ডেঙ্গুর নেপথ্যেও সিন্ডিকেট

রফিকুল ইসলাম সবুজ

জাতীয়

দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে মশা মারার নিম্নমানের কীটনাশক সরবরাহ করছে একটি সিন্ডিকেট। ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহক এডিস মশার লার্ভা

2023-08-20T07:13:07+00:00
2023-08-20T07:13:07+00:00
 
  শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬,
১২ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
জাতীয়
ডেঙ্গুর নেপথ্যেও সিন্ডিকেট
নিম্নমানের কীটনাশক সরবরাহ
রফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: রোববার, ২০ আগস্ট, ২০২৩, ৭:১৩ এএম 
দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে মশা মারার নিম্নমানের কীটনাশক সরবরাহ করছে একটি সিন্ডিকেট। ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহক এডিস মশার লার্ভা নিধনে অকার্যকর কীটনাশক সরবরাহের পাশাপাশি প্রয়োজনের চেয়ে কম কীটনাশক দিয়ে উড়ন্ত মশা মারার ফরমুলেশন তৈরিরও অভিযোগ রয়েছে।

সিটি করপোরেশনের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের আশীর্বাদপুষ্ট নিম্নমানের কীটনাশক সরবরাহকারী সিন্ডিকেটের কারণে কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন। খামারবাড়ীর উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) কয়েকজন কর্মকর্তাও সিন্ডিকেটে জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এডিস মশার লার্ভা নিধনের জৈব কীটনাশক ‘ব্যাসিলাস থুরিংয়েইনসিস ইসরায়েলেনসিস’ (বিটিআই) আমদানি নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগে মার্শাল এগ্রোভেট কোম্পানি লিমিটেডকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। ডিএনসিসিকে এই কীটনাশক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মার্শাল এগ্রো জানিয়েছিল, পাঁচ টন বিটিআই তারা সিঙ্গাপুরের বেস্ট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাইভেট লিমিটেড থেকে আমদানি করেছে। তবে সিঙ্গাপুরের ওই প্রতিষ্ঠান বলছে সেগুলো তাদের কাছ থেকে আনা হয়নি। এরপরই মার্শাল এগ্রোভেটের জালিয়াতির বিষয়টি সামনে আসে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত প্রায় চার বছর ধরে ঢাকার দুই সিটির কীটনাশক সরবরাহের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে আসছে মার্শাল এগ্রোভেট। বিটিআই সরবরাহে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ার পর কোম্পানিটি আলোচনায় এলেও তাদের বিরুদ্ধে উড়ন্ত মশা মারার নিম্নমানের ওষুধ সরবরাহেরও অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকার দুই সিটির সংশ্লিষ্টরা জানান, উড়ন্ত মশা মারার ওষুধের মূল উপাদান চীন ও ভারত থেকে আমদানি করে সিটি করপোরেশনগুলো ৫ শতাংশ আরএফইউ (রেডি ফর ইউজ) ফরমুলেশন তৈরির জন্য দরপত্র আহ্বান করে। অভিযোগ রয়েছে সিটি করপোরেশন ফরমুলেশন তৈরির জন্য মূল উপাদান সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার পর তারা ৬০ শতাংশ মূল উপাদান দিয়ে ওষুধ তৈরি করে সিটি করপোরেশনকে সরবরাহ করে। আর বাকি ৪০ শতাংশ মূল উপাদান বাইরে বিক্রি করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ওষুধের মান ঠিক না থাকায় মশা ঠিকমতো মরে না। ওষুধে কীটনাশকের মূল উপাদান কম দেওয়া হলেও উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের কয়েকজন কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে সঠিক মাত্রার প্রতিবেদন নেওয়া হয়। এ জন্য প্রতি চালানে তিন থেকে চার লাখ টাকা দিতে হয় বলে জানা গেছে। মার্শাল এগ্রোভেট সিন্ডিকেটের সঙ্গে উত্তর সিটি করপোরেশনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা এবং দক্ষিণের কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানটি ঢাকার দুই সিটিতে বছরে কমপক্ষে ৬০-৭০ কোটি টাকার কীটনাশক সরবরাহ করে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আর এ ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ১০ শতাংশ কমিশন দিতে হয়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একজন কর্মকর্তা জানান, পাইরিপ্রোক্সিফেন নামে নামে একটি কীটনাশক রয়েছে যা প্রতিবেশী দেশ ভারতে মশার লার্ভা মারার জন্য ব্যবহার করা হয়। যা ড্রেনে ছিটালে প্রায় তিন মাস মশার লার্ভা হয় না। এ ছাড়া ডেল্টামেথরিন ১ দশমিক ২৫ ইউএলভি নামে একটি কীটনাশক রয়েছে যা পানির সঙ্গে মিশিয়ে সরাসরি ফগিং করা যায়। এটা আমদানি করার পর ফরমুলেশনের প্রয়োজন হয় না অর্থাৎ সিটি করপোরেশনের কর্মচারীরা পানির সঙ্গে মিশিয়ে সরাসরি ব্যবহার করতে পারে। এতে অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি ওষুধে ভেজালের আশঙ্কা থাকে না। কিন্তু ভেজাল কীটনাশক সরবরাহকারী সিন্ডিকেটের কারণে এই ওষুধগুলো কেনা হয় না বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

কীটতত্ত্ববিদ মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, মশার লার্ভা নিধনে ডিএনসিসি বিদেশ থেকে যে ব্যাকটেরিয়া বাসিলাস থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস (বিটিআই) আমদানি করেছে, তা আদতে বিটিআই কি না তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। তার মতে কিছু ব্যক্তির অবৈজ্ঞানিক কথাবার্তায় নীতিনির্ধারকরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। নীতিনির্ধারকরা অবৈজ্ঞানিক পন্থায় হাঁটছেন। এতে মশা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। মারা যাচ্ছে মানুষ।

শুক্রবার ডিএনসিসির সচিব মোহাম্মদ মাসুদ আলম সিদ্দিকের স্বাক্ষর করা এক অফিস আদেশে আমদানি নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগে মার্শাল এগ্রোভেট কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আদেশে বলা হয়, মার্শাল এগ্রোভেট লিমিটেড থেকে তারা ৫ হাজার কেজি বিটিআই এনেছে। কিন্তু জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে মার্শাল এগ্রোকে দুবার চিঠি দিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। এরপর গত ১৭ অগাস্ট মার্শাল এগ্রো এ বিষয়ে একটি চিঠি দিয়েছে। তবে তাতে কোম্পানিটি অভিযোগ খ-াতে পারেনি জানিয়ে বলা হয়, বিষয়টি নিয়ে মশক নিধন ও যন্ত্রপাতি কারিগরি ও যাচাই কমিটির সভায় পর্যালোচনা করে ডিএনসিসিতে দেওয়া বিটিআই সিঙ্গাপুরের ওই প্রতিষ্ঠান থেকে আনা হয়েছে-এমন বক্তব্যের পক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি মার্শাল এগ্রো। এ ছাড়া ভান্ডার ও ক্রয় বিভাগ বেস্ট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারে, তারা কোনো বিটিআই মার্শাল এগ্রোকে সরবরাহ করেনি। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে তাদের পরিবেশকও নয়। আর লি কিয়াংও বেস্ট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের কেউ নয়। এ কারণে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া মার্শাল এগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে ডিএনসিসির সব ধরনের কার্যক্রমে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

এর আগে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ভেজাল ও নিম্নমানের মশার ওষুধ সরবরাহের কারণে ২০১৮ ঢাকায় ডেঙ্গুতে অনেক মানুষ মারা যাওয়ার পর সরকারের নির্দেশে লিমিট এগ্রো প্রোডাক্টকে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল করা হয়। তবে কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির মালিক মিজানুর রহমান ও মাহবুব সিন্ডিকেট বেনামে ওষুধ সরবরাহের চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ায় মূলত মার্শাল এগ্রোভেটের মালিক নাসির উদ্দিন দুই সিটির কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে একক নিয়ন্ত্রণ নেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. সেলিম রেজা সময়ের আলোকে জানান, বিটিআই সরবরাহে জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়ায় মার্শাল এগ্রোভেটকে আপাতত কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন হলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘদিন কীটনাশক সরবরাহের কাজ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিইও বলেন, অভিযোগটি ভিত্তিহীন। কারণ সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয় নিয়ম মেনে। নিচের লেভেল থেকে কমিটির মাধ্যমে দরপত্রের সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার পর কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে আমার কোনো ভূমিকা থাকে না।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান ভান্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মোহাম্মদ বশিরুল হক ভূঁইয়া সময়ের আলোকে বলেন, ডিএসসিসিতে কীটনাশক সরবরাহে কোনো সিন্ডিকেট নেই। কীটনাশক ক্রয়ের ক্ষেত্রে ইজিপির মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করে যথাযথ মূল্যায়ন করে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। দরপত্র দাখিলকারী প্রতিষ্ঠানের আমলনামা দেখে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি ও মেয়র সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তাই ডিএসসিসির দরপত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা থাকে। এখানে কোনো সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগই নেই।

সময়ের আলো/আরএস/ 



Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: