একদিকে তৈরি পোশাক শিল্পের নতুন অর্ডার কমে গেছে ৩০ শতাংশের ওপরে। অন্যদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে চরম পর্যায়ে। আগের অর্ডারের পণ্য সময় মতো সরবরাহ করা যাচ্ছে না। অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান অর্ডার ক্যানসেল করছে। এ ধরনের বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে চলতে হচ্ছে শিল্প মালিকদের। এই অবস্থায় যদি আবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয় তাহলে সে চাপ নেওয়ার সক্ষমতা শিল্প মালিকদের নেই বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। এ জন্য কোনো অবস্থাতেই যেন খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য না বাড়ানো হয় সে দিকে নজর রাখার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই মুহূর্তে বিদ্যুতের দাম বাড়ালে পোশাক খাত গভীর সংকটে পড়বে। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রতিক্রিয়ায় গতকাল সোমবার এসব কথা জানান তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা। তারা বলেন, এমনিতেই নানা রকম সংকটের মধ্য দিয়ে চলতে হচ্ছে। শিল্প-কারখানাগুলোতে উৎপাদন কমে গেছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। এর মধ্যে যদি খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ে তাহলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে, উদ্যোক্তারা দেউলিয়া হয়ে পড়বেন।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সোমবার পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের প্রতি কিলোওয়াট পাঁচ টাকা ১৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ছয় টাকা ২০ পয়সা নতুন দর ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। অর্থাৎ প্রতি কিলোওয়াটে এক টাকা তিন পয়সা করে বেড়েছে। শতাংশের হিসাবে ১৯ দশমিক ২২ শতাংশ বেড়েছে। আগামী বিল মাস ডিসেম্বর থেকেই নতুন এই মূল্য কার্যকর হবে বলেও জানিয়েছে কমিশন।
চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি বিদ্যুতের পাইকারি দাম পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব জমা দেয় পিডিবি। এরপর ১৮ মে তাদের প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি করা হয়েছে। এরপর সবশেষ ১৩ অক্টোবর দাম না বাড়ানোর ঘোষণা দেয় কমিশন। তবে কমিশন সে সময় এই প্রস্তাবের বিপরীতে রিভিউ করার সুযোগ রেখে দেয় পিডিবির জন্য। আর সেই সুযোগ নিয়ে পিডিবি গত সপ্তাহে রিভিউ আপিল করে। এক সপ্তাহের যাচাইবাছাই শেষে গতকাল নতুন সিদ্ধান্ত জানানো হলো।
জানা গেছে, এই দাম পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভর্তুকি ধরা হয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ দাম বাড়ানোর পরও বিদ্যুতের উৎপাদন পর্যায়ে ভর্তুকি ১৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেবে সরকার। সর্বশেষ ২০২০ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারি আরেক দফা বাড়ানো হয় বিদ্যুতের দাম। পাইকারি, খুচরা ও সঞ্চালন-এই তিন পর্যায়ে তখন বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে (খুচরা) প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়িয়ে সাত টাকা ১৩ পয়সা করা হয়। যা আগে ছিল প্রতি ইউনিট ছয় টাকা ৭৭ পয়সা।
পাইকারিতে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট গড়ে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়িয়ে পাঁচ টাকা ১৭ পয়সা করা হয়। যা আগে ছিল প্রতি ইউনিট চার টাকা ৭৭ পয়সা। এ ছাড়া বিদ্যুৎ সঞ্চালন মূল্যহার বা হুইলিং চার্জ প্রতি ইউনিটে শূন্য দশমিক ২৭৮৭ টাকা থেকে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়িয়ে শূন্য দশমিক ২৯৩৪ টাকা করা হয়ে। ওই বছরের ১ মার্চ থেকে কার্যকর করে বিইআরসি।
বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট বেড়েছে। বাড়তি দামেও আমরা বিদ্যুৎ পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে জেনারেটর দিয়ে কারখানা চালাচ্ছি। ফলে উৎপাদন খরচে দিন দিন বাড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘এখন নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ালে আমাদের উৎপাদন খরচ বাড়বে। এতে বিশ^ বাজারের প্রতিযোগিতায় আমাদের টিকে থাকা কষ্টকর হবে। পাশাপাশি জিনিসপত্রের দাম হু হু করে আরও বাড়বে।’
জুলাই থেকে পোশাকের অর্ডার ও দাম কমছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ালে বিশ্ব বাজারে আমাদের বড় ধরনের সমস্যা হবে। আমরা অর্ডার হারাতে চাই না। ব্যবসার স্বার্থে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
পাওয়ার গ্রিড, তিতাস বিদ্যুৎ ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিগুলোকে অবৈধ লাইন কেটে দেওয়ার পাশাপাশি মিটারের কারসাজি বন্ধ করার আহ্বান জানান বিজিএমইএ সভাপতি। তাতে সরকারের অনেক বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে এবং অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যুক্ত হবে বলে মনে করেন তিনি।
বিজিএমইএর সহ-সভাপতি ও ক্লাসিক ফ্যাশন কনসেপ্টের এমডি শহীদউল্লাহ আজিম বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম পাইকারিতে বাড়লে এর প্রভাব আলটিমেটলি আমাদের ওপরই পড়বে। সে ক্ষেত্রে এখন না হোক, কিছুদিন পরে এটা আমাদের ওপরই আসবে।’ তিনি বলেন, ‘আপাতত খুচরা পর্যায়ে না বাড়ালেও প্রতিষ্ঠানগুলোতে দেখবেন বিদুৎ বিল বাড়িয়ে দেখাবে। বিভিন্ন চার্জ যুক্ত করবে। প্রভাবটা আমাদের ওপরই পড়বে।’
পোশাক মালিকদের আরেক সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম এক টাকা তিন পয়সা বাড়ানো হয়েছে। খুচরা পর্যায়ে না বাড়ালেও বাজারে এর প্রভাব পড়বে। তাই সরকারকে অনুরোধ করব খুচরা পর্যায়ে যাতে না বাড়ানো হয়।’
তিনি বলেন, ‘যদি খুচরা পর্যায়ে আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। তবে উৎপাদন খরচ বাড়বে। তাতে বর্তমানে কারখানাগুলো যে বিদ্যুৎ বিল দিচ্ছে, আগামীতে এটাও দিতে পারবে না। কারণ এমনিতেই বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্য সংকটে রয়েছি।’