ভাষা আন্দোলনের ঘটনাচিত্র সংবলিত সংবাদপত্র প্রায় দুষ্প্রাপ্য। এমনিতে সে সময় সংবাদপত্রের সংখ্যা ছিল একেবারে কম। শুধু একটি মাত্র ইংরেজি দৈনিক ‘পাকিস্তান অবজারভার’। কিন্তু আন্দোলন শুরু হওয়ার কিছু দিন আগে সরকারি রোষে বন্ধ হয়ে যায়। যেসব গুরত্বপূর্ণ দৈনিক বা সাপ্তাহিক একুশের ঘটনা ধারণ করেছিল- এর মধ্যে একমাত্র ‘দৈনিক আজাদ’ ছাড়া অন্য পত্রিকাগুলোর সেই সময়কার সংখ্যা নষ্ট হয়ে যায়। একই সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর দেওয়া আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তবে একুশে ফেব্রুয়ারি ও তার পরের দিনগুলোর সংবাদচিত্র ছাপা হয় সাপ্তাহিক নওবেলাল, সাপ্তাহিক ইত্তেফাক, দৈনিক ইনসাফ পত্রিকায়। একুশের সকালের পুলিশির তৎপরতার ছবি তুলেছিলেন ড. আহমদ রফিক। আর্টস বিল্ডিং প্রাঙ্গণে ১৪৪ ধারা ভাঙার প্রস্তুতির ছবিসহ বেশিরভাগ ছবি তুলেছিলেন ড. রফিকুল ইসলাম।
তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের ডন, ইভনিং টাইমস, খাইবার মেইল পত্রিকায় একুশের প্রতিফলন ছিল খুবই সামান্য। বিদেশি পত্রিকার মধ্যে কলকাতার স্টেটসম্যান পত্রিকায় কিছু সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল। সাপ্তাহিকের মধ্যে সৈনিক ছিল একুশের সংবাদ সম্ভারে ভরপুর। ইংরেজি দৈনিক স্টেটসম্যানের পাতায় ভাষা আন্দোলনের সংবাদ পরিবেশন ছিল সংক্ষিপ্ত। তবে তথ্য ছিল সঠিক।
একুশে ফেব্রুয়ারির পরদিন অর্থাৎ দৈনিক আজাদের প্রথম পৃষ্ঠায় বড় বড় টাইপে লেখা ছিল, ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে ছাত্র সমাবেশের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ’। নিচে অপেক্ষাকৃত ছোট টাইপে ছিল, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন ছাত্রসহ চার ব্যক্তি নিহত ও ১৭ ব্যক্তি আহত’। তার নিচে ছিল স্কুলের ছাত্রসহ ৬২ জন গ্রেফতার। তবে একই সঙ্গে সরকারি প্রেসনোটের পূর্ণাঙ্গ বিবরণও এ পত্রিকা তুলে ধরেছিল। একই দিনে আজাদের প্রথম সম্পাদকীয় লেখা হয় ‘তদন্ত চাই’। মর্নিং নিউজ নিজস্ব পদ্ধতিতে তার চরিত্র বজায় রাখে। এ কারণে এ পত্রিকার ছাপাখানা জুবিলি প্রেস পুড়িয়ে ছাই করে দেয় ঢাকার স্থানীয় যুবকরা। তবে ছাত্ররাও অংশ নেয়। ইনসাফ পত্রিকার প্রচার সংখ্যা কম হলেও ভাষা আন্দোলনের উপস্থাপনায় ছিল বলিষ্ঠ। কলকাতার দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় একুশের সব খবর ছাপা হয়। তাদের শিরোনাম ছিল, ‘ঢাকায় ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ’। সাপ্তাহিক নওবেলাল ঢাকাসহ সিলেট ও তার আশপাশের অঞ্চলে আন্দোলনের খুঁটিনাটি বিবরণ তুলে ধরে। (সহায়ক গ্রন্থ : ভাষা আন্দোলন ইতিহাস ও তাৎপর্য, আবদুল মতিন ও আহমদ রফিক)।