আবারও বিএনপিতে ফেরার কোনো সম্ভাবনা আছে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে দলটির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর বীর উত্তম বলেছেন, ‘তওবা-আস্তাগফিরুল্লাহ’। বুধবার (৬ ডিসেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মিন্টু রোডে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ কার্যালয় থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
এর আগে বেলা ১১টার দিকে সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে দেখা করতে পারেননি ঝালকাঠি-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনীত এ প্রার্থী। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। তবে সাক্ষাতের বিষয় অস্বীকার করে রেজিস্টারের কাছে কাজে যাওয়ার কথা জানান শাহজাহান ওমর।
এদিকে, সুপ্রিম কোর্টে অবস্থানকালে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের তোপের মুখে পড়েন বিএনপি থেকে সম্প্রতি আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া এই আইনজীবী। একপর্যায়ে তাকে বেইমান, রাজাকার বলে গালাগাল করলে আদালত এলাকা ছেড়ে যান। সেখান থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে যান। বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়াকে বেঈমানি করা নয় বলে সাংবাদিকদের কাছে মন্তব্য করেন।
সুপ্রিম কোর্ট সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার বেলা ১১টার কিছু আগে সুপ্রিম কোর্টের মূল ভবনে (প্রধান বিচারপতির কার্যালয়) আসেন শাহজাহান ওমর। এ সময় তার একজন সহকারীর মাধ্যমে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি চান। তখন আপিল বিভাগের বিচারিক কার্যক্রম চলায় সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন। পরে আদালতের বিরতির সময় সাক্ষাতের অনুমতি না মেলার বিষয়ে জানানো হলে চলে যান তিনি। যদিও প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন তিনি।
বিএনপি থেকে সদ্য বহিষ্কৃত সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার এম শাহজাহান ওমর সাংবাদিকদের বলেন, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাত নয়, রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে একটা কাজে এসেছিলাম। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আওয়ামী লীগ আমার পুরোনো দল। নিজ ঠিকানায় ফিরে এসেছি।
তোপের মুখে আদালত এলাকা ত্যাগ: প্রত্যক্ষদর্শী ও বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুপুর ১২টার দিকে সুপ্রিম কোর্ট সমিতি ভবনে আসেন শাহজাহান ওমর। কিছুক্ষণ পর তার এক জুনিয়রের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সুপ্রিম কোর্ট ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক গাজী কামরুল ইসলামকে ডেকে পাঠান। কিন্তু গাজী কামরুল তার কক্ষে না গেলে শাহজাহান ওমর নিজেই গাজী কামরুলের কক্ষে (১৩১ নম্বর কক্ষ) যান। এ সময় তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন পুলিশ সদস্য কক্ষের বাইরে ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলেন, গাজী কামরুলের কক্ষে গিয়ে তাকে গালমন্দ করা ও তার পোস্টার ছিড়ে ফেলার কারণ জানতে চান। তখন গাজী কামরুল খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার কোনো ছবি থাকতে পারে না এমন কথা বলছে দুজনের মধ্যে তর্কাতর্কি শুরু হয়। এ সময়ে গাজী কামরুলের কক্ষের ভেতরে ও সামনে কয়েকজন বিএনপিপন্থী আইনজীবী জড়ো হলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন শাহজাহান ওমর। তখন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা তার পিছু নিয়ে তাকে বেঈমান বলে চিৎকার করেন।
প্রত্যাক্ষদর্শী আইনজীবীরা বলেন, গাজী কামরুলের কক্ষ থেকে বের হওয়ার পর শাহজাহান ওমরের উদ্দেশে বিএনপিপন্থী আইনজীবী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান খান বলেন, প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলা মামলার আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ান, তাকে আবার পুলিশ প্রটেকশনও দেয়! আসামি হয়ে পুলিশ নিয়ে এসেছেন বলেও কেউ কেউ উক্তি করেন। একপর্যায়ে সমিতি ভবনের সামনে দাড়িয়ে শাহজাহান ওমর বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের সংযত হয়ে কথা বলতে বলেন। এ সময় বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা শাহজাহান ওমরকে কটূক্তি করে নানা স্লোগান দেন। পরে পুলিশ সঙ্গে নিয়ে শাহজাহান ওমর সমিতি ভবনের সামনে থেকে চলে যান।
এ বিষয়ে আইনজীবী গাজী কামরুল সাংবাদিকদের বলেন, শাহজাহান ওমর তাকে দুবার খবর দিলে তিনি তার সঙ্গে দেখা করবেন না বলে জানিয়ে দেন। পরে শাহজাহান ওমর নিজেই পুলিশ নিয়ে তার কক্ষে আসেন। দেখা না করায় তার সঙ্গে তিনি দুর্ব্যবহার করেন ও হুমকি দেন।
তওবা-আস্তাগফিরুল্লাহ, বিএনপিতে ফেরার প্রশ্নে ওমর
বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের তোপের মুখে আদালত এলাকা থেকে বের হয়ে রাজধানীর মিন্টু রোডে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ কার্যালয়ে পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদের সঙ্গে সাক্ষাত করেন তিনি। ব্যক্তিগত কারণে সেখানে গেছেন বলে সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন। তিনি বলেন, আমি আগে বিএনপি করতাম, এখন আওয়ামী লীগে জয়েন করেছি। এরপর থেকে আমি সাইবার বুলিংয়ের স্বীকার হচ্ছি। আমার ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী এমনকি আমার জুনিয়র আইনজীবীর ফোনে কল করে নানা কথা বলা হচ্ছে। সে বিষয়টিই হারুন সাহেবকে (ডিবিপ্রধান) জানাতে এসেছি।
দল পরিবর্তন করা নিয়ে বলেন, এটা সাংবিধানিক অধিকার। ঈমান একমাত্র আল্লাহর কাছে, বেঈমানি তো ধর্মের বিষয়। রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা বেঈমানি নয়। ভবিষ্যতে বিএনপিতে ফেরার প্রশ্নে ‘তওবা-আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সবসময় সবখানে এডজাস্টমেন্ট করা সম্ভব নাও হতে পারে। আমি এই বৃদ্ধ বয়সে এসে মনে হলো জনগণের জন্য কাজ করি। কারণ, আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। আমার রাজনীতি করে রুটি-হালুয়া লাগে না, আমার মন্ত্রী হওয়ার দরকার নেই। আমি সব হয়েছি, এই মাটি আমাকে সব দিয়েছে।
সরকারের সঙ্গে আপস করে জামিন পেয়েছেন কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, কাশিমপুরে (কারাগারে) আপস করে কেমন করে? ২৯ নভেম্বর স্বাভাবিকভাবে আমার জামিন হয়েছে। ৩০ নভেম্বর আওয়ামী লীগে জয়েন করেছি। তিনি বলেন, জামিন আমার এমনিতেও হতো। ৪ নভেম্বর গ্রেফতার হয়েছি, ৬ তারিখে সুপ্রিমকোর্টে জামিনের জন্য আমার আইনজীবী আবেদন করেন। কিন্তু জামিন হলো না। পরের তারিখে গেলাম, তখন আমার আইনজীবী আদালতকে বললেন, সঙ্গে থাকা তিনজনকে জামিন হলো, আমাকে কেন দেওয়া হবে না? এ ছাড়া আমি চারবারের এমপি, বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। এজন্য আদালত আমাকে জামিন দিয়েছেন।
নাশকতার মামলার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শাহজাহান ওমর বলেন, মামলা হতেই পারে। আমি তো ২৮ অক্টোবর ঘটনার দিন মঞ্চে ছিলাম। এটা তো অস্বীকার করতে পারি না। তাই নাশকতামূলক যে কোনো মামলা হতেই পারে। তদন্তে সংশ্লিষ্টতা পেলে পুলিশ আমার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেবে, বিচারের কাঠগড়ায় পাঠাবে।
সময়ের আলো/জেডআই