দক্ষ ধাত্রীর অভাব, বাড়ছে সিজার

গোলাম মোস্তফা

জাতীয়

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার তাশকা গ্রামের বাসিন্দা জহুরা বেগমের (৬০) এলাকায় তার ধাত্রী হিসেবে বেশ সুনাম রয়েছে। শুধু আশপাশেই নয়, পাশের

2023-05-05T13:27:21+00:00
2023-05-05T13:27:21+00:00
 
  বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬,
৩ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
জাতীয়
দক্ষ ধাত্রীর অভাব, বাড়ছে সিজার
গোলাম মোস্তফা
প্রকাশ: শুক্রবার, ৫ মে, ২০২৩, ১:২৭ পিএম   (ভিজিট : ৪৭১)
ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার তাশকা গ্রামের বাসিন্দা জহুরা বেগমের (৬০) এলাকায় তার ধাত্রী হিসেবে বেশ সুনাম রয়েছে। শুধু আশপাশেই নয়, পাশের কোনো গ্রামে মহিলার সন্তান জন্মের মুহূর্ত এলেই তার ডাক পড়ে। অথচ তার ডেলিভারির বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ নেই।

তিনি বলেন, আমার সহায়তায় কমপক্ষে ২০০ মহিলার সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে। কারও মৃত্য হয়নি। অবস্থা জটিল দেখলে হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দিই। তবে আগে খুব বেশি ডাক পড়ত। এখন তেমন কেউ ডাকে না। কারণ এখন বেশিরভাগ মহিলার সিজারেই বাচ্চা হয়। 

শুধু এই ধাত্রী নন, তার মতো অজোপাড়া গায়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এমন অপ্রশিক্ষিত অনেক ধাত্রী। ফলে কমছে না নরমাল ডেলিভারি এবং মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যুর সংখ্যা। একই সঙ্গে বাড়ছে সিজার বা অস্ত্রোপচারে বাচ্চা জন্মদানের প্রবণতা। 

চিকিৎসকরা জানান, এখন শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি নবজাতকের জন্ম হয় বাড়িতে। আর গ্রামাঞ্চলের বেশিরভাগ শিশুর জন্ম অদক্ষ ধাত্রীর মাধ্যমে। ফলে মাতৃমৃত্যু রোধ করা যেমন কঠিন হচ্ছে তেমনই মায়ের রক্তক্ষরণ ও খিঁচুনিসহ নানা ধরনের ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ে। এতে করে মা ও নবজাতকের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি হয়। অপ্রশিক্ষিত ব্যক্তিরা সংক্রমণ সম্পর্কে জানেন না। তারা হাতে গ্লাভস না পরে প্রসব করানোর কাজ করেন। এসব যদি দক্ষ হাতে না হয়, তা হলে নবজাতক ও মাতৃমৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটে।

মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর জন্য সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবলের সংকটকে দায়ী করে তারা বলেন, গত ৫ বছরে দেশে সিজারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের সংখ্যা ১১ শতাংশ বেড়েছে। ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। এ অবস্থায় মা ও নবজাতকের সুরক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক নরমাল ডেলিভারি নিশ্চিতের তাগিদের পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে মিডওয়াইফদের বা ধাত্রীদের পদায়নের তাগিদ তাদের।

অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) তথ্য মতে, স্বাধীনতার পর দেশে ১ লাখ প্রসূতির মধ্যে ৫০০ মা মারা যেতেন। বর্তমানে তা ১৬৪ জন। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রসূতিমৃত্যু লাখে ৭০ জন আনার লক্ষ্যে কাজ করছে সংস্থাটি। আজ আন্তর্জাতিক মিডওয়াইফ বা ধাত্রী দিবস। দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘আবার একসঙ্গে : প্রমাণ থেকে বাস্তবে’। এ উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য মতে, দেশে বছরে প্রায় ৩০ লাখ শিশুর জন্ম হয়। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক শিশুর জন্ম হয় বাড়িতে। সরকারের সর্বশেষ বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ বলছে, বছরে ৫০ শতাংশ নবজাতকের জন্ম হয় বাড়িতে, ১৪ শতাংশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে, ৩২ শতাংশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এবং ৪ শতাংশের জন্ম হয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সুবিধাসংবলিত প্রতিষ্ঠানে।

সম্প্রতি জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) ২০২২-এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালে ঘরে শিশু জন্মদান হয়েছে ১২ লাখ ৬২ হাজার ৩২৪ জন, সরকারিতে ৬ লাখ ৪৭ হাজার ৪৩৮ জন, বেসরকারি হাসপাতালে ১৬ লাখ ৩১ হাজার ২৫৫ জন ও এনজিওতে ৬১ হাজার ৪৮৯ জন। আর এদের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে সিজার হয়েছে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৭৮ জনের। বেসরকারিতে ১৩ লাখ ৫৩ হাজার ৯৪২ জনের সিজার হয়েছে। এ ছাড়া এনজিওতে সিজার হয়েছে ২২ হাজার ১৩৬ জনের। ২০১৭ সালের তুলনায় ২০২২ সালে সিজারের ঘটনা বেড়ে ৩৪ শতাংশ থেকে ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

তবে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য মতে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে বাড়িতে ৫ লাখ ৩৭ হাজার ৪৯২টি নবজাতকের জন্ম হয়। এর মধ্যে প্রশিক্ষিত দক্ষ কর্মীর হাতে নবজাতকের জন্ম হয়েছে ৪ লাখ শিশুর। বাকি ১ লাখ ৩৬ হাজার ৮৬৪টি নবজাতকের অদক্ষ ব্যক্তিদের হাতে নিজ বাড়িতে জন্ম হয়। অর্থাৎ বাড়িতে নবজাতকের জন্ম নেওয়ার হার ২৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এ ছাড়া পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের রিপোর্টে বলা হয়েছে, এসডিজি অনুযায়ী, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে শূন্য থেকে ১ মাস বয়সি শিশু মৃত্যুহার প্রতি হাজারে ১২ জনে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। তবে শূন্য থেকে ৫ বছর বয়সি শিশু মৃত্যুহার প্রতি হাজারে ৩৮ জন।

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অবস অ্যান্ড গাইনি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক বেগম নাসরীন সময়ের আলোকে বলেন, বাইরের দেশে বাচ্চা ডেলিভারি করে মিডওয়াইফরা। যখন কোনো সমস্যায় পড়ে তখন চিকিৎসকদের ডাকা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে একসময় ছিলই না। এখন কিছু হচ্ছে তবে তুলনায় খুব কম। ফলে সিজারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এ ছাড়া অপ্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি যা গ্রামে সচরাচর হচ্ছে। ফলে মা-শিশুর মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক ক্ষেত্রে বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, দেশে মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, খিঁচুনি বা একলামশিয়া, বিলম্বিত প্রসব এবং প্রধান প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে মায়েদের হাসপাতালে আনা। তাদের হাসপাতালে আনতে পারলে মাতৃমৃত্যুর সমস্যা বহুলাংশেই সমাধান বলেও মনে করেন তিনি।

ওজিএসবির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ফেরদৌসি বেগম বলেন, মাতৃমৃত্যু কমাতে হলে বাড়িতে প্রসব বন্ধ করতে হবে। আমরা সেটাকে প্রাতিষ্ঠানিক করতে চাই। যেন মাতৃ ও শিশুমৃত্যু না ঘটে। আর স্বাভাবিক প্রসবের জন্য ধাত্রী বা মিডওয়াফদের যে মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ দরকার সেটি আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত সেভাবে গড়ে উঠেনি। বিশেষ করে পরিবেশ, ওষুধপত্র, যন্ত্রপাতি ও দক্ষ লোকবলের সংকট এখনও রয়ে গেছে। প্রসবসেবা, প্রসব পরবর্তী সেবা, নবজাতকের সেবা ও পরিবার পরিকল্পনা সে বিষয়ে আরও বেশি সচেতন হতে হবে মানুষদের ।

নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. নাসির উদ্দিন সময়ের আলোকে বলেন, নার্সিং হলো অনেক পুরোনো একটি কনসেপশন, কিন্তু মিডওয়াইফ হচ্ছে এক দশকের একটি কনসেপশন। তবে জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে আমাদের অনেক নার্সের সংকট রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সংকট খুব বেশি। ইতিমধ্যে আমরা ৩ হাজার নার্স নিয়োগ দিয়েছি এবং আরও ৫ হাজারে পদ সৃষ্টি হয়েছে। আগামী বছরের মধ্যেই এই নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ হবে বলে আশা করি। আর এটা হয়ে গেলেই সংকট অনেকটা কমে যাবে।

২০৩০ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যু কমিয়ে আনার সরকারের যে লক্ষ্যমাত্রা আছে তা নির্দিষ্ট সময়েই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।




Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: