জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ইউনিভার্সাল পিরিউডিক রিভিউ (ইউপিআর) বা সর্বজনীন পুনর্বীক্ষন পদ্ধতির আওতায় সোমবার (১৩ নভেম্বর) চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হবে।
বাংলাদেশ সময় সোমবার ( ১৩ নভেম্বর) বিকাল ৩টায় সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এই পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হবে। আসন্ন অধিবেশনে চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরোধীপক্ষের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের আটকের বিষয়ে বাংলাদেশের কাছে প্রশ্ন তুলতে পারে সদস্য রাষ্ট্রগুলো।
আইন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হকের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল ইউপিআর সভায় অংশ নিতে জেনেভায় অবস্থান করছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়/বিভাগের সচিবসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই প্রতিনিধি দলে রয়েছেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নেতৃত্বে তারা বিগত চার বছরে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরাসহ এ সম্পর্কে উত্থাপিতব্য বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিবেন।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ইউপিআর অধিবেশনে নিজেদের মানবাধিকার প্রতিবেদন উপস্থাপন বিষয়ে এরই মধ্যে যথাযথ প্রস্তুতি শেষ করেছে বাংলাদেশ। এই বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ৬ টি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গত ৭ আগস্ট জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে প্রতিবেদনও জমা দেওয়া হয়েছে।
মানবাধিকার ইস্যুতে গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে কী কী উন্নতি করেছে তার বিস্তারিত ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরে বলা হয়েছে যে অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং ভোটারদের অধিকার নিশ্চিত করতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে।
দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধ করতে ২০০৭ সালের প্রণীত দুর্নীতি দমন কমিশন আইন সংশোধন করা হয়। যার আওতায় দুর্নীতি দমন কমিশন জেলা পর্যায়ের অফিসের মাধ্যমে নিজেই দুর্নীতির মামলা দায়ের করতে পারে এবং দুর্নীতির মামলা করার জন্য থানায় মামলা করতে হয়না। ফলে দুর্নীতি দমন কমিশন বেশি স্বাধীনতা লাভ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মানবাধিকারের বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখে থাকে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর কোনো সদস্য আইন ভঙ্গ করে শক্তি প্রয়োগ করলে তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়।
বিগত ২০১৫ সাল থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ১৭০০ সদস্যের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়া ওই সময়ের মধ্যে ৮৫০০ পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বড় ধরণের বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের কিছু অপব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে, যার কারণে বাংলাদেশ সরকার এই আইনের কিছু ধারা সংশোধন করে নতুন সাইবার সিকিউরিটি আইন প্রণয়ন করেছে।
আইন মন্ত্রণালয় আরো জানিয়েছে, জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে প্রতি চার বছর পরপর ইউনিভার্সাল পিরিউডিক রিভিউ অনুষ্ঠিত হয়। এতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বিগত চার বছরের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়।পর্যালোচনায় বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্র পর্যালোচনাধীন রাষ্ট্রকে মানবাধিকার সংক্রান্ত নানা বিষয়ে প্রশ্ন ও সুপারিশ করে। এর আগে বাংলাদেশ ২০০৯ সালে প্রথমবার, ২০১৩ সালে দ্বিতীয়বার এবং ২০১৮ সালে তৃতীয়বার ইউপিআর-এ অংশ নিয়েছিল। মূলত তিনটি প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এই পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হয়। যথা-(ক) সরকার দেওয়া জাতীয় প্রতিবেদন। (খ) জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন বা সংগঠনের জোটগুলোর দেওয়া প্রতিবেদন এবং(গ)জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের কার্যালয়ের প্রতিবেদন।
কূটনৈতিক সূত্রে আরো জানা গেছে, বিগত ২০০৯ সালে ইউপিআর অধিবেশনে প্রথমবারের মত অংশ নেওয়া বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতির জন্য মোট ৪২ সুপারিশ করা হয়। যার মধ্যে মৃত্যুদণ্ড বাতিল এবং সমকামিতা সংক্রান্ত এই ২ টি সুপারিশ বাদে বাংলাদেশ বাকিগুলো গ্রহণ করে। গত ২০১৩ সালে ইউপিআর অধিবেশনে দ্বিতীয়বার মত অংশ নেওয়া বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতির জন্য মোট ১৯৬ সুপারিশ করা হয়। ওই বছরও মৃত্যুদণ্ড বাতিল এবং সমকামিতা সংক্রান্ত এই ৫টি সুপারিশ বাদে বাংলাদেশ বাকিগুলো গ্রহণ কর।
গত ২০১৩ সালের ইউপিআর অধিবেশনে জোরপূর্বক গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যেকোনও অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন গঠনের পরামর্শ দেওয়া হয়, যা বাংলাদেশ গ্রহণ করে। এরপর গত ২০১৮ সালে ইউপিআর অধিবেশনে তৃতীয়বার মত অংশ নেওয়া বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতির জন্য মোট ২৫১ সুপারিশ করা হয়। যার মধ্যে ৭৩টি সুপারিশ বাংলাদেশ গ্রহণ করেনি।
সময়ের আলো/এম