রাজধানীসহ সারা দেশে কী পরিমাণ ঝুঁকিপূর্ণ ভবন-মার্কেট রয়েছে তার সুনির্দিষ্ট তালিকা নেই সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থার কাছে। অগ্নিকাণ্ড বা ধসের মতো দুর্ঘটনা ঘটলেই কেবল জেগে ওঠে রাজধানী উন্নয়ন কতৃপক্ষ (রাজউক) ও সিটি করপোরেশনের মতো সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো। দুর্ঘটনার পর কয়েক দিন তৎপর থাকে তারা। শুরু হয় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও মার্কেটের তালিকা তৈরি ও খবরদারি। এটা এক-দুই সপ্তাহ চলে। দুই-একটি মার্কেটের ক্ষেত্রে নোটিস পাঠানোসহ কিছু পদক্ষেপ দেখা যায়। তবে অনেকে নোটিস পাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে কার্যক্রম চালু করে। এরপর নতুন কোনো ইস্যু তৈরি হলে চাপা পড়ে স্থায়ী পদক্ষেপের বিষয়টি। মূলত সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পরস্পর ঠেলাঠেলি ও দায় এড়ানোর মানসিকতায় কার্যকর স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও মার্কেটের তালিকা তৈরি করা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণই থেকে যায় সেগুলো।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে দুই দফায় (বছরের শুরুতে ও শেষে) ভবন পরিদর্শন করে ‘ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের’ তালিকা করে তারা। ছয়টি ক্যাটাগরিতে তথা শপিংমলমার্কেট, স্কুল/কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক, হাসপাতাল/ক্লিনিক, আবাসিক হোটেল এবং মিডিয়া প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে সংস্থাটি এ তালিকা তৈরি করে। দুই দফায় ‘ ঝুঁকিপূর্ণ’ ও ‘খুবই ঝুঁকিপূর্ণ’ মিলিয়ে মার্কেট/শপিংমলো সংখ্যা উঠে আসে দুই হাজার ৫২৮টি। এর মধ্যে প্রথম দফায় এক হাজার ২২৮টি ও দ্বিতীয় দফায় ১ হাজার ৩০০টি মার্কেট/শপিংমলকে ঝুঁকিপূর্ণ ও খুবই ঝুঁকিপূর্ণ পায়। এর মধ্যে প্রথম দফায় যেসব মার্কেট পরিদর্শন করা হয়েছে, দ্বিতীয় দফায়ও একই মার্কেট বা কিছুটা কম বেশি পরিদর্শন করা হয়। সেই হিসাবে ১ হাজার ২০০ থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ ঝুঁকিপূর্ণ ও খুবই ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট/শপিংমলের সংখ্যা পায় সংস্থাটি।
পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, প্রথম দফায় ২০১৭ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীতে ৩ হাজার ৭৮৬টি ভবন পরির্দশন করে ২ হাজার ৫৮৮টি ‘ঝুঁকিপূর্র্ণ’ ভবন চিহ্নিত করে। ‘খুবই ঝুঁকিপূর্ণ’ ভবন চিহ্নিত করে ১ হাজার ৬৯টি। আর সন্তোষজনক ভবন পাওয়া যায় ১২৯টি। এ সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট/শপিংমল পায় ৬৮৭টি এবং খুবই ঝুঁকিপূর্ণ পায় ৫৪১টি।
আবার বছরের শেষের দিকে দ্বিতীয় দফায় ২০১৭ সালের ২৬ অক্টোবর থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত ৩ হাজার ৭৩৪টি ভবন পরিদর্শন করে। এর মধ্যে ‘ ঝুঁকিপূর্র্ণ’ ভবন চিহ্নিত করে ২ হাজার ৫৮৩টি। ‘খুবই ঝুঁকিপূর্ণ’ ভবন চিহ্নিত করা হয় ১ হাজার ৬৬টি। সন্তোষজনক পাওয়া যায় ৮৫টি ভবন। এ সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট ৬৭৮টি ও খুবই ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট পাওয়া যায় ৬২২টি। ফায়ার সার্ভিস বলছে, দ্বিতীয় দফার পরিদর্শনের তালিকায় নতুন ভবনও যুক্ত হয়েছে।
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশেনের (ডিএসসিসি) এক তথ্যে দেখা গেছে, ২০২০ সালের ৯ মার্চ থেকে ২০২২ সালের ২ মার্চ পর্যন্ত দক্ষিণের ৫টি অঞ্চলে মোট ৪৬টি ‘ ঝুঁকিপূর্ণ’ ভবন চিহিত করে টেকনিক্যাল কমিটি। এর মধ্যে ৮টি ভবন ডিএসসিসি ও দুটি ভবন মালিক ভেঙে অপসারণ করেছে। বাকি ৩৫টির মধ্যে ১২টি ভবন মালিককে ভবনের স্থায়িত্ব যাচাইয়ে বুয়েট/আইইবি রেজিস্টার্ড প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজ খরচে বিস্তারিত প্রকৌশল মূল্যায়ন করতে বলা হয়। বাকি ভবনগুলোতে ‘ঝুঁকিপূর্ণ ভবন’ লেখা লাল সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৪৬টি ভবনের মধ্যে অনেকগুলো ভেঙে বর্তমানে নতুন মার্কেট নির্মাণের কাজ চলছে। অনেকগুলো ভেঙে নতুন করে নির্মাণে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কোনোটিতে দরপত্র প্রক্রিয়া চলছে।
দুই সিটির আরেক তথ্যে দেখা গেছে, মালিকানাধীন মার্কেটগুলোতে অন্তত ২০টি মার্কেট-বিপণিবিতান অতিঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১১টি মার্কেট ও উত্তর সিটিতে ৯টি মার্কেট রয়েছে।
সিটি করপোরেশন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব মার্কেট ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিস দেওয়াসহ ব্যবসায়ীদের সতর্ক করতে মার্কেটে দফায় দফায় সাইনবোর্ড টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপরও ব্যবসায়ীরা বিষয়টিতে গুরুত্ব দেননি। সম্প্রতি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড পুড়ে যাওয়া বঙ্গবাজারে ১০ বারের মতো নোটিস দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, নোটিস আর সাইনবোর্ড দিয়েই দায় সারে সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষ। নিজেদের স্বার্থেই তারা কখনো শক্তভাবে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
ইনস্টিটিউট ফর প্লানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের নগর অঞ্চল ও পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সময়ের আলোকে বলেন, ফায়ার সার্ভিসের আইনে বলা আছে, কোনো ভবন ঝুঁকিপূর্র্ণ ঘোষণার পরবর্তী ৩ মাসের মধ্যে এ সংক্রান্ত করণীয় নিষ্পত্তি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রার ওপর ভিত্তি করে কোনোটি ভেঙে ফেলা, কোনোটি সংস্কার করে ব্যবহার উপযোগী করে তোলা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে নোটিস দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থা আর তদারক করে না।
তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন বা মার্কেটের তালিকা রাজউক, সিটি করপোরেশন ও ফায়ার সার্ভিস করে থাকে। তবে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজউক ও সিটি করপোরেশনকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তালিকা করার পর ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখায় না। তারা একে অন্যের ওপর দোষ চাপায়। অন্যদিকে ভবন মালিক ও মার্কেট সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাও বোঝেন যে, নোটিস দিয়েই দায়িত্ব শেষ। আর কখনো খবর নেওয়া হবে না। তাই মালিক পক্ষও তাদের করণীয় প্রতিপালন করে না। ফলাফলে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন বা মার্কেট আরও ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তার মতে, দুর্ঘটনার পর রাষ্ট্রকে যখন দায় নিতে হয়, তাই রাষ্ট্রের উচিত বারবার তালিকা না করে জনগণের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
এদিকে বঙ্গবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডর পর ফায়ার সার্ভিস নতুন করে ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট পরিদর্শন শুরু করেছে। গত বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় ফায়ার সার্ভিস ছাড়াও ডিজিএফআই ও এনএসআই কর্মকর্তাদের একটি দল গাউছিয়া মার্কেট পরিদর্শন করে। তারা মার্কেট ঘুরে খুঁটিনাটি বিষয়াদি তুলে নিয়ে আসেন। গত রোববার একই টিম ওয়ারী থানাধীন রাজধানী সুপার মার্কেট পরিদর্শন করে।
গাউছিয়া মার্কেট পরিদর্শন শেষে ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক বজলুর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, মার্কেটটিতে ৬টি সিঁড়ি থাকলেও সেগুলো উন্মুক্ত নয়। বিদ্যুতের তার যেখানে সেখানে ঝুলে আছে। এ ছাড়া মার্কেটটিতে স্বয়ংক্রিয় অগ্নিসংকেত ব্যবস্থা স্থাপনের কথা বলা হলেও সেটি অকার্যকর। এমনকি অগ্নিনির্বাপণের কোনো প্যানেল বোর্ড (এ বোর্ড থাকলে এক জায়গায় বসে মনিটরিং করা যায়) নেই। অগ্নিনির্বাপণী জনবল গড়ে তুলতে বলা হলেও সেটিও করা হয়নি।
ফায়ার সার্ভিস বলছে, মার্কেট বা ভবন পরিদর্শনকালে ঝুঁকির মাত্রা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে মার্কেটের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, কখনো ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। ব্যক্তিগত ভবনে মালিককে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য নোটিস দেওয়া হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে ঢাকা মহানগরীতে সবগুলো মার্কেট পরিদর্শন শেষ হলে রাজউক, সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠাগুলোর সমন্বয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে কোন মার্কেটে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে সুপারিশমালা করে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে হস্তান্তর করবে ফায়ার সার্ভিস।
রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) তন্ময় দাস সময়ের আলোকে বলেন, শুধু রাজউক নয়, সিটি করপোরেশনও ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট ও ভবন চিহ্নিত করে তালিকা করে থাকে। তবে রাজউক বেশি করে থাকে। পরে সে তথ্য মার্কেট কর্তৃপক্ষ, ভবনমালিক এবং সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়।
তিনি বলেন, মূলত আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের-ইউআরপির (রাজউক অংশ) অধীনে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করা হয়েছিল। গত ২২ মার্চ নগর উন্নয়ন কমিটির সভায় এ সংক্রান্ত আলোচনা হয়। প্রকল্পের অধীনে রাজউক ৩ হাজার ২৫২টি ভবনের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে। এর মধ্যে ৪২টি ভেঙে ফেলতে এবং ১৮৭টি রেট্রোফিটিং (সংস্কার) করার সিদ্ধান্ত হয়। ইউআরপির অধীনে প্রাথমিকভাবে জরিপ করা ভবনগুলোর মধ্যে ২ হাজার ৭০৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ২০৭টি হাসপাতাল, ৩৬টি থানা ও ৩০৪টি অন্যান্য ভবন রয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ইউআরপির পরিচালক আবদুল লতিফ হেলালীকে কয়েকবার কল ও এসএমএস করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।