১৬৯টি দেশের ৩৪ হাজার ৮০ জন নাগরিক অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন, যাদের পাসপোর্ট ও ভিসার মেয়াদ অনেক আগেই উত্তীর্ণ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভারতের ১৬ হাজার ৬৮৩ জন এবং চীনের ৫ হাজার ২১০ জন নাগরিক অবৈধভাবে অবস্থান করছেন। আর পাকিস্তানের রয়েছে ৭৭৫ জন। উন্নত রাষ্ট্র কানাডা, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, রাশিয়া ও থাইল্যান্ডের নাগরিকরাও অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছে বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ।
এই অবৈধ বিদেশিদের অনেকেই মাদক ব্যবসা, উপহারের নামে প্রতারণা, হেরোইন, ব্যাংকের এটিএম বুথের জালিয়াতি, বিভিন্ন দেশের জাল মুদ্রার কারবার, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা, স্বর্ণ চোরাচালান, অনলাইনে ক্যাসিনো এবং মানব পাচারসহ সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রে জড়িত। আবার কেউ কেউ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন এবং কর ফাঁকি দিয়ে উপার্জিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে নিজের দেশে পাচার করে নিয়ে যাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তথ্য অধিকার আইনের আলোকে পাওয়া ‘সুরক্ষা সেবা বিভাগের’ তথ্য অনুযায়ী গত ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করা বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ৭৮ হাজার ২৭৬ জন। এর মধ্যে বৈধভাবে অবস্থান করছেন ১৭৮ দেশের ৪৪ হাজার ১৯৬ জন।
ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে অবস্থান করছেন ১৬৯টি দেশের ৩৪ হাজার ৮০ জন। ভারতের ২৯ হাজার ৩০৭ জন নাগরিকের মধ্যে বৈধ মাত্র ১২ হাজার ৬২৪ জন। অর্থাৎ বৈধভাবে অবস্থান নেওয়ার চেয়ে অবৈধ ভারতীয় নাগরিক রয়েছে বেশি। চীনের ৭ হাজার ২৮০ জনের মধ্যে অবৈধ ৫ হাজার ২১০ জন, দক্ষিণ কোরিয়ার ২ হাজার ১৮৬ জনের মধ্যে অবৈধ ১ হাজার ২১৫ জন, যুক্তরাজ্যের ৪ হাজার ৬০০ জনের মধ্যে অবৈধ ৫৯১ জন, আমেরিকার ৮ হাজার ৮২৯ জনের মধ্যে অবৈধ ১ হাজার ৪৮৪ জন, অস্ট্রেলিয়ার ১ হাজার ৪৭১ জনের মধ্যে অবৈধ ২৯৬ জন, কানাডার ৩ হাজার ৭৭ জনের মধ্যে অবৈধ ৪২৫ জন, বেলারুশের ৪০২ জনের মধ্যে অবৈধ ৯৪ জন, জাপানের ১ হাজার ২১৬ জনের মধ্যে অবৈধ ২৮১ জন, ফ্রান্সের ৩৭৩ জনের মধ্যে অবৈধ ১০৮ জন, মালয়েশিয়ার ৪৩৮ জনের মধ্যে অবৈধ ১৭৮ জন, নেপালের ২ হাজার ৮১১ জনের মধ্যে অবৈধ ১ হাজার ৫৩ জন ও জার্মানির ৪৬৩ জনের মধ্যে অবৈধভাবে অবস্থান করছেন ১৩৪ জন নাগরিক।
শ্রীলঙ্কার ১ হাজার ৯৪০ জনের মধ্যে অবৈধ ৮৭১ জন, সোমালিয়ার ১৪৪ জনের মধ্যে অবৈধ ১২৩ জন, স্পেনের ২৫৮ জনের মধ্যে অবৈধ ৮৫ জন, দক্ষিণ আফ্রিকার ১৬৫ জনের মধ্যে অবৈধ ৪৫ জন, তুরস্কের ২৫০ জনের মধ্যে অবৈধ ১২২ জন, সিরিয়ার ১১৯ জনের মধ্যে অবৈধ ১১৭ জন, ইউক্রেনের ২৪২ জনের মধ্যে অবৈধ ১৩৮ জন এবং থাইল্যান্ডের ৫৯৬ জনের মধ্যে ২৭৪ জন অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছে।
এ ছাড়া অবৈধভাবে অবস্থান করা বিদেশিদের মধ্যে আফগানিস্তানের ৩৫ জন, ভুটানের ৯৯, ব্রাজিলের ১৯, চাদের ২, ক্যামেরুনের ২৪, ক্রোয়েশিয়ার ২৩, ডেনমার্কের ৩২, মিসরের ৬৭, হল্যান্ডের ১০, ইতালির ২২৯, জর্ডানের ২৫, কেনিয়ার ৪১, লেবাননের ৮, লিবিয়ার ৯, মালদ্বীপের ২২, মেক্সিকোর ৬, মঙ্গোলিয়ার ৯ জন, মরক্কোর ১৯, মিয়ানমারের ৭০, নাইজেরিয়ার ৮৮, নরওয়ের ১৩, ফিলিস্তিনের ৬০, ফিলিপাইনের ৫১৯, পোল্যান্ডের ১৪, পর্তুগালের ১৩, সৌদি আরবের ২০, সিঙ্গাপুরের ৩১, সুদানের ৩৮, তাইওয়ানের ৫৮, উগান্ডার ১৯, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৩, জিম্বাবুয়ের ৮, জাম্বিয়ার ৯, ভিয়েতনামের ২৮, ভানুয়াতু রিপাবলিকের ৩ এবং উজবেকিস্তানের ১১ জন নাগরিক ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছে বলে জানিয়েছে সুরক্ষা সেবা বিভাগ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এদের কেউ ভ্রমণ ভিসায়, কেউ ব্যবসায়িক ভিসায়, কেউবা ‘অন অ্যারাইভাল’ ভিসায় এ দেশে এসে অবৈধভাবে রয়ে গেছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৯ বছর ধরে আছেন মিসরের কয়েকজন নাগরিক।
সুরক্ষা সেবা বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দুই বছর আগেও দেশে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকদের সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ৭৯০ জন। সংশ্লিষ্টরা জানান, সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বিদেশি কর্মী কাজ করেন দেশের পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে। এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র, আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা, হোটেল ও রেস্তোরাঁয় অনেক বিদেশি কর্মরত। কাজের অনুমতি না থাকলেও বিজনেস ভিসায় এসে অনেকে বেআইনিভাবে দেশের বিভিন্ন কোম্পানিতে চাকরি নেন। এ ধরনের ভিসায় সবচেয়ে বেশি আসেন চীনের নাগরিকরা। বিভিন্ন প্রকল্প এবং চীনা নাগরিকদের বিনিয়োগ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তারা কাজ করেন। এ ছাড়া ভারতের অনেকে ভ্রমণ ভিসায় এসেও এখানে নানা কাজ বা চাকরিতে যুক্ত হন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনেকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে কাজ করে টাকা নিয়ে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশের ভিসা নীতিমালা অনুযায়ী ইউরোপের সব দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, মিসর, ব্রুনাই ও তুরস্ক ছাড়াও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৩টি দেশের নাগরিকরা অন অ্যারাইভাল ভিসা পেয়ে থাকেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এই অন অ্যারাইভাল ভিসা পাওয়া অধিকাংশ দেশেরই কোনো না কোনো নাগরিক অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দক্ষিণ কোরিয়ার, বর্তমানে যার সংখ্যা ১ হাজার ২১৫ জন।
অবৈধভাবে অবস্থানকারী বিদেশিদের গ্রেফতার ও নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে কিছু সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে সুরক্ষা সেবা বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিদেশিদের আটক রাখার মতো কোনো ডিটেনশন সেন্টার নেই। তাদের কারাগারে রাখতে হলে মামলা দিতে হয়। সেটা সময় ও অর্থসাপেক্ষ হওয়ায় অনেক সময় বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়। তা ছাড়া আটক অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের কাছে পাসপোর্ট থাকে না। অনেক সময় তারা ইচ্ছা করে পাসপোর্ট গোপন করেন বা ফেলে দেন। এ অবস্থায় এই বিদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর আগে নাগরিকত্ব নির্ধারণের প্রয়োজন হয়, যা সময়সাপেক্ষ। আবার অনেক দেশের দূতাবাস ঢাকায় নেই। এমন দেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব যাচাই করা আরও বেশি জটিল। অন্যদিকে অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করলে তারা মামলার অজুহাতেও এ দেশে থেকে যান।
অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু)’ নির্বাহী পরিচালক সিআর আবরার সময়ের আলোকে বলেন, অবৈধভাবে কোনো বিদেশি বাংলাদেশে অবস্থান করলে এবং অপরাধের সঙ্গে জড়িত হলে অবশ্যই বিদ্যমান আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবে এসব অবৈধ বিদেশি যেসব সেক্টরে কাজ করছে সেসব সেক্টরে আমাদের নিজস্ব দক্ষ লোকের অভাব থাকলে সে ক্ষেত্রে আমাদের দক্ষ জনবল তৈরি করার দিকে নজর দিতে হবে।
তিনি বলেন, দেশে বৈধভাবে যেসব বিদেশি কাজ করছেন, তারাও সঠিক ভিসায় অবস্থান করছেন কি না সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে দেশ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ভারতে রেমিট্যান্স পাঠানো দেশগুলোর প্রথম পাঁচটির মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে। সে অনুযায়ী বৈধ ও অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত ভারতীয়দের সংখ্যার সামঞ্জস্য আছে কি না এবং তারা যে কর দিচ্ছেন সেটা ঠিক আছে কি না তা খতিয়ে দেখা উচিত। একই পদক্ষেপ অন্যান্য দেশের অবৈধ নাগরিকদের ক্ষেত্রেও নিতে হবে।
সুরক্ষা সেবা বিভাগের কাছে তথ্য অধিকার আইনের আলোকে জানতে চাওয়া হয়েছিল এই অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
জবাবে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সুরক্ষা সেবা বিভাগের উপসচিব ও দায়িত্ব প্রাপ্ত তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবদুর রউফ মিয়া জানান, অবৈধ বিদেশিদের শনাক্ত করে নিজ নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া অবৈধ বিদেশিদের অপরাধের ধরন ও মাত্রা অনুযায়ী তাদের স্টপ লিস্ট ও ব্ল্যাক লিস্ট করা, অবৈধদের শনাক্ত করে আইন ও বিধি অনুযায়ী জরিমানা আদায় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যথাযত ব্যবস্থা গ্রহণ করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। যেসব অবৈধ বিদেশি বিভিন্ন কাজ ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থেকে অর্থ উপার্জন করে তাদের উপার্জনকে করের আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
সুরক্ষা সেবা বিভাগ সূত্র জানায়, কয়েক মাস আগে ১২টি দেশের ৭৬ জন নাগরিককে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়। এর মধ্যে চীনের ৩৯ জন, সোমালিয়ার ১৩ জন, ভারতের ১০ জন, নাইজেরিয়ার চারজন, ফিলিপাইনের দুজন, ক্যামেরুনের দুজন, মালয়েশিয়ার একজন, জার্মানির একজন, ইয়েমেনের একজন, লিথুয়ানিয়ার একজন ও তুরস্কের একজন নাগরিক রয়েছেন।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, অবৈধ বিদেশিদের মধ্যে আফ্রিকার নাগরিকরা বেশি বেপরোয়া। তারাই বেশি প্রতারণা করছে। ইতিমধ্যে একাধিক বিদেশি অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। ভিসা ছাড়া কোনো বিদেশিকে বাংলাদেশে থাকতে দেওয়া হবে না। ইতিমধ্যে পুলিশকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেসব বিদেশি নাগরিক ভিসা ছাড়া বাংলাদেশে অবস্থান করছে তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। বিভিন্ন দেশের দূতাবাস বেশ কয়েকজন নাগরিককে ফেরত নিয়েছে। অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।