সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে বিএনপি যখন চূড়ান্ত আন্দোলনে তখন জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করা বিএনপির বেশিরভাগ সংসদ সদস্য মাঠে নেই। মামলা না থাকলেও এই সংসদ সদস্যদের মধ্যে একজন ছাড়া সবাই রাজধানীতে অবস্থান করছেন। ২৮ অক্টোবরের সমাবেশে সংঘর্ষের ঘটনার পর এদের কেউ নিজ নির্বাচনি এলাকায় যাননি। দলের ডাকা হরতাল-অবরোধেও নিষ্ক্রিয় তারা। এ নিয়ে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ।
আন্দোলনের অংশ হিসেবে গত বছর ১০ ডিসেম্বর সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন বিএনপির ৭ সংসদ সদস্য-হারুনুর রশীদ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩), জিএম সিরাজ (বগুড়া-৭), আমিনুল ইসলাম (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২), জাহিদুর রহমান (ঠাকুরগাঁও-৩), মোশাররফ হোসেন (বগুড়া-৪), উকিল আবদুস সাত্তার (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২) এবং রুমিন ফারহানা (সংরক্ষিত নারী আসন)। যদিও উকিল আবদুস সাত্তার পরে বিএনপি ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে উপনির্বাচনে জয়ী হন।
বর্তমান আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যেই আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার প্রস্তুতি নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এই তফসিল ঠেকাতে দলের সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থীদের নির্বাচনি এলাকায় যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। জানা গেছে, জেলা পর্যায়ে অবরোধ কর্মসূচি আরও জোরদার করতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংসদ থেকে পদত্যাগ করা সদস্যদের বেশিরভাগ এখনও এলাকায় যাননি। হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিতেও তাদের মাঠে পাওয়া যাচ্ছে না। এ নিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের হারুনুর রশীদ ও আমিনুল ইসলামকে নিয়ে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে । সংসদ থেকে পদত্যাগ করা হারুনুর রশীদ বিএনপির যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্বে আছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. ওবায়েদ পাঠান সময়ের আলোকে বলেন, ‘চারবারের সংসদ সদস্য হারুনসহ অনেককে চলমান আন্দোলন কর্মসূচিতে মাঠে পাওয়া যাচ্ছে না। ২৮ অক্টোবরের পর আর নির্বাচনি এলাকায় আসেননি হারুন ও আমিনুল। হারুনের স্ত্রী সংরক্ষিত আসনের সাবেক এমপি সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়ার দেখাও মিলছে না। অবরোধ কর্মসূচির সমর্থনে মাঠে নেই তাদের অনুসারীরাও। আমাদের সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত চেয়াম্যানের সরাসরি যোগাযোগ হচ্ছে। প্রতিটি কর্মসূচিতে আমরা চেষ্টা করছি মাঠে থাকতে।’
তৃণমূল এই নেতার দাবি, হারুন ও আমিনুল ২৮ অক্টোবরের সমাবেশে ৫/৭ মিনিট ছিলেন। সংঘর্ষ শুরুর পরই তারা সটকে পড়েন। ২৮ অক্টোবরের মামলায়ও তাদের নাম নেই।
অবশ্য এসব অভিযোগ এড়িয়ে হারুনুর রশীদ উল্টো সময়ের আলোকে প্রশ্ন করেন, ‘এলাকায় যাব কীভাবে? আমার নামে দুটি মামলা হয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে যায় সেটি পর্যবেক্ষণ করছি। শেষ পর্যন্ত এলাকায় তো যেতেই হবে।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক তসিকুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, ‘সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলা ছাড়া জেলার কোথাও অবরোধের সমর্থনে মিছিল কিংবা পিকেটিং হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দলীয় কোন্দল। জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম (চায়নিজ রফিক) উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের আবদুল ওদুদ এমপির পক্ষে কাজ করেছেন। আর আহ্বায়ক গোলাম জাকারিয়া অসুস্থতার কথা বলে ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। গোমস্তাপুর, নাচোল ও ভোলাহাট উপজেলায় আন্দোলন কার্যক্রম নেই বললেই চলে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর পৌর বিএনপির আহ্বায়ক এনায়েত করিম তকি সময়ের আলোকে বলেন, ‘হারুন মাঝে-মধ্যে এলাকায় এলেও আমিনুল একেবারেই আসেন না। ঢাকায় ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত তারা। দলের দুর্দিনে তাদের মাঠে পাই না আমরা। নেতাকর্মীদের খোঁজখবরও রাখে না তারা। এটাই তাদের রাজনীতি।’
এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে পদত্যাগ করা সংসদ সদস্য আমিনুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, ‘২৮ অক্টোবরের ঘটনায় আমার নামে মামলা হয়নি, এ কথা ঠিক। তবে আমার ১২ জন নেতাকর্মীকে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ।’
হরতাল-অবরোধে মাঠে না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আছি মাঠে আছি। নেতাকর্মীরা হয়তো জানে না।’ নির্বাচনি এলাকায় যান কি না প্রশ্ন করলে এড়িয়ে যান তিনি।
বগুড়া সদরের সাবেক সংসদ সদস্য জিএম সিরাজকেও তার নির্বাচনি এলাকায় পাওয়া যাচ্ছে না বলে নেতাকর্মীদের অভিযোগ। অবশ্য জানা গেছে, ঢাকায় বসে তিনি এলাকার কর্মসূচিতে নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
শেরপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শহিদুল ইসলাম বাবলু সময়ের আলোকে বলেন, ‘সাবেক সংসদ সদস্য জিএম সিরাজ ঢাকায় অবস্থান করছেন। রোববার তার এলাকায় আসার কথা রয়েছে। তখন হয়তো মাঠে নামবেন। তবে তিনি নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখছেন।’
বক্তব্যের জন্য জিএম সিরাজকে বারবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি। সাবেক সংসদ সদস্য মোশাররফ হোসেন কৃষক দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক। একমাত্র তাকেই তার নির্বাচনি এলাকায় (বগুড়ার কাহালু-নন্দীগ্রাম) অবস্থান করে কর্মীদের নিয়ে অবরোধ কর্মসূচিতে মহাসড়কে বিক্ষোভ মিছিল ও পিকেটিং করতে দেখা গেছে। যদিও তার নামে গত ২৮ অক্টোবরের সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা হয়েছে।
ঠাকুরগাঁও-৩ (পীরগঞ্জ-রানীশংকৈল) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমানকেও মাঠে পাচ্ছেন না নেতাকর্মীরা। পীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির ছাত্রদলের একজন নেতা সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমাদের সাবেক এমপি কোথায় অবস্থান করছেন তা আমরা জানি না। অনেকে বলছেন তিনি ঢাকায়। তাহলে তাকে মাঠে পাওয়া যাবে কীভাবে? উপজেলায় ছাত্রদল ছাড়া অন্য কোনো তৎপরতা নেই।’
যদিও জাহিদুর রহমানের দাবি, তিনি গ্রেফতার করা নেতাকর্মীদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, ‘ আমি তো মাঠে আছি। মাঠে নেমে পুলিশের সঙ্গে ঝগড়া করে প্রমাণ দিতে হবে?’
পদত্যাগ করা সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ব্যস্ত সময় পার করছেন টেলিভিশনের টক শোতে। রোজই গণমাধ্যমে তার দেখা মেলে। তবে তার এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নেতাকর্মীরা স্থানীয় কোনো কর্মসূচিতে তাকে পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নুরুজ্জামান লস্কর তপু সময়ের আলোকে বলেন, ‘শুনেছি আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসন থেকে রুমিন ফারহানা নির্বাচন করবেন। কিন্তু এলাকার সঙ্গে তো তার কোনো যোগাযোগ নেই। উপজেলার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমার সঙ্গে কখনো তার কথা হয়নি। কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে আন্দোলন কর্মসূচিতে সাংগঠনিক কোনো নির্দেশনাও তার কাছ থেকে আমরা পাইনি। নির্বাচনি এলাকায় কোনো কর্মসূচিতে তাকে মাঠে দেখা যায় না। এভাবে ঢাকায় বসে এলাকার এমপি হওয়া যায়!’
দেশের অন্তত দুই ডজন সংসদীয় এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়া বিএনপির বেশিরভাগ নেতা বর্তমানে এলাকায় নিষ্ক্রিয়। তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের যোগাযোগ নেই। হামলা-মামলার শিকার নেতাকর্মীদের পাশেও দাঁড়াচ্ছেন না তারা। নেতাদের দেখা না পেলেও হামলা-মামলার ঝুঁকি নিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীরা আন্দোলন কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে সাধ্যমতো সক্রিয় আছেন।
সময়ের আলো/আরএস/