল ২০২০ থেকে ধামাকা শপিং ডটকম নামে কার্যক্রম শুরু করে। বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে ওই অ্যাকাউন্টে রয়েছে মাত্র লাখখানেক টাকা। শুধু তাই নয়, বর্তমানে সেলার বকেয়া রয়েছে প্রায় ১৮০-১৯০ কোটি টাকা, গ্রাহকদের বকেয়া ১৫০ কোটি ও রিফান্ড চেক বকেয়া ৩৫-৪০ কোটি টাকা। বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য দেন র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান কারসাজির মাধ্যমে লাখ লাখ গ্রাহককে পণ্য ডেলিভারি না দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করে, যা দেশব্যাপী চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করে। এ ছাড়া বিভিন্ন আলোচনায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি উঠে এলে বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন।
এরই ধারাবাহিকতায় ২৩ সেপ্টেম্বর টঙ্গীর পশ্চিম থানায় এক ভুক্তভোগী ধামাকা শপিং ডটকমের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তাসহ (সিওও) ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।
র্যাব কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার প্রতিষ্ঠানটির সিওও মো. সিরাজুল ইসলাম রানা, মোবাইল ফ্যাশন ও লাইফ স্টাইল বিভাগের প্রধান মো. ইমতিয়াজ হোসেন সবুজ, ইলেকট্রনিক্স ক্যাটাগরির হেড মো. ইব্রাহীম স্বপনকে গ্রেফতার করা হয়।
র্যাবের গণমাধ্যম শাখার প্রধান বলেন, ধামাকার কোনো প্রকার অনুমোদন ও লাইসেন্স নেই। এ পর্যন্ত প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে তাদের। বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে তাদের অ্যাকাউন্টে মাত্র লাখখানেক টাকা রয়েছে। সেলার বকেয়া রয়েছে প্রায় ১৮০-১৯০ কোটি টাকা, কাস্টমার বকেয়া ১৫০ কোটি এবং কাস্টমার রিফান্ড চেক বকেয়া ৩৫-৪০ কোটি টাকা।
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতাকৃতরা জানিয়েছেন, আর্থিক সঙ্কটের কারণে কয়েক মাস ধরে প্রতিষ্ঠানের অফিস এবং ডিপো ভাড়া বকেয়া রয়েছে। পাশাপাশি চলতি বছরের জুন মাস থেকে বকেয়া রয়েছে কর্মচারীদের বেতন। চলতি বছরের গত এপ্রিল থেকে ধামাকা শপিং ডটকম অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কারণে জুলাই থেকে সব কার্যক্রম বন্ধ।
ধামাকা শপিংয়ের গ্রাহক সংখ্যা ৩ লক্ষাধিক। মোবাইল, টিভি, ফ্রিজ, বাইক, গৃহস্থালি পণ্য ও ফার্নিচার বিভিন্ন অফারে বিক্রি করা হতো। অফারগুলোর মধ্যে সিগনেচার কার্ড ২০-৩০ শতাংশ, ধামাকা নাইটে ৫০ শতাংশ, রেগুলারে ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হতো।
ভোক্তায় অভিযোগের পাহাড় : ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে অভিযোগের পাহাড় জমছে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরে। জানা গেছে, ২০১৮ সালের জুলাই থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত ১৯টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১৯ হাজার ৫২০টি অভিযোগ জমা পড়ে ভোক্তা অধিকার অধিদফতরে। প্রতিষ্ঠার তিন বছর না যেতেই ইভ্যালির বিরুদ্ধে জমা পড়ে ৫ হাজারের অধিক অভিযোগ। সম্প্রতি আলোচনায় আসার আগেই ই-অরেঞ্জের বিরুদ্ধে এখন সবচেয়ে বেশি অভিযোগ জমা পড়ছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এখন প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০টি করে অভিযোগ জমা পড়ছে।
এ ছাড়া ফাল্গুনি শপ, প্রিয় শপ, দারাজ, সহজ ডটকম, আজকের ডিলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ জমা পড়েছে ভোক্তা অধিকারে। বেশিরভাগ অভিযোগ নির্ধারিত সময়ের দুই-তিন মাস পরও পণ্য বুঝে না পাওয়া নিয়ে। এর বাইরে ‘চেক ডিজঅনার’ হওয়া, ‘রিফান্ডের’ টাকা ফেরত না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ইভ্যালি-ধামাকাসহ ৪ প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ স্থগিত : এদিকে প্রতারণা ও গ্রাহক ঠকানোর অভিযোগে ইভ্যালি-ধামাকাসহ চার প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ স্থগিত করেছে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)। সংগঠনটির পরিচালক আসিফ আহনাফ সদস্যপদ স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
ই-ক্যাবের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বুধবার এক সাধারণ বিজ্ঞপ্তিতে ই-ক্যাবের সদস্যভুক্ত চারটি অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- ইভ্যালি ডটকম লিমিটেড, ধামাকা শপিং (ইনভেরিয়েন্ট টেলিকম লিমিটেড), সিরাজগঞ্জ শপ ও গ্লিটার্স আরএসটি ওয়ার্ল্ড। গত ২৮ সেপ্টেম্বর ই-ক্যাবের কার্যনির্বাহী পরিষদের সভায় প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্যপদ স্থগিতের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে গত ১৮ আগস্ট আরও চার প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ স্থগিত করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে অভিযোগ ও নজরদারির ভিত্তিতে ই-ক্যাব বিভিন্ন অভিযোগে ৮টি প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ স্থগিত করেছে। গত ২৮ আগস্ট অভিযুক্ত অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ই-ক্যাব ১১ সদস্যের একটি কমপ্লায়েন্স অ্যাডভাইজারি কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্যপদ স্থগিতের সুপারিশ করে।
এসব প্রতিষ্ঠানকে ক্রেতা ও মার্চেন্টদের পাওনা পরিশোধ, নির্দেশিকা বাস্তবায়ন ও অন্যান্য অভিযোগ নিষ্পত্তি করে ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। অন্যথায় অভিযোগের বিশ্লেষণ ও পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্যপদ বাতিল করা হতে পারে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
/জেডও/