বাজেট সহায়তা হিসেবে ঋণ পেতে বাংলাদেশকে কঠিন এক শর্ত বেঁধে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। মুদ্রা বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংককে ঋণ খেলাপি হিসেবে ঘোষণা করতে নতুন এক শর্ত দিয়েছে সংস্থাটি। শর্তে বলা হয়েছে, ৩ মাস বা ৯০ কার্যদিবসের অধিক সময় ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করলে খেলাপি ঘোষণা করতে হবে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এ মুহূর্তে এই শর্ত মানা সম্ভব না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চপদের এক সূত্র মতে, বাংলাদেশকে ঋণ দিতে আলোচনা করছে আইএমএফ। সে লক্ষ্যে আবারো বাংলাদেশে এসেছে সংস্থাটির এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের মিশন প্রধান রাহুল আনান্দের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করে আইএমএফ। দেশে আসার আগেই তাদের কার্যক্রম এবং বৈঠকের সূচী সম্পর্কে জানিয়ে দেয় সংস্থাটি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংককে ঋণ খেলাপি ঘোষণার দীর্ঘসূত্রিতা থেকে বের হয়ে আসতে বলেছে আইএমএফ।
তবে এ মুহূর্তে বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলেই এমন কোনো নিয়ম করতে পারবে না বলে জানায় সূত্র। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উচ্চপদস্থ এই কর্মকর্তা সময়ের আলোকে বলেন, ‘চাইলেই তো আমরা কোনো ঘোষণা দিতে পারি না। আমাদের নিজস্ব একটি আইন রয়েছে। সেই আইনের মধ্যেই আমাদের চলতে হয়। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী খেলাপি ঘোষণার যে ক্লজ আছে তা দিয়েই আমরা পরিচালিত হচ্ছি। এখন কোনো ঘোষণা দিতে গেলে আমাদের আইন চেঞ্জ করতে হবে।’
ঋণ খেলাপি ঘোষণার বিষয়ে আইএমএফের চাপ দেওয়ার পক্ষে বিপক্ষে মতামত আছে অর্থনীতিবিদদের। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, ‘আইএমএফের শর্তের মধ্যে যেগুলো দেশের জন্য ভালো সেগুলো মেনে নেওয়া যায়। তবে, চাপ সৃষ্টি করে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দেওয়াই ভালো। বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নিজস্ব আইনে চলে। সে আইন চাইলেই তো বদলানো যায় না।’
এদিকে পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘বাংলাদেশে খেলাপির যে সংজ্ঞা তা আসলে কতটা যৌক্তিক তাও বুঝতে হবে। এত দীর্ঘ সময় ধরে খেলাপি হওয়ার যে ধারা চলছে তা পৃথিবীর আর কোথাও নেই সম্ভবত। এরমধ্যে রয়েছে নানান সুযোগ ও ফাঁকফোকর। ২ পার্সেন্ট, ৩ পার্সেন্ট দিয়ে আবার নিয়মিত করার এমন সুযোগ আর কোথাও নেই। সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এমন একটি সিদ্ধান্ত নেয় তবে খেলাপির হার বাড়বে কিন্তু ঋণগ্রহীতারা নতুনভাবে চিন্তা করবে।’
‘আইএমএফের সব শর্ত যে মানতে হবে তার তো কোনো মানে নেই। তবে, যেসব শর্ত বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে শক্ত করবে তা মানতে চিন্তা করার কারণ কি? এছাড়া ঋণ দেওয়ার জন্য আইএমএফ কিছু শর্ত সব দেশকেই দেয়। এদের দেওয়া শর্তগুলোও আমাদের জন্য ভালো হতে পারে’ বলে মনে করেন আইএমএফের সাবেক এ কর্মকর্তা।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে ঋণ ও আমানতের উপর সুদহার প্রত্যাহার করার বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ের অর্থনৈতিক অস্থিতিশীল পরিবেশ এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভালো ভূমিকা রাখবে সুদহার প্রত্যাহার করলে বলে বলা হয় ঐ প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতি হারের প্রবণতা এবং দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি বিবেচনা করে সামনের মাসগুলোতে মুদ্রানীতির উপর আরও কড়াকড়ি আরোপ করতে হতে পারে। এর সাথে বিদ্যমান সুদহারের যে সীমা আছে তা সরিয়ে দিতে হতে পারে। অথবা সীমা প্রত্যাহার না করে নীতিগত হার আরও বৃদ্ধি করা যেতে পারে।’
সম্প্রতি ‘ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট অফ ইন্টারেস্ট রেট ক্যাপস অ্যান্ড পটেনশিয়াল পলিসি অপশনস: বাংলাদেশ পারস্পেকটিভ’ শীর্ষক একটি সমীক্ষা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সমীক্ষায় ঋণের সুদহার তুলে নেওয়া এবং বাজারের উপর ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনীতির বাহ্যিক খাত থেকে প্রধানত ঋণ চাহিদা বৃদ্ধির কারণে চাহিদার সাথে যোগানের অমিল দেখা যাচ্ছে। এছাড়া আমানতের ধীরগতির কারণে ঋণযোগ্য তহবিলের সরবরাহ হ্রাস পাচ্ছে নিয়মিত।
সমীক্ষায় আরও বলা হয়, ‘আমদানি নিয়ন্ত্রণের জন্য ইতিমধ্যে অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তবে চলমান সরবরাহের সাথে চাহিদার অমিল কমানোর জন্য শুধুমাত্র বাজার ভিত্তিক ব্যবস্থাই একটি উপযুক্ত সমাধান হতে পারে।’
এদিকে দেশের বিদ্যমান আর্থিক নীতি কাঠামোর আধুনিকীকরণ ও বাজার কেন্দ্রীক করার জন্য সুদহারের সীমা প্রত্যাহার মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদে প্রয়োজন হবে বলেও বলা হয় সমীক্ষায়।
এফএইচ