রাজধানী ঢাকায় কত যানবাহন চলাচল করে তার সঠিক হিসাব নেই কোনো সংস্থার কাছে। একইভাবে এ নগরীতে কী পরিমাণ মানুষ বসবাস করে এবং তাদের জন্য কত যানবাহন প্রয়োজন তারও কোনো সমীক্ষা হয়নি। তবে থেমে নেই নতুন যানবাহনের অনুমোদন। ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন গড়ে ৫০০টির বেশি বিভিন্ন ধরনের গাড়ি নামছে। অথচ রাজধানীর সড়কের আয়তন বা পরিসর একটুও বাড়ছে না। দেশের প্রধান শহরের এমন এক প্রেক্ষাপটে আজ (২২ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস দিবস পালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত দেশে রেজিস্ট্রি করা মোটরযানের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার। যেটি ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ লাখ ৯২ হাজার ৪৪০টিতে। এর মধ্যে শুধু ২০২১-২২ অর্থবছরেই ৫টি মেট্রো সার্কেল ও ৫৭টি জেলা সার্কেল অফিসে ৫ লাখ ২৩ হাজার ৯টি মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়। এর বাইরে রয়েছে কয়েক লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও অন্যান্য অপরিকল্পিত যানবাহন।
এদিকে নতুন যানবাহনের চাপ ও সড়কের আয়তন না বাড়ায় অনেক আগে থেকেই ঢাকাকে চলাচলের অনুপযোগিতার কথা বলে আসছে বিভিন্ন মহল। সবশেষ গত শুক্রবার ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার বলেছেন, রাজধানীতে ধারণক্ষমতার প্রায় ছয়গুণ বেশি যানবাহন রয়েছে। এত বিপুল পরিমাণ যানবাহনের কারণে তীব্র যানজটে ভোগান্তি যেমন বেড়েছে, তেমনি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে নগরীর বাতাস। ফলে নতুন করে নগরীর যানবাহন নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হয়েছে। এদিকে যত্রতত্র বাস না থামানো এবং নির্দিষ্ট স্থানে যাত্রীদের ওঠা-নামানোসহ বেশ কিছু বিষয়ে পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সড়ক বিশেষজ্ঞ সাইফুন নেওয়াজ সময়ের আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত রাজধানীর আয়তন অনুযায়ী যানবাহনের হিসাব নিয়ে সঠিক কোনো সমীক্ষা হয়নি। এখন সমীক্ষা করে সড়কের আয়তন ও প্রয়োজনীয় যানবাহনের সংখ্যা ঠিক করা দরকার।
সড়ক বিশেষজ্ঞ ও যাত্রী কল্যাণে কাজ করা বিশিষ্টজনরা বলছেন, সড়ক, যানবাহন, ট্রাফিক ও যাত্রী সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, পাবলিক ট্রান্সপোর্টের চেয়ে ব্যক্তিগত গাড়ির বেশি অনুমোদন দেওয়া, সড়কের বিশাল অংশ খোঁড়াখুঁড়ি ও হকারদের দখলে থাকার কারণে যানবাহনের গতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি জট বেড়েই চলেছে। একইভাবে যেখানে-সেখানে গাড়ি থামিয়ে মামলা ও জরিমানা আদায় করেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাওয়া যায়নি। এভাবে চলতে থাকলে এবং যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কোনো উদ্যোগ নেওয়া না হলে ২০২৫ সালে রাজধানীতে যানবাহনের গতি ঘণ্টায় চার কিলোমিটার হবে।
নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি আধুনিক নগরীতে মোট আয়তনের ২০-২৫ ভাগ রাস্তা রাখতে হয়। কিন্তু রাজধানীর ঢাকায় প্রায় ২ কোটি মানুষের বসবাস থাকলেও রাস্তা আছে মাত্র ৭-৮ ভাগ। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় রাস্তা আছে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের তথ্যে জানা যায়, রাজধানী ও এর আশপাশে ২৭৬ দশমিক ৬১ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এদিকে পরিসংখ্যানে সড়কের যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, বাস্তবে তা পুরোপুরি ব্যবহার করা যায় না। সেবাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের খোঁড়াখুঁড়ি, হকারদের দখলদারিত্ব, একই রাস্তায় দ্রুতগতি ও ধীরগতির যান চলাচল, শহরের মধ্যে রেলক্রসিং, ভিআইপি মুভমেন্ট, ট্রাফিক সিগন্যালসহ নানা কারণে যানজট লেগেই থাকে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, রাজধানীতে ধারণক্ষমতার চেয়েও প্রায় ছয়গুণ বেশি যানবাহন চলাচল করছে। এ কারণে যেমন যানজট হচ্ছে, তেমনি তীব্র পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। ধুলা ও অযথা হর্নের শব্দের কারণে একজন সুস্থ মানুষের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার পরিবেশ থাকে না।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের মোট এলাকা ১ হাজার ৩৫৩ বর্গকিলোমিটার। আর রাস্তার আয়তন ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রধান সড়ক ২১০ কিলোমিটার। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের মোট যাত্রীর ৫-৬ ভাগ ব্যক্তিগত গাড়িতে চলাচল করলেও তারা সড়কের ৭০ ভাগ অংশ দখল করে রাখেন। এর বাইরে ২৮ ভাগ যাত্রী চলাচল করে গণপরিবহনে।
২০১৬ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছিল, ২০০৪ সালে ঢাকার রাস্তায় প্রতি ঘণ্টায় গাড়ির গতিসীমা ছিল গড়ে ২১ দশমিক ২ কিলোমিটার। যানবাহনের পরিমাণ একই হারে বাড়তে থাকলে এবং নিয়ন্ত্রণে কোনো উদ্যোগ নেওয়া না হলে ২০২৫ সালে এই শহরে যানবাহনের গতি হবে ঘণ্টায় চার কিলোমিটার, যা মানুষের হাঁটার গতির চেয়ে কম হবে।
যাত্রী অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলেন, মামলা ও জরিমানা করে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো যায় না। তারা ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের এক পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলেন, ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশ ৪৭ লাখ ৫৩ হাজার ৪০২টি মামলা করেছে। হিসাব মতে, প্রতি মাসে গড়ে ৬৬ হাজারেরও বেশি মামলা করে সংস্থাটি। আবার এসব মামলায় বিভিন্ন যানবাহনকে ৩৮৬ কোটি ৫৪ লাখ ৪ হাজার ৪০৯ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। যেখানে জরিমানা আদায় হয়েছে ৩৪৬ কোটি ৪১ লাখ ২৮ হাজার ৮৫৫ টাকা। এত মামলা ও জরিমানার পরেও কিন্তু সড়কে শৃঙ্খলা ফেরেনি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, নগরীতে যানবাহনের চাপ কমাতে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারেন ডিএমপি কমিশনার। কেননা পদাধিকারবলে তিনি আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির চেয়ারম্যান। এ ছাড়া সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর মূল দায়িত্বও তার। কিন্তু ঢাকা শহরে নতুন যানবাহন রেজিস্ট্রেশন দেওয়া বন্ধে পদক্ষেপসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে তেমন কোনো ভূমিকা দেখা যায় না। পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতারও খুব অভাব আছে।
যানবাহনের পরিসংখ্যান যা বলছে : বিআরটিএর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২২ সাল পর্যন্ত সারা দেশে বাসের সংখ্যা ৫০ হাজার ৬৬৩টি, মিনিবাস ২৭ হাজার ৭৪৫টি, ট্রাক ১ লাখ ৪৬ হাজার ৬২৮টি, প্রাইভেটকার ৩ লাখ ৯১ হাজার ৪৯১, মোটরসাইকেল ৩৭ লাখ ৩৯ হাজার ৯০৪টি, মাইক্রোবাস ১ লাখ ১২ হাজার ৩৩২টি, পিকআপ ১ লাখ ৪৮ হাজার ৯৯৬টি, জিপ ৭৮ হাজার ৯৪টি, কাভার্ড ভ্যান ৪৪ হাজার ৫৩৭টি, ডেলিভারি ভ্যান ৩২ হাজার ৭৮৭টি, হিউম্যান হলার ১৭ হাজার ৩৭১টি, ট্রাক্টর ৪৫ হাজার ৮৫৫টি ও অন্যান্য মোটরযান ছিল ৫৯ হাজার ২৬১টি।
বিআরটিএর ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় বৈধ রেজিস্ট্রেশন করা বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করছে ১৮ লাখ ৯৩ হাজার ৫৩৪টি। এর মধ্যে ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের নতুন গাড়ির রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৯৩৭টি। হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ৫৩০টি যানবাহনের নতুন লাইসেন্স দেওয়া হয়। অথচ ২০১০ সালে রাজধানীতে মোট রেজিস্ট্রেশন করা মোটরযানের সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৫০১টি।
বিআরটিএর হিসাবে দেখা গেছে, ২০২২ সাল পর্যন্ত রাজধানীতে চলাচলকারী রেজিস্ট্রেশন করা মোটরসাইকেল ছিল ৯ লাখ ৭২ হাজার ৭৮০টি। শুধু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত নতুন ৭৭ হাজার ৭৭৪টি মোটরসাইকেলকে রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়। এভাবে বাসের সংখ্যা ছিল ৩৮ হাজার ৬২৬টি। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ২৮৪টি নতুন বাস রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়। মিনিবাসের সংখ্যা ছিল ৮৮ হাজার ৭১৬টি। জুলাই পর্যন্ত নতুন রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয় ৪ হাজার ১৫৫টি। রেজিস্ট্রেশন করা পিকআপের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৯ হাজার ৩৮২টি। জুলাই পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ২৮৫টি, মাইক্রোবাসের সংখ্যা ছিল ৮৮ হাজার ৭১৬টি, চলতি বছরের শুরু থেকে জুলাই পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয় ৪ হাজার ১৫৫টি।
বিশ্ব গাড়িমুক্ত দিবস আজ : আজ বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস। নাগরিকদের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করে বরং সাইকেল, হাঁটা বা গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহিত করতে গাড়িমুক্ত দিবসের সূচনা হয়।
বাংলাদেশে সরকারি উদ্যোগে দিবসটি পালন শুরু হয় ২০১৬ সালে। আজও দেশে পালন করা হবে বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস। এ বছর ‘জ্বালানি ব্যবহার ও যানজট নিয়ন্ত্রণ করি, ব্যক্তিগত গাড়ি সীমিত রাখি’-এই স্লোগানকে সামনে রেখে ৬২টি সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সম্মিলিত উদ্যোগে দিবসটি উদযাপন করা হচ্ছে।
সময়ের আলো/আরএস/