বিমানবন্দরের ব্যাংকগুলোতে রমরমা হুন্ডি ব্যবসা

রফিক রাফি

জাতীয়

ডলার সংকটের বিরূপ প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে আমদানি। এ অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অবৈধ হুন্ডি

2023-11-06T03:47:38+00:00
2023-11-06T03:47:38+00:00
 
  শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬,
২০ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
বিমানবন্দরের ব্যাংকগুলোতে রমরমা হুন্ডি ব্যবসা
রফিক রাফি
প্রকাশ: সোমবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৩, ৩:৪৭ এএম 
বিমানবন্দরের ব্যাংকগুলোতে রমরমা হুন্ডি ব্যবসা
ডলার সংকটের বিরূপ প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে আমদানি। এ অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অবৈধ হুন্ডি ঠেকাতে চলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান। প্রবাসীরা যেন হুন্ডির মাধ্যমে টাকা না পাঠান সে জন্য দেওয়া হচ্ছে প্রণোদনা। অথচ দেশের প্রধান বিমানবন্দর শাহজালালের ব্যাংক বুথগুলোর কারেন্সি সেলস সেন্টারগুলোতে চলছে ‘অবৈধ হুন্ডি’ ব্যবসা। বিষয়টি অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, এই হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে। একটি সিন্ডিকেট ব্যাংকের বুথগুলো ব্যবহার করে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছে আর বৈদেশিক মুদ্রা হুন্ডির মাধ্যমে চলে যাচ্ছে বিদেশে। বিদেশফেরত যাত্রী সাধারণ ইমিগ্রেশন পার হওয়ার পর বিমানবন্দরে থাকা ব্যাংকের বুথে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় করে দেশীয় মুদ্রা (টাকা) গ্রহণ করেন। এ ক্ষেত্রে যাত্রীকে তার নাম-পরিচয় পাসপোর্ট নাম্বার লিপিবদ্ধ করে ভাউচার দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু যাত্রীকে বৈধ ভাউচার দেওয়া হয় না। ফলে ব্যাংকের মূল হিসাবে তা আসছে না। এতে বৈদেশিক মুদ্রাগুলো সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। পরবর্তী সময়ে এগুলো হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে চলে যায় অথবা বেশি টাকায় খোলা মার্কেটে বিক্রি করা হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রবাসীরা দেশে ফিরে নিজেদের কাছে থাকা বৈদেশিক মুদ্রা বিমানবন্দরে থাকা ব্যাংকের বুথে বিনিময় করে দেশীয় মুদ্রা নেন। বিনিময় করার সময় ভাউচার দেওয়া হলো কি হলো না, বৈধ কি অবৈধ-সেটা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। কারণ তারা তখন প্রিয়জনের কাছে ফেরার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকেন। এই সুযোগই কাজে লাগায় বিমানবন্দরে থাকা ব্যাংক বুথগুলোর সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেট।

চলতি মাসের ১ তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশনে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়।

অভিযোগে বলা হয়, জনতা ব্যাংক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম বৃহত্তম একটি ব্যাংক। কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহলের চক্রান্তে ব্যাংকটি তার সুনাম হারাতে বসেছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জনতা ব্যাংকের নিচতলায় কারেন্সি পারচেজ কাউন্টারে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ জনের কাছ থেকে কমবেশি ২ কোটি টাকার কারেন্সি ক্রয় করা হলেও ভাউচার দেওয়া হয় ২০ থেকে ২৫টি। সিস্টেম জেনারেটেড ভাউচার না দিয়ে এমএস এক্সেলে টাইপকৃত ভাউচার দেওয়া হয়। ফলে ক্রয়কৃত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যাংকের লেনদেনে শো করে না। দ্বিতীয় তলায় কারেন্সি সেলস কাউন্টারেও ভাউচার ছাড়াই ব্যাংকবহির্ভূত ফান্ডের মাধ্যমে ভাউচার ছাড়াই প্রবাসীদের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয় করা হয়। প্রতিটি টিএম ভাউচারের জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে আদায় করা হলেও তা ব্যাংক হিসাবে জমা করা হয় না। ব্যাংকে রক্ষিত কারেন্সি বিক্রয় না করে ব্যাংকবহির্ভূত ফান্ডের মাধ্যমে ক্রয় করা কারেন্সি বিক্রয় করা হয়।

একটি চক্রের সহায়তায় ব্যবস্থাপক আবু নুর মো. ফয়সাল ২ থেকে ৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে অবৈধ হুন্ডি ব্যবসা করছেন বলে অভিযোগ করা হয়।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ব্যাংকের অডিট টিম বিমানবন্দরে গিয়ে এসব জালিয়াতি ধরতে পারে না। কারণ টিমকে পাস নিয়ে বুথে প্রবেশ করতে হয়। এ সময়ের মধ্যে কারেন্সিগুলো সরিয়ে ফেলে, ভাউচার বিনষ্ট করে ফেলে এবং ডিলিট করে ফেলে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আকস্মিকভাবে অভিযান পরিচালনা করলে সব তথ্য প্রমাণ হাতে পাওয়া যাবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৯ অক্টোবর প্রবাসী মিসেস সালমা পাসপোর্ট নং ই এইচ ০৬৮৪৪০৪-এর থেকে ১০০০ রিয়াল এবং প্রবাসী মিসেস নারগিস পাসপোর্ট নং ২০২৭১১৭-এর কাছ থেকে ১৮৫১ রিয়াল ক্রয় করে এক্সেলে তৈরি অফিসারের সিগনেচার ব্যতীত ভুয়া ভাউচার দেওয়া হয়। ২১ জুলাই প্রবাসী জাহাঙ্গীর আলম পাসপোর্ট নং এও ৫০৭১৮-৪৬৯-এর কাছ থেকে ৬০০ রিয়াল ও প্রবাসী মোস্তাফিজুর রহমান পাসপোর্ট নং এও ০০৭১৬০৮৫-এর কাছ থেকে ১৭০০ রিয়াল ক্রয় করে এক্সেলে তৈরি অফিসারের সিগনেচার ব্যতীত ভুয়া ভাউচার দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রবাসী ফটিক সরকারের (পাসপোর্ট নং উল্লেখ নেই) কাছ থেকে ১৭০ সিঙ্গাপুর ডলার, প্রবাসী সাইফুল ইসলামের (পাসপোর্ট নং উল্লেখ নেই) কাছ থেকে ১৩০ সিঙ্গাপুর ডলার, প্রবাসী মুশফিক রহমানের (পাসপোর্ট নং উল্লেখ নেই) কাছ থেকে ২০০ সিঙ্গাপুর ডলার, প্রবাসী আলীর (পাসপোর্ট নং উল্লেখ নেই) কাছ থেকে ৫০০ সিঙ্গাপুর ডলার, প্রবাসী মোহাম্মদ আলমের (পাসপোর্ট নং ইজি-০৫১৭৭০১) কাছ থেকে ২৯ সিঙ্গাপুর ডলার, প্রবাসী হোসেন আলীর (পাসপোর্ট নং উল্লেখ নেই) কাছ থেকে ২৫০ রিয়াল ক্রয় করা হলেও এক্সেলে তৈরি অফিসারের সিগনেচার ব্যতীত ভুয়া ভাউচার দেওয়া হয়। শুধু জনতা নয়, অন্য ব্যাংকের বুথগুলোর বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বর্তমান ব্যবস্থাপক আবু নূর মো. ফয়সাল দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই গত ১০ এপ্রিল ৩৬ লাখ টাকা ও ৭৫ লাখ টাকার বৈদেশিক মুদ্রাসহ ব্যাংকের ৩ কর্মকর্তা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন। পরে তাদের মুচলেকা দিয়ে নিয়ে আসা হলেও ঘটনার মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশন নেওয়া হয়নি। ঘটনার অন্যতম দায়ী সিনিয়র অফিসার নেহলিন রেজাকে বদলি করা হলেও তা কার্যকর করা হয়নি। ঘটনায় আরেকজন দায়ী সিনিয়র অফিসার মিসবাহুস সাদাতকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাটি দুদক অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিমানবন্দর বুথের সিনিয়র ব্যবস্থাপক আবু নূর মো. ফয়সাল জানান, ভুয়া ভাউচার দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয় করার বিষয়টি তিনি অবগত নন।

তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। তিনি হেড অফিসে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

বিমানবন্দরের ব্যাংক বুথগুলোতে ভুয়া রশিদ দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জিয়াউল হক সময়ের আলোকে বলেন, আমরা বিষয়টি নজরদারি করছি। বৈধ রশিদ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচার প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সময়ের আলো/আরএস/ 



Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: