গ্রামীণ রাস্তা কীভাবে বানায় তা শিখতে তারা যেতে চান বিদেশে। ডলার সংকটের এ সময়ে তাদের খায়েশ হয়েছে গ্রামের রাস্তা কীভাবে বানায় সে প্রশিক্ষণ নিতে তারা বিদেশ যাবেন। চলমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকার যখন পণ্য আমদানিতেও লাগাম টেনেছে সেখানে ‘বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় গ্রামের রাস্তা বানানো শিখতে বিদেশে যেতে চান স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) কর্মকর্তারা। এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি টাকা। তবে বিদেশ প্রশিক্ষণের এমন আবদার নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, দেশে যেখানে ছয় লেনের মতো আধুনিক সড়ক নিমাণের অভিজ্ঞতা আছে সেখানে গ্রামের রাস্তা নির্মাণ শিখতে বিদেশ যাওয়া আনন্দভ্রমণ ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য একেএম ফজলুল হক বলেন, প্রস্তাবিত প্রকল্পে কিছু অসঙ্গতি আছে। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় এ বিষয়ে এলজিইডির কাছে জানতে চাওয়া হবে। এ ছাড়া বর্তমানে সরকারের কঠোর নির্দেশনা আছে প্রকল্পের বিদেশ প্রশিক্ষণের বিষয়ে। এই প্রকল্পের বিদেশ প্রশিক্ষণের বিষয়টি বাদ দেওয়ার বিষয়ে সভায় আলোচনা করা হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এলজিইডির পরিকল্পনা, ডিজাইন ও গবেষণা ইউনিটের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলি আখতার হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, আমরা পরিকল্পনা কমিশনে এর প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। প্রকল্পের বিস্তারিত বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। তবে এটি প্রস্তাবনা আকারে আছে। পরিকল্পনা কমিশন দেখবে, যৌক্তিকতা জানতে চাইবে। প্রস্তাবনায় কাঁটছাট হতে পারে, ব্যয় কমতে পারে, এরপর প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদন হবে। প্রকল্পের নথি ঘেঁটে দেখা যায়, প্রকল্পে দেশে ও বিদেশে দুই ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য খরচ ধরা
হয়েছে ৪ কোটি টাকা। তবে কোন দেশে কতজন যাবেন সেটা জানানো হয়নি। আর দেশে প্রশিক্ষণের জন্য ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ দুই খাতে প্রশিক্ষণে মোট ব্যয় দাঁড়াবে ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। পরিকল্পনা কমিশন এতে আপত্তি জানিয়ে বলেছে বিদেশ প্রশিক্ষণের খাত বাদ দিতে হবে।
প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সড়ক নির্মাণ সংশ্লিষ্ট কাজে ব্যয় হবে ২ হাজার ২২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। যা মোট ব্যয়ের ৮০ দশমিক ৯২ শতাংশ। অধিকাংশ কাজ সড়ক সংশ্লিষ্ট হলেও ইউনিয়ন ও গ্রাম সড়কের ডিজাইন টাইপ আলাদা করে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়নি। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, সড়কের শ্রেণি বিভাজন অনুযায়ী ইউনিয়ন সড়ক ও গ্রাম সড়কের ব্যয় আলাদাভাবে প্রাক্কলন করতে হবে।
প্রকল্পের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পূক্ত নয় এমন কাজও যুক্ত করা হয়েছে প্রকল্পটিতে। প্রস্তাবনায় দেখা যায়, পর্যটন এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে পাঁচটি এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এ ছাড়া আঞ্চলিক ট্রেনিং কমপ্লেক্স নির্মাণসহ অফিস ভবন সম্প্রসারণ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ কোটি টাকা। পরিকল্পনা কমিশন তাদের আপত্তিতে বলছে এই দুটি খাত প্রকল্পের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত না সে জন্য বাদ দিতে হবে। অর্থাৎ অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় বলা হয়েছে ৪২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
পরামর্শক খাতের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। পরামর্শক খাতের জন্য ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বিষয়ে সভায় আলোচনা করা প্রয়োজন।
প্রকল্পে ১৮ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য ২১ কোটি ৬০ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এত জমি পাওয়া যাবে কি না বা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরের মতামত আছে কি না এমন কোনো প্রত্যয়নপত্র প্রস্তাবনায় সংযুক্ত করা হয়নি। যা নিয়েও আপত্তি জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে পিইসি সভায় আলোচনা করা হবে বলে পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে। এ ছাড়া প্রস্তাবে সার্ভে বা সমীক্ষা খাতে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ভ্রমণ খাতে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা, প্রচার এবং বিজ্ঞাপন বাবদ ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা প্রস্তাবের বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পে সম্পদ সংগ্রহ খাতে একটি পিকআপ, ২২টি মোটরসাইকেল, তিনটি রোড রোলার, ৩৫ সেট কম্পিউটার ও অ্যাক্সেসরিজ, তিনটি ল্যাপটপ ও ৩০টি স্ক্যানার ক্রয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বিষয়ে সভায় আলোচনা করা প্রয়োজন বলছে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রকল্পের উদ্দেশ্যের বিষয়ে বলা হয়েছে, প্রকল্প এলাকার গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষি-অকৃষি অর্থনীতির সঞ্চালন ঘটানো। গ্রামীণ জনগণের জন্য বাজার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে শহরের সুবিধা গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত সম্প্রসারণ ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নসহ স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। প্রকল্প এলাকায় যানবাহন চলাচলে সহায়ক সড়ক উন্নয়নের মাধ্যমে পরিবহন ব্যয়-সময় কমানো এবং এশিয়ার বৃহত্তম পাশর্^বর্তী ফেনী মিরসরাই অর্থনৈতিক জোনের কর্মকা-ের সঙ্গে প্রস্তাবিত প্রকল্পের এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ টেকসই অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে সম্পৃক্তকরণ।
প্রকল্পের মূল কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে, হাট-বাজার উন্নয়ন। এতে ব্যয় হবে ২২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। গ্রামীণ সড়কে ব্রিজ নির্মাণ এতে খরচ হবে ১৫৬ কোটি টাকা। ইউনিয়ন সড়ক উন্নয়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। গ্রাম সড়ক উন্নয়নে ব্যয় হবে ১ হাজার ২৯৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। গ্রামীণ সড়ক প্রশস্তকরণসহ পুনর্বাসনে ব্যয় হবে ২৩৪ কোটি টাকা। সড়কের ঢাল রক্ষাকরণে ব্যয় হবে ২৫ কোটি ২৯ লাখ। সড়ক মেরামত ও পুনর্বাসনে ২৬৪ কোটি টাকা। আরসিসি সড়ক নির্মাণে ব্যয় হবে ৮৫ বোটি ৭৫ লাখ টাকা। গ্রামীণ সড়কে কালভার্ট নির্মাণে ব্যয় হবে ৬৫ কোটি টাকা। আরসিসি ঘাট নির্মাণে ৫ কোটি টাকা। পর্যটন এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নে ৭ কোটি ৫০ টাকা। ফুটপাথ-ওয়াকওয়ে নির্মাণে ৬ কোটি টাকা এবং আঞ্চলিক ট্রেনিং কমপ্লেক্স নির্মাণসহ অফিস ভবন সম্প্রসারণে ৩৫ কোটি টাকা ব্যয় হবে।
প্রকল্পে ইউনিয়ন সড়ক উন্নয়ন করা হবে ৮০ কিলোমিটারের।
এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। গ্রামীণ সড়কে ব্রিজ নির্মাণ করা হবে ১ হাজার ৩০০ মিটার, ব্যয় হবে ১৫৬ কোটি টাকা। গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন করা হবে ১ হাজার ১১৫ কিলোমিটার, এ জন্য ব্যয় হবে ১ হাজার ২৯৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। গ্রামীণ সড়ক প্রশস্তকরণসহ পুনর্বাসন করা হবে ১৮০ কিলোমিটার, এতে ব্যয় হবে ২৩৪ কোটি টাকা। সড়কের ঢাল রক্ষাকরণ করা হবে ১০ হাজার ১১৬ বর্গমিটার। এতে ব্যয় হবে ২৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা। সড়ক মেরামত ও পুনর্বাসন করা হবে ৪৮০ কিলোমিটার, এতে ব্যয় হবে ২৬৪ কোটি টাকা। আরসিসি সড়ক নির্মাণ করা হবে ২৫ কিলোমিটার, এতে ব্যয় হবে ৮৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। গ্রামীণ সড়কে কালভার্ট নির্মাণ করা হবে ১ হাজার ৩০০ মিটার, এতে ব্যয় হবে ৬৫ কোটি টাকা। আরসিসি ড্রেন নির্মাণ করা হবে ৫০ কিলোমিটার, এতে ব্যয় হবে ৮৩ কোটি টাকা। ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে ২০ কিলোমিটার, এতে ব্যয় হবে ৬ কোটি টাকা।
আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটির পুরো অর্থায়ন করবে সরকার। এটি বাস্তবায়ন করবে এলজিইডি এবং এর বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে জুলাই ২০২৩ থেকে জুন ২০২৮ পর্যন্ত। প্রকল্পের অধীনে চট্টগ্রাম বিভাগের নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলার ২০টি উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
পলেসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর সময়ের আলোকে বলেন, বিদেশে গেলে অভিজ্ঞতা বাড়ে, কিছু ক্ষেত্রে বিদেশে প্রশিক্ষণের প্রয়োজনও আছে। তবে এ কাজের জন্য বিদেশ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে কি না বলতে পারছি না। এ মুহূর্তে সরকারের অর্থ যেন অপচয় না হয় সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।