গত চার দিন দেশে পেঁয়াজ নিয়ে একরকম হুলুস্থূল কারবার হয়ে গেছে। ভারত রফতানি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর দিনই পেঁয়াজের দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়। ১০০ টাকার ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হয় ২০০-২২০ টাকায় আর ১৪০ টাকার দেশি পেঁয়াজের দাম হয়ে যায় ২৬০-২৮০ টাকা। অবশেষে পাঁচ দিনের মাথায় এসে দেশে পেঁয়াজের ঝাঁজ কমতে শুরু করেছে।
পাইকারি ও খুচরা বাজারে কেজিতে ৬০-৮০ টাকা পর্যন্ত কমেছে পেঁয়াজের দাম। মূলত দেশীয় নতুন পেঁয়াজই কমাল বাজারের ঝাঁজ। এ ছাড়া দাম কমে আসার পেছনে আরও একটি কারণ রয়েছে। হঠাৎ অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণে ক্রেতারাও একরকম পেঁয়াজের বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এতে পেঁয়াজ বিক্রি কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরাও দাম কমাতে বাধ্য হয়। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যবসায়ীদের যখন মন চাইল দাম বাড়াল, আবার যখন মন চেয়েছে তখন দাম কমাচ্ছে। এতেই প্রমাণ হয় দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার চলছে ব্যবসায়ীদের ইচ্ছেমতো।
এ বিষয়ে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান সময়ের আলোকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা রাতের আঁধারে দাম বাড়িয়ে গত চার দিন ক্রেতার পকেট খালি করল। এই কয়েক দিন তারা ইচ্ছেমতো অস্বাভাবিক মুনাফা করেছে পেঁয়াজে। যখন দেখল ক্রেতারা পেঁয়াজ কেনা কমিয়ে দিয়েছেন, তখন আবার দাম কমিয়ে দিলেন তারা। এতেই বোঝা যাচ্ছে বাজার চলছে ব্যবসায়ীদের ইচ্ছা-মর্জি মতো। কিন্তু বাস্তবে তো তেমনটি হওয়ার কথা না। বাজারকে বাজারের স্বাভাবিক গতিতে চলতে দিতে হবে। নিত্যপণ্যের বাজারে কোনো রকম সিন্ডিকেট না করলে ক্রেতারা আরও কম দামে পণ্য কিনতে পারত।’
গত বৃহস্পতিবার ভারত সরকার পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণা দেয়, আর খবরটি দেশে জানা যায় শুক্রবার। ওই দিন রাত থেকেই বাড়তে শুরু করে পেঁয়াজের দাম। শুক্রবার সারা দিনও যেখানে দেশের পাইকারি বাজারে দেশি পেঁয়াজের কেজি ছিল ১১০-১২০ টাকা, সেখানে পরের দিন শনিবার হয়ে যায় ২১০-২২০ টাকা। আর খুচরা বাজারে শুক্রবার প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ছিল ১৪০-১৫০ টাকা, সেখানে শনিবার হয়ে গেছে ২৫০-২৬০ টাকা। এরপর একেক বাজারে বিক্রেতারা পেঁয়াজের একেক রকম দামে বিক্রি করতে থাকেন। এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির বিষয়টি দেশের সব ধরনের গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করায় এবং ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হওয়ায় সরকার নড়েচড়ে বসে।
রাজধানীসহ সারা দেশে অভিযান চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। এ সময় পেঁয়াজের মূল্য বেশি রাখাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১১৫ প্রতিষ্ঠানকে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গতকাল ভোক্তা অধিদফতরের অভিযানে এ জরিমানা করা হয়।
পেঁয়াজের বাজারে নামানো হয় বিভিন্ন গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যদের। পাশাপাশি দেশে উঠতে শুরু করেছে নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ এবং চীন-পাকিস্তানের মতো বিকল্প বাজার থেকেও আমদানি করা হয় পেঁয়াজ। এত সব উদ্যোগের ফলে চার দিন পর মঙ্গলবার দেশের অস্থির পেঁয়াজের বাজারের ঝাঁজ কিছুটা কমে এসেছে।
গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, কল্যাণপুর নতুন বাজারসহ বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, পাইকারি বাজারে পাবনায় উৎপাদিত দেশি পুরোনো পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ টাকা কেজিতে, যা বেড়ে হয়েছিল ২২০ টাকা। ফরিদপুরে উৎপাদিত দেশি পুরোনো পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা, যা বেড়ে হয়েছিল ২১০ টাকা, নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭০-৮০ টাকায়, যা বেড়ে হয়েছিল ১২০ টাকা। ভারতীয় পেঁয়াজ গতকাল পাইকারি বাজারে বিক্রি হয় ১২০ টাকায়, যা বেড়ে হয়েছিল ১৮০-২০০ টাকায়। পাকিস্তানি পেঁয়াজ বিক্রি হয় গতকাল ১১০ টাকায়, আর চীনের মোটা পেঁয়াজ বিক্রি হয় ৫০-৬০ টাকায়।
পাইকারি বাজারে দাম কমায় খুচরা বাজারেও কমে এসেছে পেঁয়াজের দাম। খুচরা বাজারে গতকাল মঙ্গলবার পাবনার পুরোনো পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে বাজারভেদে ১৮০-২০০ টাকায়। এ ছাড়া ফরিদপুরের পুরোনো পেঁয়াজ ১৭০-১৮০ টাকায়, নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ ৯০-১০০ টাকায়, ভারতীয় পেঁয়াজ ১৪০ টাকায়, পাকিস্তানি পেঁয়াজ ১৩০ টাকায় এবং চীনা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা কেজিতে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দেশি মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে ভরপুর আসা শুরু হওয়ায় আগামী দুয়েক দিনের মধ্যে আরও কমে আসবে দাম।
খাতুনগঞ্জে কেজিতে কমল ১০০ টাকা : দেশের অন্যতম বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি প্রায় ১০০ টাকা কমেছে। মঙ্গলবার খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১২০-১৪০ টাকা দরে। অথচ গত শনিবারও প্রতি কেজিতে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল ২০০-২৫০ টাকায়।
পাবনায় প্রতি মণে দাম কমল ২ হাজার টাকা : পাবনার পেঁয়াজের পাইকারি হাটে তিন দিনের ব্যবধানে প্রতি মণে দাম কমেছে গড়ে ২ হাজার টাকা। আর এক দিনের ব্যবধানে কমেছে মণপ্রতি হাজার টাকা। মঙ্গলবার বনগ্রাম হাটে নতুন মূলকাটা বা মুড়ি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে প্রতি মণ ২৬০০-৩৫০০ টাকা। আর পুরোনো হালি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে প্রতি মণ গড়ে ৫ হাজার টাকা। এর আগে শনিবার রোনো হালি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে প্রতি মণ ৭ হাজার টাকায়। আর নতুন মূলকাটা বা মুড়ি পেঁয়াজ বিক্রি হয় প্রতি মণ ৫-৬ হাজার টাকায়।
চার প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা : চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও থানাধীন কামাল বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রির দায়ে চার প্রতিষ্ঠানকে মোট ২৯ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। মঙ্গলবার এ অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে কামাল বাজারের মেসার্স আলহা ট্রেডিংকে ১৫ হাজার টাকা, ফয়সাল স্টোরকে ৩ হাজার টাকা, মেসার্স মোহসীন আউলিয়া বাণিজ্যালয়কে ৮ হাজার টাকা, জসিম এন্টারপ্রাইজকে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ে আড়তেই নেই পেঁয়াজ : ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, জেলার পুরো আড়তজুড়ে কোথাও মিলছে না পেঁয়াজ। পেঁয়াজ কিনতে আসা বিভিন্ন ক্রেতারা বলেন, হঠাৎ পেঁয়াজের ওপর এমন ভৌতিক ঘটনা কেন ঘটল জানি না। আড়তদাররা জানান, যেখানে আমাদের দৈনিক ৪০-৬০ বস্তার অধিক পেঁয়াজের দরকার সেখানে আমরা পেয়েছি ৫-১০ বস্তা। এত কম পরিমাণের পেঁয়াজ সকালেই বিক্রি হয়ে গেছে তাই আমাদের কাছে আর কোনো পেঁয়াজ নেই।
সাতক্ষীরায় ৫০০ বস্তা পেঁয়াজ মজুদ : সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে অবৈধভাবে ৫০০ বস্তা পেঁয়াজ মজুদ করায় মেসার্স সৃষ্টি ট্রেডিং নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ৪৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং ১২ ঘণ্টার মধ্যে গোডাউনে থাকা পেঁয়াজ বাজারজাত করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শরীয়তপুরে অর্ধলাখ টাকা জরিমানা : শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানান, সিন্ডিকেট করে কৃত্রিমভাবে পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি করায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অর্ধলাখ টাকার বেশি জরিমানা করেছে। মঙ্গলবার শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের গোপনীয় শাখার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুর রহিম জরিমানার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
হবিগঞ্জে অভিযান ও জরিমানা : হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, হবিগঞ্জে পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণ রাখতে ও সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি নিশ্চিত করতে জেলাজুড়ে প্রথম দিনের অভিযানে ২৭ জন ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেছে প্রশাসন।
সময়ের আলো/আরএস/