আসছে ঈদুল আজহা বা কুরবানির ঈদ। এরই মধ্যে প্রস্তুত হচ্ছে কুরবানির পশুর হাট। আর এই ঈদ সামনে রেখে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এবং বেশি দামের আশায় অসুস্থ-চিকন গরু মোটাতাজাকরণের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন এক ধরনের অসাধু গরু ব্যবসায়ী ও খামারি। এ কাজে তারা ব্যবহার করছেন স্টেরয়েড-জাতীয় ওষুধ। আবার অনেক ক্ষেত্রেই খাওয়ানো হচ্ছে-মুরগির খাদ্য এবং ব্যবহার করা হচ্ছে এক ধরনের নিষিদ্ধ ইনজেকশন।
এ বিষয়ে দেশের বিভিন্ন জেলার অন্তত ১০ জন ক্ষুদ্র, মাঝারি এবং বড় খামারি ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হয় সময়ের আলোর এই প্রতিবেদকের। তারা জানিয়েছেন, বাজারে চিকন গরু ক্রেতারা কিনতে চান না। এ জন্য তারা তিন-চার মাস আগে বাজার বা বাড়ি থেকে রোগা পাতলা গরু কিনে এনে মোটাতাজা করেন। অসুস্থ-আর চিকন রোগা-পাতলা গরুকে মোটাতাজাকরণে তারা ডেকাসন, হাইড্রোকর্টিসন, ওরাডেক্সন, প্রেডনিসোলন, বিটামিথাসন, কর্টান এবং স্টেরয়েড জাতীয় মারাত্মক হরমোন ব্যবহার করে থাকেন। যা ইনজেকশনের মাধ্যমে মাংসপেশিতে প্রয়োগ করে গরু মোটা করেন। আর এই সব ট্যাবলেট (পাম বড়ি) ও ইনজেকশন দেওয়ার এক অল্প দিনের মধ্যেই গরু মোটা-তাজা হয়। এতে ভালো দাম পাওয়া যায়।
খামারিরা জানান, এসব ওষুধ কিনতে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র লাগে না। বিক্রেতারা এগুলো দেন, দামও কম।যদিও কিছু ব্যবসায়ী বিষয়টি অস্বীকার করে বলছেন, গরু মোটাতাজাকরণে তারা কোনো ধরনের ওষুধ প্রয়োগ করেন না। কারণ ইনজেকশন ও ওষুধ ছাড়াই দেশীয় পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজা করলে চাহিদা বেশি থাকে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুস্থ গরুকে স্টেরয়েড-জাতীয় ইনজেকশন বা বড়ি দিয়ে মোটা করা-গরু ও মানুষ উভয়ের জন্যই মারাত্মক ক্ষতিকর। এসব গরুর মাংস খাওয়ার ফলে মোটাতাজাকরণের ওষুধ ও রাসায়নিক পদার্থ মানব শরীরে ঢোকে। এতে মানুষের কিডনি, লিভার এবং হৃৎপি-সহ অন্যান্য অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ঝুঁকি বেশি। এমনকি ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। আর ব্যবসায়ীদের এ সব অনৈতিক কাজ বন্ধ করতে মনিটরিং সিস্টেম জোরদার করাসহ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া যাতে কেউ যেন ওষুধপত্র কিনতে না পারে তারও দাবি জানান।
আর কুরবানির ঈদকে সামনে রেখে অসাধু ব্যবসায়ীদের এ ধরণের অপতৎপরতা ঠেকাতে রাজধানীসহ দেশের প্রতিটি হাটে ভেটেরিনারি মনিটরিং টিম রাখার ব্যবস্থা থাকবে বলে জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর। বছর গরুর ব্যবসা করেন ময়মনসিংহের সদরের ইসলাম মিয়া। তার ছোট খামারও আছে। তিনি স্থানীয় বাজার এবং গ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকে চিকন এবং মাঝারি স্বাস্থ্যের গরু কিনে লালন-পালন করেন।
তিনি জানান, বাজারে ডেক্সোনা এবং প্রাকটিন ট্যাবলেট জাতীয় বেশ কিছু ওষুধ আছে-যা ভারত থেকে চোরাইপথে আসে। এছাড়া আবার অনেকেই ডেকাসন, ওরাডেক্সন, প্রেডনিসোলন, বেটেননাল, কর্টান, স্টেরয়েড জাতীয় ট্যাবলেট অনেকেই খাওয়ায়। এগুলো গরুকে খাওয়ালে শরীরে পানি জমে, প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যায়। অল্প দিনের মধ্যেই গরু মোটাতাজা এবং হৃষ্টপুষ্ট দেখা যায়। তবে এই সব ওষুধ মানুষ ও গরুর জন্য ক্ষতিকারক বলে তিনিও স্বীকার করেন।
এ বিষয়ে সাভারের সুপ্রিম ইকো বিকস অ্যান্ড এগ্রো খামারের মালিক মো. জসিম উদ্দিন সময়ের আলোকে বলেন, বাজারে অনেক ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ট্যাবলেট আছে। অনেকেই খাওয়ায়, কিন্তু আমরা খাওয়াই না। আমাদের খামারে ৭২টি গরু আছে। সবই ঈদের জন্য বিক্রির জন্য প্রস্তুত করছি। আর এ সব গরুদের খড়, ভুট্টার গুঁড়া, সয়াবিনের খৈল, ডাল, ভুসি, নারকেলের খৈল ও কাঁচা ঘাস খাইয়ে মোটাতাজা করছি। কারণ ইনজেকশন ও ওষুধ ছাড়াই দেশীয় পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজা করলে চাহিদা বেশি থাকে।
তিনি বলেন, স্বাভাবিক উপায়ে গরু মোটাতাজা করতে হলে তিন মাস সময় লাগে কিন্তু অনেকেই তা না করে বাজারে বেশ কিছু স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করে। যা অল্প সময়ে গরু মোটাতাজা করতে সাহায্য করে। কিন্ত এতে গরুর জন্য রিস্ক। অনেক সময় গরু মারাও যেতে পারে।
পাবনার হাঁপানিয়ার গরু মোটাতাজাকারী তিনজন খামারি জানান, তারা পাঁচ-ছয় মাস আগেই প্রায় ৮০ টি গরু কিনেছেন। এসব গরু মোটাতাজা করতে দানাদার খাদ্য খড়, কুটা, খৈল এবং ভূষিসহ অ্যান্টিবায়োটিক বড়ি খাওয়াচ্ছেন। একই সঙ্গে ইনজেকশানও ব্যবহার করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব খামারি বলেন, গতবার গরু ব্যবসায় ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছি। এবার আর লোকসান করতে চাই না। গরু মোটাতাজা করতে বেশ কিছু কোম্পানির শিট রয়েছে। তবে ওই সব শিটের বাইরেও অ্যান্টিবায়োটিক বড়ি খাওয়ানো হয়। কারণ ঈদে সাধারণত ক্রেতাদের সবসময় দৃষ্টি থাকে মোটাতাজা গরুর দিকে। তাই অতিরিক্ত লাভের আশায় চিকন এবং রোগা গরুদের মোটাতাজা করছি।
গাজীপুরের শাহ আলম নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, কুরবানির হাটে মোটাতাজা গরু মানেই যে ইনজেকশন দেওয়া, এমন ধারণাও সঠিক নয়। তবে অনেকেই বেশি লাভের আশায় ওষুধের মাধ্যমে মোটাতাজা করে এটা অস্বীকার করব না। ভালো-মন্দ সব ব্যবসাতেই আছে।
গরু মোটাতাজাকরণের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ভেটেরিনারি হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আবদুল আজিজ আল মামুন বলেন, পশু খাদ্য আইন অনুযায়ী, গবাদি পশুর হৃষ্টপুষ্টকরণে কোনো প্রকার হরমোন স্টেরয়েড এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। তবে বর্তমানে স্টেরয়েড বা ওষুধ ব্যবহার করে মোটাতাজাকরণ করা হয় না। কারণ এখন সবাই অনেক বেশি সচেতন। সবাই জানে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ খাওয়ানোর ফলে মানুষের যেমন ক্ষতি হয় তেমনই গরুর ক্ষতির হয়। সুতরাং কেউ ইচ্ছে করে কোনো রিস্ক নেবে না।
গরু মোটাতাজাকরণে হরমোন বা স্টেরয়েড ব্যবহার করা স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আ ব ম ফারুক সময়ের আলোকে বলেন, যে সব গরু-ছাগলকে মোটাতাজাকরণের জন্য এ ধরনের ওষুধ খাওয়ানো হলে সবচেয়ে বড় সমস্যা কিডনি নষ্ট হয়ে যায়, আর কিডনি নষ্ট হলে শরীরে পানি জমে ফুলে উঠে তখন গরু দেখতে মোটা ও তাজা তাজা মনে হয়। আবার এমনও দেখা গেছে, হাট থেকে বেশ সুস্থ-সবল দেখে গরু কিনে আনা হয়েছে কিন্তু বাসা বাড়িতে আনার সঙ্গে সঙ্গেই মারা গেছে। আবার অনেক গরুই অসুস্থ হয়ে পড়ে। মানুষ তো অসুস্থ পশু কুরবানি দিতে পারবে না।
তিনি বলেন, আর যে যে মাংস যে খাবে তারও কিডনিসহ নানা সমস্যা তৈরি হয়। বিশেষ করে শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের। এ জন্য সরকারের নজরদারি বাড়ানো উচিত।
কুরবানির ঈদকে সামনে রেখে হাটবাজারে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এ প্রসঙ্গে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ডা. মো. নাজমুল হক সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে সারা বছরই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নজরদারির ব্যবস্থা থাকে। তবে কুরবানির ঈদের তিন মাস আগে থেকেই ভেটেরিনারি মনিটরিং কাজ শুরু করে খামারিরা কীভাবে মোটাতাজাকরণ করবে তা শিখিয়ে দেওয়া হয়। আর কোনো ওষুধে স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই। একই সঙ্গে কেউ যাতে অবৈধ পন্থায় ওষুধ ব্যবহার না করে সেটিও নজরে রাখা হয়। এবারও ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি হাটে ব্যবসায়ীদের এ ধরনের অপতৎপরতা ঠেকাতে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম কাজ করবে।
তিনি বলেন, হাটে অবৈধভাবে গরু মোটাতাজা করছে কি না তা পরীক্ষা করার ব্যবস্থা থাকবে। কারও যদি সন্দেহ হয় তা হলে সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা করে নিতে পারবে। কারণ যে সব গরু ওষুধের মাধ্যমে মোটাতাজা হয়েছে তা দেখলেই চেনা যায়। ওষুধের মাধ্যমে গরু মোটা হবে কিন্তু কোনো চাঞ্চল্য থাকবে না। চোখের পাতা ফোলা ফোলা ও ঘুমন্ত হবে। চোখের চাহনি চঞ্চল বা পরিষ্কার হবে না। যদি সুস্থ সবল গরু হয় তাহলে তার শরীরের যেকোনো অংশে কোনো চাপ দিলে সঙ্গে সঙ্গে আগের অবস্থায় ফিরে আসে। কিন্তু অসুস্থ হলে আগের গরুর নিচু অংশটা আগের অবস্থায় সহজেই আসবে না দেরি হবে।
ডা. নাজমুল হক বলেন, কোনো খামারি কিংবা ব্যবসায়ী যদি অবৈধভাবে গরু মোটাতাজা করে তাহলে আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা ও জরিমানা করা হবে এবং মোবাইল কোর্টও পরিচালনা করা হবে।