তফসিল ঘোষণার প্রতিবাদ ও এক দফা দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার সর্বাত্মক হরতাল শেষ হচ্ছে সোমবার। প্রথম দিনে অনেকটা নিরুত্তাপ ও ঢিলেঢালাভাবে পালিত হয় কর্মসূচি। রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় মিনিট কয়েকের জন্য হাতেগোনা নেতাকর্মী ঝটিকা মিছিল করে সটকে পড়ছেন। মিছিল শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ফেসবুকে জানিয়ে দিচ্ছেন। যদিও ঢাকার বাইরে খানিকটা ভিন্ন।
সোমবার (২০ নভেম্বর) বিকেলে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। জানা গেছে, এক দিনের বিরতি দিয়ে ফের অবরোধ কিংবা ঘেরাও কর্মসূচির ডাক আসতে পারে।
এদিকে বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের নিপীড়ন, গ্রেফতার তাণ্ডব সব সীমা লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।
ভার্চুয়াল ব্রিফিং-এ তিনি বলেন, তাদের জানা উচিত এই নিশুতি সরকারই শেষ সরকার নয়। কিছুদিন পরেই হবে জনগণের সরকার। তখন এই আজ্ঞাবাহী, দলদাস, পোশাকী সন্ত্রাসীদের পরিণতি কী হবে জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে।
সরকার বিএনপি ও জিয়া পরিবারকে ধ্বংসের জন্য বহুমুখী চক্রান্ত করে ব্যর্থ মন্তব্য করে রিজভী বলেন, আগামী ১০-১৫ বছর কেন, বিশ্বের মানচিত্রে লাল-সবুজের পতাকাটি যতদিন থাকবে ততদিন বিএনপি থাকবে এই দেশে ইনশাআল্লাহ!
আমি শুধু সজীব ওয়াজেদ জয় সাহেবকে বলবো, ইতিহাস পড়েন। স্বৈরাচাররা যখন ক্ষমতার মসনদে বসে থাকে তখন অন্ধের মতো দাম্ভিকতা দেখায়।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের পরিস্থিতি তুলে ধরে রিজভী বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ৫১০ জনের বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলা হয়েছে ১৮টি। আসামি করা হয়েছে ২০৮৫ জনের অধিক নেতাকর্মীকে (এজাহার নামীয়সহ অজ্ঞাত)। মোট আহতের সংখ্যা ১০০ জনের বেশি নেতাকর্মী। মৃত্যু হয়েছে একজনের।
এছাড়া ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে মহাসমাবেশের ৪/৫ দিন আগে থেকে এখন পর্যন্ত মোট গ্রেফতার ১৩ হাজার ৭২০ জনের বেশি নেতাকর্মী। মামলা হয়েছে ৩১৪টির বেশি। মোট আহত ৪২৩৩ জনের বেশি। মৃত্যু ১৫ জন (সাংবাদিক এক জন) বলেও জানান রিজভী।
ঢিলেঢালা হরতাল
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ‘একতরফা’ তফসিলের প্রতিবাদে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর ডাকা ৪৮ ঘণ্টার হরতালের প্রথম দিনে রাজধানীতে বিএনপি বিভিন্ন স্থানে ‘ঝটিকা’ মিছিল এবং সমমনা জোটগুলো পুরানা পল্টনের বিজয়নগর সড়কে ‘বিক্ষোভ মিছিল’ করেছে।
রোববার (১৯ নভেম্বর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর পুরানা পল্টন, বিজয় নগর, তোপখানা রোড, জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে, সায়েন্স ল্যাবরেটরির সামনে, তেঁজগাও রেল স্টেশন সড়ক, তেঁজগাও শিল্পাঞ্চল সড়ক, বাড্ডা, ফকিরাপুল, গ্রীন রোড প্রভৃতি সড়কে এসব কর্মসূচি হয় পালন করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।
নির্বাচন কমিশনের ‘এক তরফা’ তফসিল ঘোষণার প্রতিবাদে বিএনপিসহ সমমনাজোটগুলো সারাদেশে রোববার সকাল ৬টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত টানা ৪৮ ঘন্টার হরতাল কর্মসূচি করছে।
বিএনপি: তেঁজগাও রেল স্টেশনের সড়ক, ফকিরাপুল, কবি নজরুল সরকারি কলেজ সড়ক, ঝিকাতলা, বনানীর কাকলীর সামনের সড়ক, তেঁজগাও শিল্পাঞ্চল সড়ক, গুলশানে ছাত্র দল ও বাড্ডায় মহিলা দল, শাহবাগ, রমনা, মতিঝিল, গ্রীন রোডে স্বেচ্ছাসেবক দল সকালে ‘ঝটিকা’ মিছিল করে চলে যায়। এসব মিছিলে কোথাও ৩০/৩৫ জন আবার কোথাও কোথাও অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী ছিলেন।
নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে গত ২৯ অক্টোবর থেকে বিএনপি টানা কর্মসূচি দিয়ে এলেও নেতা-কর্মীদের রাজপথে সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। ঝটিকা মিছিল করে ফেইসবুকে পোস্ট করে সটকে পড়ছেন তারা।
গণতন্ত্র মঞ্চ: বেলা সাড়ে ১২টায় বিজয় নগর সড়কে একতরফা তফসিলের প্রতিবাদে মিছিল করে তারা। মিছিলটি সরকার বিরোধী নানা শ্লোগান দিয়ে বিজয়নগর সড়ক প্রদক্ষিন করে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে।
জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট: বিজয়নগর সড়কের সকাল সাড়ে ১১টায় এই বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। এই মিছিলে এনপিপির ফরিদুজ্জমান ফরহাদ, মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা, জাগপার খন্দকার লুতফুর রহমান, সাম্যবাদী দলের সৈয়দ নুরুল ইসলাম, এনডিপির আবু তাহের প্রমূখ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
গণঅধিকার পরিষদ: নুরুল হক নূরের নেতৃত্বে পরিষদের শতাধিক নেতা-কর্মীরা বিজয় নগর ও নয়া পল্টনের সড়কে বিক্ষোভ মিছিল করে।
গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য: তোপখানা রোড় থেকে পুরানা পল্টনের মোড়ে ‘একতরফা’ নির্বাচনের প্রতিবাদে মিছিল করে তারা। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও, লড়াই করো’, ‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই’, ‘গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যের হরতাল চলছে চলবে’ ইত্যাদি শ্লোগান দেয়।
১২ দলীয় জোট: বেলা সাড়ে ১১টায় বিজয়নগর সড়কে তারা মিছিল করে। এই মিছিলে ছিলেন জাতীয় পার্টি(কাজী জাফর) নওয়াব আলী আব্বাস, জাগপার রাশেদ প্রধান, ইকবাল হোসেন, লেবার পার্টির ফারুক রহমান, কল্যাণ পার্টির নুরুল কবির ভুঁইয়া পিন্টু,বিএলডিপির এম এ বাশার, জাতীয় দলের শামসুল আহাদ,ইসলামী ঐক্যজোটের ইলিয়াস রেজা প্রমূখ নেতারা ছিলেন।
এলডিপি: বেলা ১২টায় নাইটেঙ্গল মোড়ে মিছিল করে তারা একতরফা নির্বাচনের তফসিল বাতিলের দাবি জানায়। এই মিছিলে ছিলেন এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য নেয়ামূল বশির, যুগ্ম মহাসচিব বিল্লাহ মিয়াজীসহ নেতৃবৃন্দ।
আগের মতো তালাবদ্ধ কার্যালয়
বিএনপির নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের চিত্র বদায়নি। তালাবদ্ধ অবস্থায় আছে। গত ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশ পুলিশ পন্ড করে দেয়ার পর রাত থেকে এই কার্যালয়ে নেতা-কর্মী কাউকে দেখা যায়নি, কার্যালয়ের কলাসিবল গেইট তালাবদ্ধ দেখা যায়। কার্যালয়ের সামনে দুই পাশে বসানো হয় পুলিশি নিরাপত্তা যা এখনো বলবৎ আছে।
সময়ের আলো/এম